২১ জুলাই ২০১৯

মগজে করুণ কান্না

মগজে করুণ কান্না - ছবি : সংগ্রহ

ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের সাথে পৃথক আলোচনার ভিত্তিতে ভারতবর্ষের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটন উপমহাদেশকে দুই ভাগ করে দিয়ে দুই পক্ষকেই সন্তুষ্ট(?) করে ইংরেজদের বিদায়ের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন। শেষ দিকে ভারত ছাড়তে ব্রিটিশরা মোটেও অনিচ্ছা প্রকাশ করেনি। ভাবটা এরকম ছিল, যেন যেতে পারলেই বাঁচে। ভারত ছাড়লে ইংরেজদের ক্ষতি নেই। তাদের বাণিজ্যের পথ তো রয়েই গেল। তারা বলত ‘আয়ারল্যান্ডে এটাই হয়েছে। স্পেন আর আরজেন্টিনায় তো আমাদের সাম্রাজ্য নেই, কিন্তু বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। বাণিজ্যের খাতিরে সাম্রাজ্য রাখতে হবে কেন?’ (অন্নদাশঙ্কর রায়, যুক্তবঙ্গের স্মৃতি, ১৩৯৯); ‘রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে গেলে এ দেশেও আমাদের বাণিজ্যের উন্নতি হবে’ (প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৫)। হয়েছেও তাই। তবে ইংরেজরা একটা কথা বলত- ‘স্বাধীনতা চেয়ে লাভ কী? তোমরা কি তা রক্ষা করতে পারবে’? দুঃখের বিষয়, আমরা স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে পারিনি।

আমরা যদি নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন আলজেরিয়ার মতো করতে পারতাম, তাতে হয়তো দশগুণ সময় লাগত, দশগুণ লোকক্ষয় হতো, কিন্তু প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের নাগরিকেরা স্বাধীনতার জন্য গৌরব বোধ করতে পারত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯টি মাসের ত্যাগ ও শ্রম যেন ব্যর্থ হয়ে গেছে। আর সেটাই অনেকের মর্মবেদনার মূল কারণ। আমরা মুক্তি সংগ্রাম করেছি, স্বাধীনতা অর্জন করেছি- এই বলে যতই গর্ববোধ করার চেষ্টা করি না কেন, কোথায় যেন কোন সুরটির তাল কেটে গেছে, আর তাই তা বেসুরো লাগে। জাতীয় গৌরববোধ যেন নিরেট পাথরের মতো শক্ত নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখেছি। যারা দেখেনি সেই নবীন প্রজন্ম কি ইতিহাস শিখবে জানি না। আমার বয়স সাতাত্তরে পা দিয়েছে, যুদ্ধকালে বয়স ছিল ঊনত্রিশ। জনগণ লক্ষ করছে, আমাদের দেশের ওপর একটি বৃহৎ দেশের আধিপত্য ও প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। সাবেক পাকিস্তান আমলে আমরা বলতাম আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। আজ প্রমাণিত হতে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি তো দূরের কথা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমাদের স্বাধীনতাহীন হতে হচ্ছে। তারা ক’জন জনগণের ভোট লাভের যোগ্য? কথা ঠিক, প্রধান দু’টি দলের মধ্যেই ক্ষমতা আবর্তিত হয়। এ দেশের মানুষ কি সত্যিই মর্যাদাহীন মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেল! এই স্বাধীনতার অর্থ আমাদের বোধগম্য নয়। দেশের মান রক্ষার পরীক্ষায় রাজনীতিকেরা বেশি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। আসলে কথা হচ্ছে, সর্ব ক্ষেত্রেই দেশে ত্যাগী মানুষের বড়ই অভাব। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে কত সাধারণ মানুষ আত্মোৎসর্গ করেছেন। সে রকম জাতিই আলাদা। স্বাধীনতার সোনার হরিণ তাদের হাতেই ধরা পড়ে।

আজ জাতি হিসেবে আমরা গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। মুসলিম অধ্যুষিত এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোকে ভেতর থেকে বদলে দেয়ার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান। কোনো দেশের মানুষগুলোকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারলে যে কি অসাধ্য সাধন করা যায় তার একটি উদাহরণ বিগত দিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আজকের রাশিয়া। ১৯১৭-এর বিপ্লবের পর এই মানুষ বদলের কাজটি সম্পন্ন করে দেশটি এক অনুন্নত অবস্থা থেকে উন্নয়নের উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, তেমনি সাম্প্রতিককালে সেই মানুষগুলোকেই উল্টো বদল করে দেশটিকে পর্বতের উচ্চ শিখর থেকে পর্বতের পাদদেশে নিক্ষেপ করা গেল। শত্র“পক্ষের সমরাস্ত্রের বিপুল ভাণ্ডার এবং পরে আনবিক বোমার হুমকি কিছুই যেমন বিপ্লবের পরে নতুন সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করতে পারেনি, ঠিক তেমনি নিজ দেশের সমরাস্ত্রের বিপুল ভাণ্ডার ও আনবিক বোমার ব্যুহ কিছুই তাকে ভাঙনের লগ্নে রক্ষা করতে পারল না। কারণ উভয় কাজই হয়েছে ভেতর থেকে মানুষ বদলের মাধ্যমে। অস্ত্রের হাত ততদূর প্রসারিত নয়। যেকোনো লক্ষ্য অর্জনে মানুষ বদলের কাজ যে কত জরুরি, তার সাক্ষ্য আছে ইতিহাসের পাতায়। জাতিগতভাবে আমাদের স্বকীয়তা রক্ষায় এ দেশে মানুষ বদলের কাজটি বিগত ৪৮ বছরের কোনো পর্যায়েই হাতে নেয়া হয়নি। কারণ নেতৃত্বও ঘুণে ধরা। সেই ঔপনিবেশিক যুগের রাজনীতি নিয়েই তারা ব্যস্ত। স্বাধীন দেশের রাজনীতি তারা রপ্ত করতে পারেননি। তারা মানুষ বদলাবেন কী করে?

দেশে মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান শিক্ষাঙ্গনগুলোর দিকে তাকানো যাক। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ও লেখালেখির ব্যাপারে নিরুৎসাহী এবং অমনোযোগী। আমাদের দেশের কারিকুলামটাই বা কোন ধাঁচের? বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যারা শিক্ষাঙ্গনের করিডোর মাড়ায়, মিছিলে, মিটিংয়ে সংগ্রামে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে তাদের কাউকে তো পিছিয়ে থাকতে দেখি না। সংখ্যায়ও তারা কম নয়। বার্ষিক নবীনবরণ বা প্রবীণ বিদায় উপলক্ষে শিক্ষাঙ্গনে পাশ্চাত্য ধাঁচের একটি ব্যান্ড শো হলে শ্রোতায় উপচেপড়ে। ভিডিও ক্যাসেটের দোকানগুলো তাদের পদচারণায় সরগরম। তবে বইয়ের দোকানে পাঠ্য বই কেনার মওসুম ছাড়া তাদের তেমন একটা দেখা যায় না। পাঠাগারগুলোতেও তারা প্রায় অনুপস্থিত- শ্রেণিকক্ষের মতোই। যা-ও দু-চারজন সেখানে যায় তারা সস্তা ও হালকা উপন্যাসে মনের ক্ষুধা মেটায়। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম, সমাজবিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বই তারা তেমন ছোঁয় না। সস্তা-সহজ জনপ্রিয়তাজীর্ণ ফুৎকারেই তারা তুষ্ট এবং ফুৎকারের ওপরই তাদের বেশির ভাগেরই জীবন। তাদের কলমে সাহিত্য সৃষ্টি হবে কী করে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তা তো দূরের কথা।

আরো একটি বিষয়ে তাদের প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত শীতের মওসুমে। সেটি পিকনিক বা ‘বন ভোজন’ নামে পরিচিত। হালে এর নতুন নামকরণ হয়েছে- ‘শিক্ষা সফর’। এরকম দু-চারটি সফরে শিক্ষার্থীদের সাথে যাওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। অবশ্য শিক্ষা লাভ করাই যদি এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে এ ধরনের ‘শিক্ষা সফর’ থেকে যে শিক্ষাটি পাওয়া যায় তা সুখকর কিছু নয়, অন্তত তাদের জন্য যাদের বিবেক বলে কিছু আছে। এই শিক্ষা সফরগুলোতে যেয়ে দুটো হৃদয়বিদারক বাস্তব শিক্ষা আমার হয়েছে। এক, গন্তব্য স্থানে পৌঁছার দূরত্বের একঘেয়েমি মোচনের জন্য দ্রুতগামী বাসের গতির সাথে তাল মিলিয়ে মাইকের বিকট শব্দযুক্ত কান বধির করা গান শুনতে বাধ্য হওয়া। দুই, শিক্ষা সফরে শিক্ষার্থীরা যখন আহার্য গ্রহণ করে তখনকার দৃশ্য। মধুপুরের গহিন অরণ্যেও দেখেছি সফরকারীদের খাবারের পূর্ণ থালা ঘিরে বিপুল সংখ্যক অস্তিচর্মসার শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ ক্ষুধার্ত মানুষের করুণ চাহনি। অনাহারক্লিষ্ট সেই সব মানুষের ক্ষুধার্ত চোখগুলো যেন শিক্ষার্থীদের খাবারপূর্ণ থালাগুলো কেড়ে নিতে চায়। এসব ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধার্ত সঙ্গীও আছে কুকুর। শহর থেকে আগত তরুণ-তরুণীদের খাবারের উচ্ছিষ্ট নিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ ও কুকুরের কাড়াকাড়ি। এটি একটি করুণ দৃশ্য বটে! লোকালয়েও এটা আমরা অহরহ দেখে থাকি। বিভিন্ন পিকনিক স্পটে ওইসব ক্ষুধার্ত মানুষ ও কুকুরের প্রতিযোগিতা নিবারণের ব্যবস্থা আছে। তারা ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। ব্যবস্থাটি সফরকারীদের জন্য স্বস্তিকর বটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো : ক্ষুধা-দারিদ্র্যপীড়িত নিরন্ন মানুষের এ দেশে ‘শিক্ষা সফর’, পিকনিক বা ‘বন ভোজনের’ নামে এরূপ বিলাসিতা কি সাজে?

এ শীতের মওসুমেই আমাদের বিজয় দিবস ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল দিবস দু’টি আসে। এর কিছু দিন পরেই আসে স্বাধীনতা দিবস। এই তিনটি দিবসই অজস্র তরুণ, যুবক ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের রক্তে স্নাত। ত্যাগ ও তিতিক্ষায় গরীয়ান। কিন্তু কই এসব দিনে তো শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন কোনো উদ্দীপনাময় কর্মোদ্যোগ দেখি না! ‘শিক্ষা সফরে’ যাওয়ার জন্য যে বিপুল প্রতিযোগিতা ও উদ্দীপনার ঝড় বয়ে যায় তার শতাংশের একাংশও উৎসাহ লক্ষ্য করা যায় না- এই দিন ক’টি যথাযথভাবে উদ্যাপনে বা এসব দিনের মর্মকে জীবনে ধারণ করার ক্ষেত্রে। সারা দেশজুড়ে এ দিনগুলোকে ঘিরে তরুণ-প্রৌঢ়ের চলে কত রকমারি পণ্যের কেনাবেচা।

