২২ মে ২০১৯

ফারাক্কা বাঁধ : বাংলাদেশের অস্তিত্ববিনাশী

ফারাক্কা বাঁধ - ছবি : সংগ্রহ

ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পানি আগ্রাসন এ দেশের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারত গঙ্গা নদীতে বিতর্কিত ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর গত চার দশকে এটি গঙ্গা অববাহিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। অথচ এই নদী এবং পানিসম্পদ কারো একক সম্পদ নয় যে, চাইলে নিজেরা ব্যবহার করবে এবং ন্যায্য অধিকার থাকা সত্ত্বেও অন্যকে বঞ্চিত করবে। পদ্মায় বর্তমানে শুকনো মওসুমে পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। এর বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণে ও পশ্চিমাঞ্চলে পানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের চার কোটিরও বেশি মানুষ। একে একে শুকিয়ে যাচ্ছে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলো।

অসংখ্য নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৪টির মূল উৎস তিব্বত, নেপাল, ভুটান ও ভারতের পর্বতময় অঞ্চল। যার ফলে পানির অবাধ প্রবাহে ফারাক্কার মতো বাঁধগুলো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এই বাঁধের প্রভাবে দেশের মানচিত্র থেকে প্রায় ৪৯টিরও বেশি নদ-নদী হারিয়ে গেছে এবং আরো প্রায় ১০০টি ছোট-বড় নদী একই পরিণতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাকিগুলোরও মরণদশা, কোনো কোনোটির বুকে জেগেছে চর এবং ইতোমধ্যে সেই চরগুলোতে জনবসতিও শুরু হয়েছে। আর এই নদীগুলো খালের মতো একাধিক ক্ষুদ্র ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এ দিকে শুকনো মওসুমে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ও উচ্চতাও কমে যাচ্ছে। এ দেশের পাতাল পানিতে আর্সেনিক বিষের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ফারাক্কা। স্রোত না থাকায় এ দেশের নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে এর উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নদীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় প্রতি বছর অত্যধিক হারে নদীভাঙনের ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যেকোনো ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গঙ্গা নদীতে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। মানবসৃষ্ট এই দুর্বিপাকে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। শুকনো মওসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষের পানীয় জল ও গৃহস্থালি কাজে পানির মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর এ অবস্থায় দেশ মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গঙ্গার এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয় আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের সুন্দরবন, যা বিশ্ব হেরিটেজ নামে পরিচিত তা ধ্বংসের মুখে। পদ্মার একটি বড় শাখা নদী গড়াই কার্যত শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে খুলনার আশপাশে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৫০০ মাইক্রোমোস ফারাক্কায় পানি প্রত্যাহারের ফলে খুলনার লবণাক্ততা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৫০০ মাইক্রোমোস। এই লবণাক্ততা খুলনার ধারে ২৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত উজানে সম্প্রসারিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর পরোক্ষ ক্ষতির হিসাব দাঁড় করলে সে ক্ষতির পরিমাণ আরো ব্যাপক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এ বাঁধ আজ বুমেরাং হয়ে ভারতেরও উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে বিপুল পলি জমে প্রতি বছর বন্যা দেখা দিচ্ছে ভারতের বিহারসহ উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। অন্য দিকে, গ্রীষ্ম মওসুমে পানি আটকে রাখার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভাটি অঞ্চল বাংলাদেশ। ফারাক্কার প্রভাবে নদীর স্বাভাবিকতা হারিয়ে গঙ্গার উজানে বিহার ও উত্তর প্রদেশ এবং ভাটিতে সুন্দরবন পর্যন্ত পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।

সাম্প্রতিককালে বন্যায় বিহারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল অন্তত ২০ লাখ। এর ফলে বিহারের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ফারাক্কার সমস্যা তুলে ধরে এ সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়ে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের কথা বলেছেন। তবে শুরু থেকেই এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ছিলেন নদী বিশেষজ্ঞরা। তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ফারাক্কার সব রেগুলেটর খুলে দিয়ে বিহারের বন্যা ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশকে ভাসিয়ে দিয়ে। বাংলাদেশে ছেড়ে দেয়া পানির তোড়ে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। কিন্তু ‘বন্ধু’ ভারত সরকার তার কোনো তোয়াক্কাই করেনি এসবের।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং এ দেশের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’। আর এ মূলনীতির আলোকে সব দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহাবস্থান বজায় রাখতে বাংলাদেশ যথেষ্ট আন্তরিক। ভারত বাংলাদেশের একটি বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশের সাথে ভারত কখনোই সেই অর্থে আন্তরিক সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুসুলভ মনোভাব দেখায়নি। বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক সব আইনকানুন, নিয়মনীতিকে অগ্রাহ্য করে পানিসম্পদ উজান থেকে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফারাক্কাসহ আরো অন্যান্য নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছেমতো পানিপ্রবাহকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উঁচু ও মরু অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভাটি অঞ্চল, এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাসহ সব কিছুই নির্ভরশীল নদী ও তার পানির ওপর। বাংলাদেশের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম ইনামুল হক এ ব্যাপারে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন : ‘ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার আগে শুষ্ক মওসুমে পানির প্রবাহ ছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক। ফারাক্কায় ওদের ডাইভারশন ক্যানেল, ব্যারাজের মাধ্যমে তারা ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নিতে পারে। সেটি সরিয়ে নেয়ার পরে যেটি থাকে সেটি পায় বাংলাদেশ। গঙ্গা চুক্তিতে অন্তত ২৭ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।’

ফারাক্কা সমস্যার সূত্রপাত ঘটে ’৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে। গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগের খবর জেনে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি প্রতিবাদের উত্তরে ভারত ১৯৫২ সালে জানিয়েছিল যে, গঙ্গার বাঁধ নির্মাণ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়েই রয়েছে। ১৯৬০ সালে ভারত প্রথম এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সাথে বৈঠকে বসে। এ প্রক্রিয়া চলা অবস্থাতেই ১৯৬১-৬২ সালে ভারত গোপনে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। এভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই ১৯৭০ সালে ফিডার খাল ছাড়া ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ করে ফেলে ভারত। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সব ফিডার ক্যানেল চালুর কথা বলে ভারত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই ৪১ দিনের পরিবর্তে ৪৪ বছর পরও বাঁধটি চালু আছে। ফারাক্কা বাঁধ চালু হয় মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ও আন্তর্জাতিক চাপে ভারত বাংলাদেশের সাথে একাধিক পানি চুক্তি করলেও ভারত কোনো দিনই সেই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনের ফলে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে যে অর্জন আসে পরবর্তীকালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে সমঝোতার মাধ্যমে সে অর্জনকে দুর্বল করে ফেলা হয়। ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তিতে গ্যারান্টিক্লজ থাকায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯২ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের এক বৈঠকে গঙ্গা ও তিস্তাসহ অন্যান্য প্রধান নদীর পানি বণ্টনের জন্য সমতাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ফারাক্কায় গঙ্গার পানি সমতার ভিত্তিতে বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পানি সমস্যা এড়ানোর জন্য সব প্রচেষ্টা চালানো হবে। কিন্তু পরে ভারতের পক্ষ থেকে এ চুক্তির ব্যাপারে আর কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। ফলে ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার ভাষণে ফারাক্কা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ১৯৯৫ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টি আবারো উত্থাপন করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু তাতেও সমস্যা সমাধানের কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। ফলে ১৯৯৫ সালের ২৩ আক্টোবর জাতিসঙ্ঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ফারাক্কা প্রসঙ্গ পুনরায় তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের চার কোটি মানুষ গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় এই চার কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুর্দশায় পতিত হয়েছে। তিনি এই সঙ্কট সমাধানে সহায়তা করার জন্য জাতিসঙ্ঘে সমবেত বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে এ আহ্বান জানান।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙ্গার পানি ইস্যু নিয়ে ৩০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু বাংলাদেশের জন্য অতি দুর্বল একটি চুক্তি করেন। কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই সে চুক্তি ভারত অকার্যকর করে দেয়। ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক পানি পায়, যা ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর সর্বনি¤œ প্রবাহ ছিল। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি পাওয়ার কথা ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক। ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তিতে গ্যারান্টিক্লজ ছিল, কিন্তু এ চুক্তিতে তা না থাকায় ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিতে বাধ্য ছিল না। ফলে বাংলাদেশ পানি কম পেলেও তার প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া চুক্তিটিতে আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাওয়ার কনো সুযোগ নেই। অথচ নেপালের সাথে মহাকালী নদী চুক্তিতে ভারত আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন মেনে নিয়েছে। কাজেই গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে ভারতর সাথে যে পানি চুক্তি করা হয়েছে, তা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং তা বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। এ চুক্তির সফলতা শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। এর কারণ গ্যারান্টিক্লজ বা অঙ্গীকার অনুচ্ছেদ না থাকা। বাস্তবে চুক্তির ফলাফল প্রায় শূন্য।

