২৪ জুলাই ২০১৯

‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’

খালেদা জিয়া - ফাইল ছবি

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শতবর্ষ পূর্বে যে অমূল্য বক্তব্যটি লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, যুগে যুগে তার সত্যতা বহন করে চলছে আইনের জগতে। দীর্ঘ এক শতাব্দীর পর বেগম জিয়ার বেলায় তা যেন শতভাগ প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী একজন বৃদ্ধা ও গুরুতর অসুস্থ। প্রচলিত আইনে তার কারাগারের লৌহ কপাটে বন্দী থাকার কথা নয়। জামিনযোগ্য মামলা, দুর্নীতির মামলায় ৫-১০ বছরের সাজা যেখানে আপিল চলমান, একজন প্রবীণ অসুস্থ মহিলা, জামিনে মুক্তি না পেয়ে আদালতের কাঠগড়ায়; এ যেন আইনের জগতে অকল্পনীয়।

বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়- সরকার জনপ্রিয় এই নেত্রীকে কারাগারের লৌহ কপাট থেকে মুক্তি না দেয়ার ব্যাপারে অনড়। দৃশ্যত সরকারের হস্তক্ষেপের দরুণ জনগণ মনে করে, তিনি জামিনে মুক্তিপ্রাপ্তির স্বাভাবিক আইনগত বিচার থেকে আজো বঞ্চিত। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্ন রেখেছেন ‘সরকার কি কারাগারে রেখেই বিনা চিকিৎসায় খালেদাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে?’ প্রকৃতপক্ষে তার সন্দেহ অমূলক নয়। দেশের বেশির ভাগ জনগণের ভাবনাচিন্তার প্রতিফলন ফখরুলের বক্তব্যের স্বরূপ। সরকার খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যত অমানবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন কেন? কারণ, ঈর্ষান্বিত হয়ে, জনপ্রিয় এই নেত্রীকে মামলার নামে বন্দী রেখে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। তিনি মুক্তি পেতে বাধা আইনের প্রক্রিয়া নয়, বিচার বিভাগের ইচ্ছা নয়, অন্য কোনো শক্তি তার মুক্তির পথে বাধা। বয়স্কা, গুরুতর অসুস্থ মহিলার কারাগারে দীর্ঘ অবস্থানের গুরুতর পরিণতিই স্বাভাবিক সম্ভাবনা।

হেন অমানবিক আচরণের শেষ কোথায়? সেই দিকটি বিচার বিশ্লেষণ করলে অনায়াসেই বোধগম্য হয় বেগম খালেদা জিয়ার এমনিতর মর্মান্তিক পরিণতি হোক এটাই যেন ক্ষমতাবানদের কাম্য। তাকে কারাবন্দীর নামে নিঃশেষ করে দিতে চাচ্ছে সরকার। এর দরুন প্রশাসনের ওপর অদৃশ্য হস্তক্ষেপের অভিযোগ।

সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে হারানো গণতন্ত্রকে উদ্ধারের বৃহত্তর স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সব বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ সরকারের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আবশ্যক। বুদ্ধিজীবীরা সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক দিকটি বিবেচনায় এনে লাখো কণ্ঠে গণতন্ত্রের একজন মাতার মুক্তির জন্য গর্জে ওঠা জরুরি দায়িত্ব। সরকারের উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে জনগণ সর্বত্র জাগ্রত হলে চক্রান্ত নির্মূল হতে বাধ্য। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট Guardian of the Constitution. সরকার সংবিধানের ওপর দাঁড়ানো কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান তার ওপরে।

এ ব্যাপারে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আইনগত হস্তক্ষেপ খালেদার জামিন মঞ্জুরির ক্ষেত্রে মানবিক দিক উন্মোচিত করতে পারে। মহামান্য উচ্চতর আদালত বেগম খালেদা জিয়ার এই মহাসন্ধিক্ষণে আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ‘আইনই দেশের রাজা’ প্রমাণ করতে পারেন। এরূপ একটি মাত্র পদক্ষেপই বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখ্য, ১/১১-এর পর মইন-ফখরুদ্দীনের রাজত্বকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং অপর সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দিয়ে কারাগারে রেখে, নতুন দল গঠন করে দীর্ঘ সময় দেশ শাসনের ইচ্ছা ছিল স্বৈরশাসকদের। কিন্তু বিধিবাম, তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার দেশ না ছাড়ার দৃঢ়তার কারণে। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ক্ষমতা এসে শুধু তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। প্রত্যাহার করে নেয়া হয় দলীয় নেতাদের সব মামলা।

তাদের উদ্দেশ্য মহৎ থাকলে অনায়াসে খালেদা জিয়ার মামলাগুলো তেমনিভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া হতো। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে খালেদার মামলাগুলো না উঠিয়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের যে পাহাড় সৃষ্টি করেছে, তার পরিণতিতেই খালেদা কারাগারে। কিন্তু কারাগারে থেকেও তিনি বিপুল জনপ্রিয়। ক্ষমতাসীনেরা খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার আতঙ্কে পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ সাজানো মামলায় দীর্ঘ দিন কারাগারে রেখে প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দিতে চাচ্ছে।

মহামান্য উচ্চতর আদালতের মাধ্যমে ১/১১ পর্যায়ে দায়ের করা মামলাগুলো বাতিল করা ন্যায়সঙ্গত ছিল। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সময়ে তা হয়ে ওঠেনি। তার প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের শেষ দিকে ন্যায়বিচারের দিকটি উন্মুক্ত করতে প্রয়াসী হওয়ার পর্যায়ে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপে তিনি ‘হারিয়ে যান’। যা হোক, ১/১১-এর মইন-ফখরুদ্দীনের রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যেরই প্রতিফলন যেন আজো ঘটছে দেশনেত্রীকে কারাবন্দী রেখে। দেশবাসীর দাবি অতিসত্তর এর অবসান হোক।

লেখক : সিনিয়র আইনজীবী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi