২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চলনবিলের কৃষকের স্বপ্ন

চলনবিলের কৃষকের স্বপ্ন - ছবি : সংগ্রহ

দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল। একসময় বর্ষায় অথৈ পানিতে এ বিলে জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালাতেন। বৈশাখের শেষে মাঠে দেখা যেত সোনালি ধানের অপরূপ দৃশ্য। সূর্য ওঠার আগেই ধানকাটা শ্রমিকেরা মাঠে নেমে পড়তেন। গৃহিণীর উঠান গোছগাছ করতে না করতেই মহিষের গাড়িতে পাকা ধান নিয়ে হাজির হতেন গারোয়ান। বিকেল গড়াতে চলত ধান মাড়াইয়ের কাজ। কৃষকের গোলায় ওঠত চলনবিলের মাঠে উৎপাদিত বহু প্রতিক্ষিত সোনালি ধান। ঘরে ঘরে নতুন ধান তোলায় আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এখন আর চোখে পড়ে না একদমই। চলনবিলের কৃষকের মনে এখন শুধু হাহাকার আর হতাশা! সোনালি ধান ঠিকই জমিতে আছে, কিন্তু নেই লাভের পরিমাণ। নেই প্রত্যাশিত সুখ।

বর্তমানে উৎপাদন খরচের সাথে কোনোমতেই তাল মিলিয়ে উঠতে পারছেন না চলনবিলের কৃষকেরা। ধান চাষের জন্য বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা ও বিক্রি পর্যন্ত কৃষকেরা পুষিয়ে উঠতে পারছেন না। বাজারে ধানের দামে ভীষণ মন্দা। চলনবিল অঞ্চলের শ্রমিকদের মজুরির চাহিদা অনেক বেশি। তাদের কথা, ‘৫০-৫৫ টাকা দরে চাল কিনে খেয়ে ৩০০-৩৫০ টাকা মজুরি নিলে আমাদের পোষায় না। মোদ্দা কথা, দিন আনতে পান্তা ফোরানো অবস্থা।’ তাই চলনবিল অঞ্চলে সারা বছরই কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বেশ চড়া। ৫০০-৬০০ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষ তারও বেশি টাকার বিনিময়ে শ্রমিকেরা ধান রোপন করে থাকেন। গেরস্থ কৃষকের ধান চাষ না করে উপায় নাই। তাই শ্রমিকদের বেশি মজুরির দিকে না তাকিয়ে গুদামে মজুদ করা ধান পানির দামে (সস্তায়) বিক্রি করে আবার আবাদের কাজে লেগে পড়ে। ধান চাষের ফল দাঁড়ায়-কৃষকদের জমি ও শ্রমের বিনিময়ে সারা বছরের আহার জোটে মাত্র! পকেটে বাড়তি কোনো আয় থাকে না।

প্রতি বছর সেচ মওসুম চলনবিলের কৃষকদের জন্য এক ভয়াবহ দিনক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। চার মাসের বেশি সময় ইরি-বোরো ধানের জমিতে সেচ, নিড়ানী, সার ও কীটনাশক দিতে হিমশিম খেতে হয়। বিপদে পড়ে উচ্চ সুদাহারে ব্যাংক, এনজিও ও ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে কৃষিঋণ নিতে বাধ্য হতে হন তারা।

আগে চলনবিলের কৃষকের জমিতে সেচ দেয়া নিয়ে ভাবতে হতো না। বর্ষার পানি শুকিয়ে যেতে যেতে ধানের চারা রোপন করতেন। খাল, নদী থেকে সেলোইঞ্জিন বসিয়ে জমিতে সেচ দিতেন। তখন তেল ও সারের এত দাম ছিল না। বড় কথা, কীটনাশকই লাগত না। অনেক ক্ষেত্রে, বৃষ্টির পানিই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু চলনবিলের পরিবেশ-প্রতিবেশে পরিবর্তনের এসেছে। বর্ষা মওসুমে পর্যাপ্ত পানি চলনবিলে এখন দেখা যায় না। এসব পানি যে বৈশাখ পর্যন্ত খাল-নদীতে জমা থাকত। এখন বিলের বেশির ভাগ জলাধারই নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় শুকিয়ে যায়। আর নদীগুলো দখল করে, ভরাট করে বসতবাড়ি কিংবা চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি পর্যাপ্ত জলাধার না থাকে, তাহলে পানি কিভাবে সংরক্ষিত হবে? সেলোইঞ্জিন দিয়ে ভূগর্ভের পানি তেমন তোলা যায় না। অনেক মাঠে এখন বৈদ্যুতিক মোটর দেখা যায়। এতেও কৃষকদের রক্ষা নেই। বিদ্যুতের উচ্চাহার লাভের মুখ দেখতে দেয় না। সবার বৈদু্যুতিক মোটর নেয়ার সক্ষমতাও নেই। চলনবিলের কৃষকেরা যেন নিরুপায়। ধান উৎপাদনের দুশ্চিন্তায় চোখে ঘুম নেই তাদের।

