২৩ জুলাই ২০১৯

সংবাদপত্র শিল্পের ‘কালো দিবস’

-

একদলীয় ব্যবস্থা ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠাকালে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান সরকার নিয়ন্ত্রিত চারটি পত্রিকা ছাড়া দেশের বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সাংবাদিক সমাজ প্রতি বছর এ দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছর পার না হতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কোনো আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের মধ্যে জাতীয় সংসদে আনা হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ওই সংশোধনীর ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশালের’ জগদ্দল পাথর। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ১৬ জুন বিতর্কিত সরকার জারি করে ‘দ্য নিউজপেপার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’। সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা নয়, এমনকি কেবল নিয়ন্ত্রণও নয়, ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিধনের লক্ষ্যেই ওই আইন প্রবর্তন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে সরকারের খবর ‘সেন্সরে’ লিখিত-অলিখিত অনেক বিধিনিষেধ ছিল।

সংবাদপত্রে অনেক কিছুই লেখা যেত না। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওই কৃষ্ণ অধ্যায়ের সময়ে সরকারের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে প্রায় আট হাজার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হয়েছিলেন। বেকার অবস্থায় দীর্ঘ দিন সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে বহু সংবাদপত্রসেবীকে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। ‘কালো’ ১৬ জুনের পর সারা দেশে চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চারটি দৈনিক পত্রিকা বের হতো। এগুলো হলো- দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস। যে ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগকে সমর্থনের জন্য, সে পত্রিকার প্রায় দুই যুগের ইতিহাস মুছে ফেলে সরকারের নির্দেশে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখতে হয়েছিল ‘প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা’। অবশ্য ১৫ আগস্টের পর ইত্তেফাক ২৪ আগস্ট আগের সিরিয়ালে ফিরে আসে আটষট্টি দিন পর এবং দৈনিক বাংলা তার আগের সিরিয়ালে ফিরে যায় ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর।
একই দলের সরকার সংবাদপত্রের দমন-পীড়নের কাজটি পরেও করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রথমবারের সরকার ১৯৯৯ সালে টাইম-বাংলা ট্রাস্টের চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে প্রায় ৫০০ সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পথে বসায়। বিগত ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে ‘চ্যানেল ওয়ান’, ‘দিগন্ত টেলিভিশন’, ‘ইসলামিক টিভি’, ‘দৈনিক আমার দেশ’সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমের ওপর দমননীতি প্রয়োগ করা হয়।

সাংবাদিক ‘যায়যায় দিন’ খ্যাত শফিক রেহমান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ ও আমার দেশ পত্রিকার নির্ভীক স¤পাদক মাহমুদুর রহমানসহ বহু সাংবাদিককে জেলে বন্দী ও নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি নৃশংস খুনের শিকার হতে হয়েছে অনেক সত্যানুসন্ধানী কোনো কোনো কলমসৈনিককে। সরকারের দুর্নীতি ও আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই অগণতান্ত্রিক রোষের কবলে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী ও ফরহাদ খাঁ হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও এবং দীর্ঘ দিন পার হলেও খুনিরা ধরা পড়েনি। এবার বিশ্বগণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের দুই ধাপ অবনমন ঘটেছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার সাথে খোদ সরকার বা ক্ষমতাসীন দলীয় সংসদ সদস্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের যোগসূত্র থাকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির এতটুকু উন্নতি ঘটছে না।

বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সক্রিয়, ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ ১৮০টি দেশের গণমাধ্যম পর্যালোচনা করে গত ২৬ এপ্রিল যে সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়Ñ বিশ্বে স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়েছে। সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৪৮.৩৬, যা গত বছর ছিল ৪৫.৯৪। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানায়, ‘বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী সরকারের উত্থানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে। এর আগে এমন হুমকিতে আর কখনো পড়তে হয়নি।

ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, ’৭৫ আর বর্তমান শাসনামলের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে অহেতুক বিড়ম্বনা এড়িয়ে চলতে গণমাধ্যম নিজেরাই সেন্সরশিপ করছে। সংবাদপত্রগুলোতে উন্নয়ন স্তুতি গাওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, দুর্নীতি, লুটপাট, জনবিরোধী চুক্তি, পরিবেশবিরোধী প্রকল্প ইত্যাদি ব্যাপারে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চায় পাঠকরা।


আরো সংবাদ

সকল




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi