১৮ অক্টোবর ২০১৯

নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়ার মতো?

সংবিধান মোতাবেক ২০১৪ সাল থেকে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রবর্তিত হয়েছে এবং ২০১৮-১৯ সালে যা পূর্ণতা পেয়েছে, তা বাস্তবে উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থা অনুরূপ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, উত্তর কোরিয়ায় অভিনব এক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু আছে; যা সেই দেশের সংবিধান মোতাবেক বৈধ। যেমন- আমাদের দেশের ভোটারবিহীন নির্বাচন, দিবারাত্রি পুলিশ প্রহরায় ব্যালটে সিল মেরে অস্বচ্ছ ব্যালট দ্বারা স্বচ্ছ বাক্স ভর্তি করে নির্বাচনে ‘জয়লাভ’ করাও বৈধ ঘোষিত হয়েছে। উত্তর কোরিয়ায় সরকারি দল ছাড়া আরো দুটি রাজনৈতিক দল থাকলেও সে সব দল থেকে কতজন প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন তা ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

আমাদের দেশেও সরকারি দল এটা ঠিক করে দেয়া শুরু হয়েছে। তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন, কোন দল বিরোধী দল হবে এবং সেই দল থেকে কতজন মনোনয়ন পাবেন। ‘বিরোধী দলে’র নেতার ক্ষমতা ওই সব আসনে মনোনয়ন দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন আমাদের দেশে কোথাও একজন প্রার্থী থাকায় ভোটদানের প্রয়োজন পড়ে না অথবা প্রাথী দুই-তিনজন থাকলে কোথাও গভীর রাতে পুলিশ প্রহরায় ব্যালট বাক্স পূর্তির কর্মটি সম্পন্ন করা হয়। মিডিয়া ও বিদেশী পর্যবেক্ষকদের দিকে চেয়ে, ভোটকেন্দ্রের অনেক দূরে পাহারা বসিয়ে ভোটারদের বাধা দিয়ে ভোটকেন্দ্রে ক্যাডার বাহিনী লাইনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলার দৃশ্য প্রচার করা হয়। এই ফাঁকে বুথের ভেতরে সিল মেরে বাক্সবন্দী করে ৮০-৯০ শতাংশ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়।

উত্তর কোরিয়ায় সিল দেয়া ব্যালট ভোটারদের সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ভোটারকে ওই ব্যালট গ্রহণ করে রক্ষিত বাক্সে প্রকাশ্যে ফেলার পর ভোট দান করতে পারার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রতি কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত নাচগানের আসরে শামিল হতে হয়। ভোটদান বাধ্যতামূলক হওয়ায় প্রতি কেন্দ্রে দুই-একজন ভোটার অনুপস্থিত থাকলে তারা গোপনে দেশ ত্যাগ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে গেছে ধরে নিয়ে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তল্লাশি চালানো হয়।

আমাদের দেশে গত ১১ মে ২০১১ প্রধান বিচারপতি কাস্টিং ভোটে চার-তিন সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দেয়া রায় অনুযায়ী নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অসংবিধানিক বলে ঘোষিত হয়। ক্ষমতাসীন সরকার যারা বিরোধীদলে থাকাকালে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৪ সালে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে ১৯৯৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৭৩ দিন হরতাল পালন করেছিল। তারাই গত ৩০ জুন ২০১১ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নিজেরা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার ‘সাংবিধানিক রক্ষাকবচ’ অধিগ্রহণ করেছেন।

সেই অনুযায়ী ২০১৪ সাল থেকে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে, তা অনেকটা উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থার অনুরূপ বলে দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য হলো, ভোটদান করতে পারার উল্লাস প্রকাশের অধিকার সরকার সমর্থকদের মধ্যে সীমিত। সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশ করার অধিকার নেই। উত্তর কোরিয়ার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রকাশ্যে সরকারি দলের পক্ষে কাজ করার ‘অধিকার’ আছে। আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনসহ সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার ভান করলেও বাস্তবে প্রায় সবাই সরকারি দলের পক্ষে কাজ করেন। উত্তর কোরিয়ায় এইরূপ অভিনব নির্বাচন ব্যবস্থা চালু থাকায় কিম বংশ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ৭০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে বিধায় বিশ্বের ১ নং পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পারমাণবিক বোমামুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গত ৮ মাসের মধ্যে দ্ইুবার প্রাচ্যের সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম ছুটে এসে প্রেসিডেন্ট কিম জং উনয়ের সাথে বৈঠক করেছেন।

উত্তর কোরিয়ার সংবিধানে অনুরূপ নির্বাচনব্যবস্থা উল্লেখ থাকায় পশ্চিমা বিশ্ব ওই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করে না। তবে আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ শাসনের অধিকারী- এ কথা লেখা থাকায় এ দেশের নির্বাচন নিয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলো নানা প্রশ্ন তুলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিব্রত করার সুযোগ পায়। তবে আমাদের সরকারও কম যান না। তারাও বলে থাকেন মিসর, ইরাক ও আফগানিস্তানের চেয়ে আমাদের নির্বাচন বিশুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অধিকার পশ্চিমা বিশ্বের নেই। কাজির গরুর সংখ্যা যেমন কেতাবে লেখা থেকে কোনো লাভ নেই, তেমনি অবাধে ভোট দেয়ার অধিকার জনগণের মৌলিক অধিকার; এ কথা কেবল সংবিধানে লেখা থাকায় জনগণের কী লাভ?

ক্ষমতাসীন দলের নেতা ঠিক করে দিচ্ছেন কোন দল বিরোধী দলে কতটি আসন নিয়ে বসবে এবং তাই হচ্ছে। সেহেতু সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এ কথা সংবিধানে লেখা থাকা এখন অর্থহীন। ২০১৪ সালে বলা হলো বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এবং পাঁচ শতাংশ ভোটে বাকি ১৪৬ জন নির্বাচিত হওয়ার দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায় না। এর সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব বিএনপির। সাথে সাথে সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীরা একই সুরে বললেন- ঠিক ঠিক, তাই তাই। সরকারি প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলীয় প্রধানের স্বাক্ষরে প্রার্থী মনোনীত হওয়ায় তাদের জয়ী করা প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের ‘নৈতিক দায়িত্ব’ হয়ে পড়ায় বিরোধী দল ওই নির্বাচন বর্জন করেছে।

ফলে একদলীয় নির্বাচনে ২৫ শতাংশ উপজেলায় ‘বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ জয়ী হওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। বাকিগুলোতে নির্বাচন হলেও একই দলের একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রার্থী ও দুই-তিনজন বিনা লাইসেন্সের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় হানাহানি ও সংঘর্ষের ঘটনাসহ রাতের আঁধারে ব্যালটে সিল মারার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তাই কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রিজাইডিং অফিসার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ ওইসব প্রার্থী সরকারি দলের। প্রিজাইডিং অফিসার স্কুল-কলেজের শিক্ষক, চাকরি রক্ষার্থে তিনি বাধ্য হয়ে রাতে ভোট কাটার বিষয়টি রিপোর্ট করেছিলেন। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে হয়েছে উল্টোটা। কারণ রিপোর্ট করলে চাকরি খোয়াতে হতো। উপজেলা নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতে অনেক উপজেলায় নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া হলেও সংসদ নির্বাচনে ৪২ হাজার কেন্দ্র থেকে একজন প্রিজাইডিং অফিসারও রাতে ব্যালট বাক্স পূর্তির ব্যাপারে রিপোর্ট করেননি।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিরোধী দলকে মরিয়া হয়ে প্রমাণ করতে হলো, তারা ‘২০১৪ সালে জীবিত ছিল’। নির্বাচনের সময় তাদের প্রচারণায় বাধা এবং প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের নামে গায়েবি মামলা দিয়ে মাঠছাড়া করা হয়েছিল। নির্বাচনের চারদিন আগে গ্রামে গ্রামে বিরোধী দলের সমর্থকদের পুলিশ দাবড়িয়ে বেড়িয়েছে। সরকারি দলের ইউপি-উপজেলা-জেলাপরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরমেয়র ও কাউন্সিলরদের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে ও মহল্লায় এই কাজ সম্পাদন করেও জয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারায় গভীর রাতে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স অস্বচ্ছ ব্যালট দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল। বাকিটুকু দিবাভাগে সম্পূর্ণ করার ব্যবস্থা করা হলো। নির্বাচনের পর বলা হলো, বিরোধী দল নির্বাচনে প্রচারণা চালায়নি। তারা ৩০০ আসনেই মনোনয়নবাণিজ্য করেছিল। তাই জনগণ তাদের ভোট দেয়নি। সাথে সাথে অনুগত বুদ্ধিজীবী ও সুশীলসমাজ একই সুরে বললেন- ঠিক ঠিক, তাই তাই। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখভালের জন্য হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নামে একটি সংগঠন আছে যারা নির্বাচনে ‘অবাধে ভোট দেয়ার সুযোগ পাওয়া’র জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিলেন। তাদের মতে, গয়েশ্বর রায়, সুব্রত চৌধুরী, নিতাই রায়, গৌতম চক্রবর্তী এবং মিলটন বৈদ্য এরা কেউ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। তাই তাদের লাঞ্ছিত করে মাঠ ছাড়া করা হলেও ওই প্রতিষ্ঠানটি ছিল নিশ্চুপ। যেমন ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগ ও দেশ ত্যাগে বাধ্য করার সময়, তেমনি।

২০১৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে জনগণের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মিসর ও উত্তর কোরিয়ার স্টাইলে। তবু এ ধরনের নির্বাচনে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেতে অসুবিধা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ইদানীং ‘বাকশাল’ পদ্ধতির পক্ষে গুণগান করে চলেছেন। তাই সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনী ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

অথচ ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নের রোল মডেল বলে আমরা দাবি করছি। সেটা প্রকৃতই অর্জিত হবে। আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হই। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৭০ মাস যুদ্ধ করে আমাদের চার বছর পর ১৯৭৫ সালে দেশ স্বাধীন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার ২৫০টি জঙ্গিবিমান ভিয়েতনামীরা ভুপাতিত করেছিল। ভিয়েতনামে শিক্ষিতের হার শতভাগ। আমাদের দেশে সরকারি দাবি মাফিক, ৭১ শতাংশ শিক্ষিত। তাদের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৭০০ ডলার। আমাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৮০০ ডলার। তাদের রফতানি আয় ২৪৩ বিলিয়ন ডলার ও আমদানি ব্যয় ২৩৬ বিলিয়ন ডলার। আমাদের রফতানি আয় ৩৭ বিলিয়ন ডলার ও আমদানি ব্যয় ৪০ বিলিয়ন ডলার। তবুও আমরা উন্নয়নের রোল মডেল? কিন্তু ভিয়েতনাম তা পারেনি প্রচারবিশারদ না থাকায়।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa