২০ জুন ২০১৯

ভারতের জাতীয় নির্বাচন ও কিছু প্রত্যাশা

সম্প্রতি ভারতের ১৭তম জাতীয় বা লোকসভা নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফলাফল অনেককে বিস্মিত করলেও এটা ছিল কাক্সিক্ষত। কারণ সমগ্র পৃথিবীতে রাজনৈতিক আদর্শের মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক বলয়ের দেশগুলো গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ‘গণতন্ত্রের সূতিকাগার’ আমেরিকায় বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদের চেতনা বিস্তার লাভ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যেকোনো মতের প্রতি সমর্থন জানাতে ‘লোকরঞ্জনবাদ’ নামে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। এর সমর্থকেরা মনে করছেন, এটা আব্রাহাম লিংকনের গণতান্ত্রিক চেতনার ‘নবতর সংস্করণ’। এ চেতনার আলোকে ন্যায়-অন্যায় বা কল্যাণ-অকল্যাণের কথা বিস্মৃত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে আমেরিকায় বর্ণবাদের আবার বিকাশ ঘটেছে।

সে কারণে সমগ্র পৃথিবীতে কট্টর জাতীয়তাবাদী চেতনা বা উগ্র বর্ণবাদের বিস্তার ঘটেছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বসহ সর্বত্র বর্ণবাদী সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী ধর্মনিরপেক্ষবাদ বা অহিংসার মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতবর্ষ বহু ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মিশ্রণে এক বিশাল দেশ। এমন বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলন অন্য কোনো দেশে নেই। এসব জাতিগোষ্ঠী ধর্ম ও বর্ণকে এক করে মহাত্মা গান্ধী শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. সুকর্নের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে পৃথিবীতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক রেখে ভারত সব সময়ই তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘জোটনিরপেক্ষতার’ আদর্শ দৃশ্যত সমুন্নত রেখেছে। বর্তমানে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারত রাশিয়া ও আমেরিকা উভয়ের সাথে সুকৌশলে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি এক বিস্ময়কর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্বনির্ভর জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। বিগত ১৬তম নির্বাচনে তার নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটানো। সাম্প্রতিক ১৭তম নির্বাচনে তিনি বক্তব্য কিছুটা পরিবর্তন করেছেন। তিনি ‘শক্তিশালী ভারত’ গঠন করার আহ্বান নিয়ে দেশবাসীর সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন। গরিষ্ঠ দেশবাসী তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার আসনে আসীন করেছে। নির্বাচনে তিনি বাহ্যিকভাবে হলেও, ধর্ম-বর্ণ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সবার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।

ভারত বহু ধর্ম ও বর্ণে বিভক্ত জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ মুসলিম যারা বংশপরম্পরায় ভারতের অন্য সবার সাথে একাত্ম হয়ে বসবাস করে আসছে। ভারতীয় শাসকেরা দাবি করেন, তারা সব ধর্ম ও বর্ণের জনসাধারণকে সমান দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত, দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য ছাত্র দ্বীনি শিক্ষা লাভ করে চলেছেন। বর্তমানে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধর্ম প্রচারক সংস্থার নাম তাবলিগ জামাত। এর কেন্দ্রীয় পরিচালনা অফিস দিল্লির নিজামুদ্দীনে অবস্থিত। হিন্দু ও মুসলিম ছাড়াও শিখ, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, পারসি, জৈনসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১২৫ কোটি মানুষ ভারতে বাস করছেন। এ বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর ঐক্যই শক্তিশালী ভারত গঠনের মূল হাতিয়ার। আগামী দিনে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারতের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করবে, মানবদরদি মহলের সেটাই কাম্য।

বাংলাদেশের সীমান্ত সমস্যা যা বিগত ১৯৪৭ সাল থেকে ঝুলন্ত ছিল, সে সমস্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সহযোগিতায় সমাধান করেছেন। এর মাধ্যমে অর্ধশতাধিক ছিটমহলসহ সিলেটের সীমান্তরেখার সমাধান হয়েছে। এ চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারতের বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির ফল। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, এ আশা জনগণের। বর্তমানে এশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। উত্তর কোরিয়ার সাথে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক বহু দিন ধরে উদ্বেগজনক। ইরানের সাথে সৌদি আরবের অত্যন্ত বৈরী সম্পর্ক বিরাজমান। পশ্চিমা বিশ্ব ইরান সংলগ্ন হরমুজ প্রণালীতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। ইসরাইল এতে মদদ জোগাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রত্যাশিত ভূমিকা এশিয়ার বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।


আরো সংবাদ