ইরি-বোরো মওসুমে চলনবিল অঞ্চলে দেখা দেয় মাত্রাতিরিক্ত শ্রমিক সঙ্কট। বিগত এক দশক আগেও চলনবিলে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেনি। রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া থেকে শ্রমিক আসতেন ধান কাটতে। স্থানীয় শ্রমিকদের সাথে একত্রিত হয়ে তারা কৃষকদের ধান গোলায় তুলে দিয়ে গাড়িভর্তি ধান নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু এখন চলনবিল এলাকায় বাইরের শ্রমিক খুব একটি আসেন না। ধানের দাম কম হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকেরা এখন ধানের বিনিময়ে ধানকাটা ছেড়ে টাকার বিনিময়ে ধান কাটছেন। কৃষকরা এখানেও অসহায়! ধান কাটার পর তা বিক্রি করে, তারপর টাকা আসবে। কিন্তু ধান কাটতেই যদি টাকা দিতে হয়, তাহলে তাকে ফের ঋণ করতে হয়। আগাম ধান বিক্রির বায়না নিতে হয়। দাদন ব্যবসায়ীরা মওকা পেয়ে যান। আবাদ শুরুর পর থেকে নেয়া ঋণ, অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করার পর কৃষকের মোটা অঙ্কের লোকসান গুণতে হয়। এক বিঘা ধান কাটতে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা শ্রমিকদের দিতে হয়, ফলে লোকসান গোনা ছাড়া কৃষকের কপালে কিছু জোটে না।

চলনবিল অঞ্চলের ধান সারা দেশব্যাপী বিপুল মানুষের আহার জোগায়। ধানের বীজ তৈরি করতেও চলনবিলের ধান কিনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। দেশের কৃষি অর্থনীতির বিরাট একটি অংশ আসে চলনবিলের কৃষকদের উৎপাদিত ধান থেকে। অথচ এ অঞ্চলের ধানের দাম এতই কম যে, এক কেজি গরুর গোশত কিনতে এক মণ ধান বিক্রি করতে হয়! একদিকে লাগামহীন কৃষিব্যয়, অন্যদিকে ধানের দামে কম, চলনবিলের কৃষকেরা তাই হতাশা। বর্তমানে চলনবিলের কৃষকেরা শুধু হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন না, তাদের মধ্যে ক্ষোভও দানা বাধছে।

ধান বিক্রির সময় কৃষকেরা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। অসাধু ব্যবসায়ীরা ওজনে নয়-ছয় করে ট্রাক ভরছেন। এদিকে হাট ইজারাদার ধান ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পৃক্ত। তারা ব্যবসায়ীদের থেকেও খাজনা আদায় করেন, মণপ্রতি ১০ টাকা করে খাজনা নেয়া হয়। চলনবিল অঞ্চলের ধানের বাজারে চলে খাজনার নামে নীরব চাঁদাবাজি। এ অঞ্চলের কৃষকেরা সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত। চলিনবিলের কৃষকের স্বপ্ন শুধু তাদের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া। চলনবিলের কৃষকের আশা-প্রত্যাশা কখনোই লোভাতুর নয়। তারা কৃষিকে ঘিরে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করেন মাত্র। কিন্তু দেশে কৃষির বেহাল দশায় তারা এখন হতাশ। চলনবিলসহ দেশের কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান, সে ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
[email protected]

 


আরো সংবাদ

জি কে শামীমের সাথে দু’টি ছবি নিয়ে না’গঞ্জে তোলপাড় কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে : ড. আব্দুর রাজ্জাক এরশাদের স্মরণসভায় জি এম কাদের জাতি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দেখতে চায় সমুদ্র নিরাপত্তা ও ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দিতে টেলিলিংক গ্রুপ চেয়ারম্যানের ঢাকা ত্যাগ শিশুদের যৌন হয়রানি রোধে ডুফার কর্মশালা আশুলিয়ায় গার্মেন্টে চাকরি নিতে এসে তরুণী ধর্ষিত হাতিরঝিল লেক থেকে লাশ উদ্ধার ভিক্টর ক্লাসিক বাসের চালক-সহকারী গ্রেফতার বাংলাদেশের শুভ সূচনা শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে

সকল