শহীদেরা তাদের জীবনকালে জাগ্রত যৌবনের যে সুমহান আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনপাত করলেন তার মূল্য কি হবে এই যে, তাদের মৃত্যু-দিনে কিংবা বিজয়ের দিনে প্রতিবার একদিন ফুল দিয়ে বছরের বাকি দিনগুলোতে তাদের ভুলে থাকা? শহীদের আত্মদান থেকে কিছুই কি আমাদের শিক্ষণীয় নেই? তাদের জীবনাচরণ কি আমাদের জীবনকে কোনোভাবেই স্পর্শ বা ঋদ্ধ করবে না? আমরা শুধু তাদের আত্মদানের মহান আদর্শের কথাই চড়া গলায় বলব? আমাদের জীবনাচরণে সেই মহান আদর্শের কিছুই প্রতিফলিত হবে না? আজকের তরুণদের, যুবকদেরসহ সবার কর্মকাণ্ড সেই প্রশ্নকেই বড় করে তোলে।

পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব আজ আমাদের সমাজে পুরোমাত্রায় বিকশিত ইন্টারনেট ও ডিশ অ্যান্টেনার বদৌলতে শহরে এবং গ্রামে। মর্মান্তিক সত্য এই যে, ওসব দেশের দোষগুলো যেভাবে আমাদের আক্রমণ করেছে এবং তাদের আমরা যেভাবে সাদর আমন্ত্রণে গ্রহণ করেছি তার তুলনায় তাদের গুণগুলোর প্রায় কিছুই আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি। ‘রোগটাই সংক্রামক,স্বাস্থ্যটা নয়’। সেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যা-জ্ঞান ও শৃঙ্খলার যে চর্চা হয়, তার সিকি ভাগও আমরা আয়ত্ত করতে পারেনি। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের সজীব সৃজনশীল কোমল হৃদয়কে পঙ্গু করে দিতে, নিজেদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য বিস্তারের যে কুৎসিত কৌশলগুলো তারা আমাদের মতো দেশগুলোতে পাচার করে দিয়েছে, আমাদের তরুণ-তরুণী এবং তাদের মা-বাবারা তারই শিকার, তাকেই আশীর্বাদ বলে গ্রহণ করছে। তাদের ভালোটা নিজ দেশে যক্ষের ধনের মতো স্থিত এবং সুরক্ষিত, খারাপটা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ বোধ জাগ্রত হওয়ার মতো শিক্ষা তরুণ-তরুণীরা পাচ্ছে না- কেউ দিচ্ছে না। দেশের তরুণ সমাজের কল্যাণকামীরা আজ নিরুৎসাহিত ও হতাশাগ্রস্ত।

যে স্বাধীনতার কথা আমরা বলি, তা যে- যা খুশি, তাই করা নয়, এ কথাটি বলার লোকের আজ খুব অভাব। অথচ ধনী হওয়ার অজস্র দুয়ার অবারিত। কিন্তু সঠিক ও শুদ্ধ পথটি কেউ গ্রহণ করতে রাজি নয়। যে উদ্যম ও সততা একটি মানুষের বৈভবকে শত সহস্র মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করতে পারে, সেই পথে বলতে গেলে, কেউ নেই। উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা সব কুৎসিতকেই উন্মুক্ত করে দিয়েছে- সৌন্দর্য ও বিবেককে নয়। আজ স্বাধীনতার এমনই একটি দুঃসময় আমরা অতিক্রম করছি যখন মানুষের সব রকমের সুকুমারবৃত্তি ও সৃজনশীলতা অশুভের প্রচণ্ড চাপে নিষ্পেষিত। সব চেয়ে বেদনাদায়ক হলো- এসব ক্লিন্নতার কথা আমাদের তরুণ-তরুণীরা বুঝতেও পারছে না; বুঝতে চাচ্ছেও না। এমনই অন্ধত্ব আজ তাদের গ্রাস করেছে। গ্রাস করেছে তাদের মা-বাবাদেরকেও। বৈরীশক্তি এ অপকৌশলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের মানুষ স্বকীয়তা হারিয়ে তাদের অনুকূলে বদলে যাচ্ছে।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi