২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনী জরিপের ব্যর্থতা ও ভারতের বুথ ফেরত জরিপ

অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনী জরিপের ব্যর্থতা ও ভারতের বুথ ফেরত জরিপ - ছবি : সংগ্রহ

অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিন বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনের আরেকটি দিক হলো- সেখানকার ভোটারদের ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের সবাই ভোট দেবে, নতুবা ২০ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা গুনতে হবে। চলতি বছরের নির্বাচনে দেশটির এক কোটি ৬৪ লাখ ভোটার দেশজুড়ে প্রায় সাত হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। জাতীয় নির্বাচনে নিম্ন কক্ষের ১৫১টি আসনের সবগুলোতে এবং সিনেটের ৭৬টির মধ্যে ৪০টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনের আগে করা জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন ভোটাররা।

মজার বিষয় হলো- দেশটিতে ২০০৭ সালের পর এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল লিবারেল-ন্যাশনাল পার্টি টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য লড়াই করছেন। গেল শনিবার অস্ট্রেলিয়ার ৪৬তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী পুনরায় নির্বাচনে জিততে চলেছেন ক্ষমতাসী লিবারেল-ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বধীন জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একে অলৌকিক ঘটনা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও বলছেন মিরাকল। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নির্বাচনে সত্যিই যেন অলৌকিক এক ঘটনা ঘটে গেছে। কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি, সেখানে নতুন করে নির্বাচিত হবে প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের ক্ষমতাসীন জোট। এরই মধ্যে মোট শতকরা ৭০ ভাগের বেশি ভোট গণনা করা হয়েছে। তাতে স্কট মরিসনের কোয়ালিশন বিজয়ী হয়েছে অথবা এগিয়ে আছে ৭৪ আসনে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৭৬ আসন। অন্য দিকে, লেবার পার্টি জয়ী হয়েছে অথবা এগিয়ে আছে ৬৬ আসনে।

এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপের আভাস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের লিবারেল-ন্যাশনাল জোট ও বিরোধীদলীয় নেতা বিল শর্টেনের মধ্য-বামপন্থী অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টির (এএলপি) মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলা হয়েছিল। ভোটের আগে করা এসব জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিরোধী দল লেবার পার্টিই এগিয়ে ছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষে পাওয়া ফলাফলের সাথে সে জনমত জরিপের কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এর আগে নিজ দলের ভেতরে বিদ্রোহের কারণে মাত্র ৯ মাস আগে দলীয় নেতৃত্ব হারান ম্যালকম টার্নবুল। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রিত্ব। গত বছর আগস্টে দলের নেতা নির্বাচনের ভোটাভুটিতে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোগী স্কট মরিসনের কাছে হেরে যান তিনি। ওই হারের পর টার্নবুল পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হন মরিসন। টার্নবুলের সাথে সব ধরনের তিক্ততা মিটিয়ে ফেলেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মরিসন বলেন, অল্প সময় হাতে পেলেও তিনি দল অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে মরিসন অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা বিল শর্টেনও জয়ের আশাবাদী ছিলেন। এছাড়া জরিপেও তিনি এগিয়ে ছিলেন। গত ছয় বছর তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন। ক্ষমতায় গেলে জলবায়ু পরিবর্তন, জীবনযাপন ব্যয় ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দেবেন।

দেশটির বিভিন্ন জরিপ সংস্থার করা জরিপে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে ছিলেন বিরোধী দল লেবার পার্টি। এমনকি সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকায় ভোটের আগের দিন প্রকাশিত জরিপে ক্ষমতাসীন জোটের চেয়ে লেবার পার্টি দুই শতাংশ ভোট বেশি পাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনে মতামত জরিপের ব্যর্থতা সম্পর্কে নানামুখী প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় ও ব্রিটেনের ব্রেক্সিট ইস্যুতেও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল মতামত জরিপ। এরই মধ্যে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ৭ দফা ভোট গ্রহণের পর ভোট ফেরত জনমত জরিপ অনুযায়ী আবারো ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট।

ভারতে ভোট গ্রহণ শেষে প্রাপ্ত চারটি বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে- বিজেপির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) বড় ধরনের বিজয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে ‘আঁচ’ পাওয়া যাচ্ছে। এসব জরিপে অনুমান করা হচ্ছে, বিজেপির নেতৃত্বে জোট ২৮০ থেকে ৩১৫টি আসনে জয়লাভ করবে।

বিরোধী দল কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপি জোট অনেক এগিয়ে আছে বলে বুথ ফেরত জরিপে বলা হচ্ছে। তবে নেলসন-এবিপি নিউজের যৌথ জরিপে বলা হচ্ছে, বিজেপি জোট ২৬৭টি আসনে জয়লাভ করবে, যেটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে কম।
উত্তর প্রদেশে বিজেপি জোট ব্যাপকভাবে পরাজিত হবে বলে এই জরিপে আভাস মিলছে। এই প্রদেশে ৮০টি সংসদীয় আসন রয়েছে। ভারতের অন্য যেকোনো প্রদেশের চেয়ে উত্তর প্রদেশে আসন সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইটার বার্তায় নির্বাচন কমিশনের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নরেন্দ্র মোদির সাথে আপস করেছে। অন্য দিকে, মমতা ব্যানার্জি বলেন, বুথ ফেরত জরিপ ‘গুজবের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কারসাজি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে’।

অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মতামত জরিপ যেভাবে ভুয়া প্রমাণিত হলো, তেমন কোনো ঘটনা ভারতেও ঘটতে যাচ্ছে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।


আরো সংবাদ