২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকার গড়লেও স্বস্তিতে নেই ম্যান্ডেলার দল

দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকার গড়লেও স্বস্তিতে নেই ম্যান্ডেলার দল - ছবি : সংগ্রহ

দক্ষিণ আফ্রিকা নামটি শুনলেই মনে পড়ে নেলসন ম্যান্ডেলার কথা। মারা যাওয়ার কয়েক বছর পরও দেশটিতে তার প্রভাব অন্যরকম। তাই তো ম্যান্ডেলা যে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, ২৫ বছর দেশ শাসনের পর দলটি আবারো নিশ্চিত করেছে সামনের মেয়াদের ক্ষমতা।

দেশটিতে ষষ্ঠবারের মতো পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ৮ মে। এর ফল ঘোষণা করা হয় ১১ মে। তাতে দেখা যায় ক্ষমতাসীন দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) পেয়েছে ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার (ইএফএফ), তাদের দখলে ছিল ভোটের ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সর্বমোট ৪০টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও মাত্র পাঁচটি দল ছাড়া বাকি সবার অর্জন ভোটের এক শতাংশের নিচে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্টে সর্বমোট ৪০০টি আসন; একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২০১ আসনের প্রয়োজন। দেশটির নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ব্যালট পেপারে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকে একটি দল বেছে নেন ভোটাররা। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলো ৪০০ সদস্যকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য মনোনীত করে। ওই আইন প্রণেতারাই পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে থাকেন।

এবারের ষষ্ঠ পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল এএনসি এক কোটি ভোট পেয়ে ২৩০টি আসন লাভ করেছে; যদিও গত নির্বাচনে ২৪৯ আসন পেয়েছিল। সে হিসাবে তাদের ১৯টি আসন কম পেতে হয়েছে এবার। প্রধান বিরোধী দল ডিএ ৩৬ লাখ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে ৮৪টি আসন লাভ করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাদের আসন ছিল ৮৯টি। তবে এবারের নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত জুলিয়াস মালেমার দল ইএফএফ। ১৮ লাখ ভোট পেয়ে ইএফএফ পার্লামেন্টে তাদের উপস্থিতি আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ করে ৪৪টি আসন লাভ করে। তাদের আগের আসন ছিল ২৫টি।

অন্য দলগুলোর মধ্যে, আইএফপি পার্লামেন্টে গতবারের ১০টি আসন থেকে বাড়িয়ে ১৪টি করেছে। এফএফপ্লাস গতবারের চারটি থেকে বাড়িয়ে এবার ১০ আসন পেয়েছে। এসিডিপি চারটি আসন জিতেছে এবং ইউডিএম জিতেছে তিনটি আসন। রাজনীতিতে নতুন দল হিসেবে গুড পার্টি ও এটিএম দুটি করে আসন জিতেছে। এনএফপি, এআইসি ও সিওপিই দলীয় দুটি আসন নিয়ে পার্লামেন্টে থাকবে। এ ছাড়াও পিএসি ও আল-জামা একটি করে আসন পেয়েছে।

বিগত পাঁচটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২৫ বছর দেশ শাসন করেছে বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)। কিন্তু বিগত ২৫ বছরে সে দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে খুব সন্তোষজনক বলার সুযোগ নেই। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি মেলেনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। এর পাশাপাশি রয়েছে দলটির নেতৃস্থানীয়দের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ। সব মিলে এএনসির সমর্থন কমে আসায় শাসন ক্ষমতায় ফেরার প্রশ্নে মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) ও ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটারস (ইএফএফ) নামের দুটি রাজনৈতিক দলের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এএনসি।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাধারণ নির্বাচনে নেলসন ম্যান্ডেলার এএনসি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ভোট দেয়ার পর এএনসির শীর্ষ নেতা ও প্রেসিডেন্ট সেরিল রামাফোসা ওই বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছিলেন, জনগণের ভোট দেয়ার যে উচ্ছ্বাস, তা আমাদের ১৯৯৪ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ২৫ বছর আগেও ভোটাররা এই রকম আবেগেই দেখিয়েছিলেন। দেশটির কুখ্যাত বর্ণবাদী অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সে সময় যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে ৮৬ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিল। ম্যান্ডেলা তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, সে সময় ভোটারদের মধ্যে অন্য রকম এক উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনে মাত্র ৪৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ১৯৯৪ সালে যে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা ভোটারদের পরিচালিত করেছিল, এখন সে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার স্থানে আসলে এখন জায়গা করে নিয়েছে এক রাশ হতাশা।

