২৭ জুন ২০১৯

তালাক দেয়ায় নারীর ক্ষমতা কতটুকু?

তালাক দেয়ায় নারীর ক্ষমতা কতটুকু? - ছবি : সংগ্রহ

কোনো নারী যদি যুক্তিসঙ্গত কারণে স্বামীকে তালাক দিতে চান, সে ক্ষমতা প্রচলিত আইনে স্ত্রীর রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের আদালতগুলো নারী অধিকার এবং নারীকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মুসলিম আইনে নারীদের হাতে তালাকের বিধান হলো- ক. খোলা তালাক, খ. মুবারাত এবং গ. তালাক-ই তাওফিজ।

প্রচলিত হানাফি আইন অনুযায়ী, একজন মুসলিম নারী শুধু খোলা তালাকের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ করতে পারেন। এ তালাকে স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, এ ধরনের তালাকে বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য স্ত্রী তার স্বামীকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকেন। সাধারণত ক্ষতিপূরণ হিসেবে স্ত্রী তার আর্থিক দাবির কোনো অংশ ছাড় দেন। তখন স্বামী তালাক দেয়ার মাধ্যমে স্ত্রীকে বিয়ে বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেন।

যদি স্বামী বা স্ত্রী একত্রে শান্তি ও সৌহার্দের মধ্যে বসবাস করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে স্ত্রী তালাকের বিনিময় মূল্য দিয়ে খোলা তালাক পেতে অধিকারিণী। (শিরিন আলম চৌধুরী বনাম ক্যাপ্টেন শামসুল আলম চৌধুরী ৪৮ ডিএলআর (হাইকোর্ট) পৃষ্ঠা-৭৯)।
মুবারাত হলো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে বিচ্ছেদ। এ ধরনের বিয়ে বিচ্ছেদের বেলায় উভয়ই বিয়ে বিচ্ছেদে সম্মত হন বলে কাউকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগে না। মুবারাত তালাকের প্রচলন খুব একটি নেই।

সবশেষে তালাক-ই তাওফিজ বা অর্পিত ক্ষমতাবলে দেয়া তালাক। নিকাহনামা বা কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন কি না? করে থাকলে কী শর্তে?’ প্রশ্নটি থাকে। কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরটি এ জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পূরণ করা উচিত। এ ধরনের তালাকে স্বামী কিছু শর্তসাপেক্ষে তালাক দেয়ার ক্ষমতা স্ত্রীকে দেন এবং ওই শর্তানুযায়ী স্ত্রী তালাক দিতে পারেন।

মুসলিম আইনে ‘খোলা’ এবং ‘মুবারাত’ ছাড়া সব ক্ষেত্রে তালাকের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ করার ক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে পুরুষের ওপর ন্যস্ত। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রী তালাকের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ করতে পারেন, তবে তা একচ্ছত্রভাবে নয় বরং স্বামীর সম্মতিসাপেক্ষে।

প্রচলিত মুসলিম আইনে বিয়ে বিচ্ছেদের বেলায় স্বামী-স্ত্রীর অসাম্য দূর করতে ১৯৩৯ সালে পাস করা হয় মুসলিম বিয়ে বিচ্ছেদ আইন। এ আইনে বিভিন্ন কারণে, যেমন স্বামী যদি ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন বা স্বামী যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হন অথবা স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তা হলে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারবেন। সুতরাং স্বামীর অর্পিত ক্ষমতাবলে নয়, অথবা কোনো প্রকার আর্থিক দাবি ত্যাগ না করে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিয়ে বিচ্ছেদ আইনে দেয়া হয়। এমনকি নির্যাতনের ভয়ে স্ত্রী স্বামীগৃহ ত্যাগ করেও দুই বছর ভরণপোষণ না পেয়ে বিয়ে বিচ্ছেদের ডিক্রি পাওয়ার অধিকারিণী। (সালমা খাতুন বনাম মোসলেম উদ্দিন ১৯ ডিএলআর (হাইকোর্ট) পৃষ্ঠা-৫৫৩)। তবে দণ্ডাদেশের ক্ষেত্রে দণ্ডাদেশটি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী বিচ্ছেদের ডিক্রি পাওয়ার অধিকারিণী নন। (আমেনা খাতুন বনাম সিরাজ উদ্দিন সর্দার ১৭ ডিএলআর (হাইকোর্ট) পৃষ্ঠা-৬৮৭)

মালিকি মতবাদ অনুসরণ করে ‘নিষ্ঠুরতা’ বা ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’কে ওই আইনে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের মামলা করতে পারেন। ‘নিষ্ঠুরতা’ শব্দটি ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিয়ে বিচ্ছেদ আইনে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আমাদের আদালতও ঘোষণা করেছেন, ‘নিষ্ঠুরতা’ বলতে শুধু শারীরিক নির্যাতন বোঝাবে না, বরং যেকোনো মানসিক নির্যাতনও নিষ্ঠুরতার অন্তর্ভুক্ত হবে।

যেমন- হাসিনা আহমেদ বনাম সৈয়দ আবুল ফজল মামলায় (৩২ ডিএলআর, হাইকোর্ট বিভাগ, ২৯৪) আদালত মন্তব্য করেছেন, স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে বলে প্রতিনিয়ত দোষারোপ করা হলে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারবেন। কুতুবউদ্দিন জায়গিরদার মামলায় (২৫ ডিএলআর, হাইকোর্ট বিভাগ, ২১) আদালত মন্তব্য করেছেন, নিষ্ঠুরতার (যা মানসিক নির্যাতনকেও অন্তর্ভুক্ত করে) কারণে মুসলিম আইনে বিবাহিত একজন স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন। এ ছাড়া হোসনে আরা বেগম মামলায় (৪৩ ডিএলআর, হাইকোর্ট বিভাগ, ৫৪৩) আদালত ‘নিষ্ঠুরতা’ শব্দের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘নিষ্ঠুরতা বলতে শুধু শারীরিক নির্যাতন বোঝাবে না, বরং সচ্ছল কোনো পরিবারে কোনো স্ত্রীকে (যার অভ্যাস নেই) যদি প্রাত্যহিক গৃহকর্ম করতে বাধ্য করা হয়; তাহলে তা নিষ্ঠুরতা বলে গণ্য হবে।’

মুসলিম আইনের বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে একমাত্র মালিকি মতবাদে স্বামীর নিষ্ঠুরতার জন্য স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। প্রচলিত হানাফি মতবাদ অনুযায়ী, স্বামী যদি ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। অন্যান্য মতবাদেও বিভিন্ন কারণ, যেমন- স্বামী যদি ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন অথবা স্বামী যদি পাগল হন; তা হলে স্ত্রী আদালতের কাছে বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।

গত কয়েক দশকে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে বিচার বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গিরও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। বিশেষ করে ষাটের দশক থেকে, যখন দেনমোহর প্রদানে ব্যর্থ হওয়ার কারণে স্ত্রী বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন বলে আদালত মত দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে নেলি জামান মামলাটি (৩৪ ডিএলআর, হাইকোর্ট বিভাগ, ২২১) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত মামলায় প্রথমবারের মতো সামাজিক পরিবর্তন এবং নারীর স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করতে আদালত মত দেন। আদালত মত প্রকাশ করেন, সমাজ পরিবর্তনের সাথে নারী অধিকারের বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে এবং বিয়ের দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রেও তাদের স্বাধীন সত্তাকে সম্মান জানাতে হবে।
লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট
[email protected]


আরো সংবাদ

সরকারি কর্মকর্তাদের আবারো পেটানোর হুমকি সেই এমপির কোহলি-গেইল লড়াইয়ের ফলাফল কী হবে? যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোট গড়ছে রাশিয়া-ভারত-চীন! বিপজ্জনক পরিণতির দিকে মার্কিন-ইরান উত্তেজনা   ৯২ বিশ্বকাপের অবাক করা পুনরাবৃত্তি : ইতিহাসে উদ্দীপ্ত পাকিস্তান হোটেলে রাতে কেঁদে ফেললেন সরফরাজের স্ত্রী ভারতের বিপক্ষে চাপ নিতে চান না মিরাজ স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা : বীভৎসতায় বিমূঢ় সামাজিক মাধ্যম আগামীতে মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ : এলজিআরডি মন্ত্রী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করলেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব সুপ্রিম কোর্টের ডিএজি ও এএজিদের পদত্যাগের আহ্বান আইনমন্ত্রীর

সকল