ভারত শুধু ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের পানির সমস্যা করছে তা নয়। আজ বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব দিকের সীমান্তবর্তী এলাকা পানিশূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তিস্তা নদীর উজানে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ দেয়ার কারণে শুকনো মওসুমে গজলডোবার নিম্নে শতকরা ১০ ভাগ পানিও থাকে না। তাই তিস্তা নদীতে বিরাট বিরাট চর পড়েছে। মানুষ নদীর এপার-ওপার হেঁটে পার হচ্ছে শুকনো মওসুমে। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমির সেচব্যবস্থা বিপর্যস্ত। তিস্তার পানি চুক্তির কথা ভারত ২০ বছর ধরে বলেও তা করছে না। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। মাত্র তিনটি নদীতে বাঁধ নেই, আর সবগুলোতে ব্যারাজ, ড্যাম, মাটির বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টিপাইমুখ ড্যাম দিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য আরেক মরণফাঁদ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের কুশিয়ারা নদীর উজানে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে বরাক নদীর উজানে ভারত টিপাইমুখ ড্যাম তৈরি করছে। এর ওপর রয়েছে ভারতের আরেক ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি ছোট-বড় নদীর পানিপ্রবাহকে ৩০টি আন্তঃসংযোগ খালের মাধ্যমে ফারাক্কা বাঁধের ভেতর দিয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে এবং এ ধরনের সংযোগ স্থাপন করে প্রায় ৭৫টি জলাধারে পানি সংরক্ষণ করে তা থেকে পরবর্তীকালে পানি সরবরাহ করে ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের খরাপ্রবণ রাজ্যগুলোতে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পানিপ্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের উড়িষ্যা হয়ে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও কর্নাটক দিয়ে তামিলনাড়ু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা বাংলাদেশের জন্য যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করবে তা কল্পনাতীত ব্যাপার। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে না।

এ মহাসঙ্কটকালে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বগুলো জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জাতি একজন দেশপ্রেমিক, সাহসী, দূরদর্শী, নেতৃত্বের শূন্যতা প্রবলভাবে অনুভব করছে। জাতির এ ক্রান্তিকালে মওলানা ভাসানীর মতো একজন সিংহপুরুষের বড়ই দরকার। অশীতিপর এ মানুষটি ভগ্নশরীর নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জাতিকে এককাতারে সমবেত করতে ডাক দিয়েছিলেন। তার সে ডাকে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়ে আগ্রাসী শক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনের লক্ষে বিশাল লংমার্চের আয়োজন করেছিলেন ১৬ মে ১৯৭৬ সালে, যা ‘ফারাক্কা লংমার্চ’ নামে পরিচিত।

লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য সচিব, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি, রাজশাহী

 


আরো সংবাদ

কাশ্মীরে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে : প্রধানমন্ত্রী পেশাজীবীদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর ইফতার ৬ মাস পর কারামুক্ত বিএনপি নেতা শেখ রবিউল আলম নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে তিন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ২ জুলাই ৩ টাকার বালিশ তুলতে খরচ ৫ টাকা? রুমিন ফারহানার প্রার্থিতা বৈধ কৃষকেরা অধিকার থেকে বঞ্চিত : মাওলানা আতাউল্লাহ শাহজালাল বিমানবন্দরে সোয়া ৩ কোটি টাকার স্বর্ণসহ একজন গ্রেফতার পশ্চিম রাজাবাজারের জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি আওয়ামী লীগ-বিএনপির তরুণ নেতাদের

সকল




agario agario - agario