মূলত এএনসি এ ক্ষতিটা করে দিয়ে গেছেন রামাফোসার পূর্বসূরি জ্যাকব জুমা। তার অধীনে দেশ পরিচালনার সময় দেশে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং মন্দাবস্থায় আক্রান্ত হয় দেশের অর্থনীতি। বেকারত্ব ও বৈষম্যের মাত্রা বিশ্বে সর্বোচ্চে গিয়ে পৌঁছে। ফলে যুবসমাজ পড়ে বিভ্রান্তিতে। তারা তুলনা করতে থাকে বর্ণবাদ-পরবর্তী সমাজই ভালো, না আগেরটাই ভালো ছিল।

সব মিলিয়ে এএনসির অবস্থা খুবই খারাপ অবস্থায় পৌঁছে যায়। এর ফলে ২০১৪ সালে যে দলটি ৬২ দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার তা নেমে আসে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশে। এবারই প্রথমবারের মতো দলটির সমর্থন ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আগে একচেটিয়া যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটগুলো এএনসির বাক্সে জমা হতো, এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এএনসির শতকরা পাঁচ শতাংশের মতো ভোট এবার চলে গেছে বামপন্থী ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্সে (ইএফএফ)। এ দলটি ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেখানে ছয় দশমিক চার শতাংশ ভোট পেয়েছিল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে তারা লাভ করে ১০ দশমিক আট শতাংশ ভোট। তিনটি প্রদেশে তারা এখন দ্বিতীয় জনপ্রিয় দলের জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দলটির পরিসর ছোট দেখালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলই দেখছেন। কারণ এ দলটিকে যারা পছন্দ করছেন, তারা কেবল নিম্নশ্রেণীর-অশিক্ষিত লোক নন, বরং তাদের মধ্যে অনেক ছাত্র ও গ্র্যাজুয়েটও দেখা যাচ্ছে।

গত ৮ মে বুথ ফেরত জরিপে ভোটাররা ইএফএফকে ভোট দেয়ার কারণ বলতে গিয়ে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দুর্বল ও ভুল নীতি-সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন। সে দিক দিয়ে বরং ইএফএফকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল দল বলে মনে করেন তারা। তাদের প্রত্যাশা অচিরেই ইএফএফ একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

নির্বাচনে সামান্য হলে ভালো করেছে নিচের দিকে থাকা ফ্রিডম ফ্রন্ট প্লাস (এফএফ+) এর আগে যেখানে তারা দুই দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়েছিল, সেখানে এবার তাদের অর্জন সামান্য একটু এগিয়ে দুই দশমিক চার শতাংশে। এ দলটি মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের পক্ষে কথা বলে। গত বছর শ্বেতাঙ্গদের জমিসহ অন্যান্য সম্পদ কব্জা করে নেয়া হয়েছিল। স্বভাবতই তাতে ক্ষুব্ধ হয় দীর্ঘ দিন ধরে দেশটিতে প্রভাব বিস্তার করে থাকা এ সম্প্রদায়টি। আগে তাদের পক্ষে কথা বললেও ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স এবারে শ্বেতাঙ্গদের অধিকার রক্ষায় সেভাবে আওয়াজ তোলেনি। ফলে শ্বেতাঙ্গরা ওই অ্যালায়েন্স থেকে তাদের আড়াই লাখ ভোটারকে সরিয়ে নেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদারা এখনো কালোদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও আনুপাতিক হারে অধিক ভূমির মালিক। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এসব সঙ্কট কমিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে তিনি তা পারেননি বলে দাবি বিরোধীদের। দেশটিতে ৭৯ দশমিক চার শতাংশ কালো বা ভিন্ন বর্ণের বিপরীতে সাদা বর্ণের নাগরিক মাত্র নয় দশমিক দুই শতাংশ।

তবে এএনসি যে বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে, সেগুলোর জন্য দায়ী ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা। অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে, শেষ পর্যন্ত নিজের দল এএনসির চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ৭৫ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটে।

২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে একের পর এক দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পরেন জুমা। তবে ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে জুমাকে পদত্যাগে বাধ্য করার অন্যতম কারণ ছিল, ভারতীয় বংশোদ্ভূত ধনী ব্যবসায়ী গুপ্ত পরিবারের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রভাবশালী এ পরিবারের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জুমার সাথে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। দেশের ফ্রি স্টেট প্রদেশের দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের সহায়তা করার জন্য এস্তিনা ডেইরি ফার্ম নামে একটা প্রকল্প করার সময় লাখ লাখ ডলার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে জ্যাকব জুমা ও গুপ্ত পরিবারের বিরুদ্ধে। জুমার পুরো শাসন আমলেই অবশ্য এএনসির ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে ২০০৪ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে এএনসির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে।

এএনসির নিম্নগামিতার বিপরীতে অন্য দলগুলোর যেভাবে উত্থান হচ্ছে, খুব শিগগির না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা দলটির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে এবার সরকার গঠন করে দেশ ও দলের জন্য কী কর্মসূচি নেন রামাফোসা, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ।


আরো সংবাদ