১৬ ডিসেম্বর ২০১৯

তুরস্ক ও ইসরাইলের নির্বাচনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু - ফাইল ছবি

কয়েক সপ্তাহ আগে এই অঞ্চলে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তুরস্ক এবং ইসরাইল উভয় দেশই এই নির্বাচনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। ৩১ মার্চ তুরস্কের নাগরিকেরা পৌর নির্বাচনে এবং ৯ এপ্রিল ইসরাইলিরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এই দুটো নির্বাচনের ফলাফলই অভ্যন্তরীণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ প্রভাব ফেলবে। এই নির্বাচনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুশীলবেরা খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছেন।

ইসরাইলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি আগে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত একই অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইতোমধ্যে দেশটির দ্বিতীয় দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য, ইসরাইলের প্রথম এবং দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড বেনগুরিয়ান।

এখনো তার ওই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেননি। চলতি সপ্তাহের নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে চান। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে এই নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরাইলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন সেটি ফিলিস্তিন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত এবং ইসরাইল-আরব সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

তুরস্কের ক্ষেত্রে ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের মতো খুব বেশি একটা পার্থক্য নেই। তুরস্কে কেবল পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিস্ময়কর ফলাফলের মধ্য দিয়েই এই নির্বাচন শেষ হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত ভোটে ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান পেলেও দু’টি প্রধান শহর আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলের মেয়র পদে হেরে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে।

ইস্তাম্বুলের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কাউন্সিলে (ওয়াইএসকে) আপত্তি উত্থাপিত হওয়ায় সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করার ব্যাপারে নতুনভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দেখা যায়, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ক্ষমতাসীন দলকে স্বাগত জানিয়েছেন। অবশ্য বিরোধী শিবিরের রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) প্রয়াস বিফলে যায়নি। ২০২৩ সাল পর্যন্ত তুরস্কে আর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবারের এই নির্বাচনের প্রভাব লক্ষণীয়।

আঞ্চলিক পর্যায়ে আঙ্কারা সম্ভবত সিরিয়ার সাথে তার যে সীমান্ত রয়েছে সে সীমান্ত বরাবর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলমান নীতি অব্যাহত রাখবে। আঙ্কারা ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন চায় যাতে আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের ব্যাপারে একটি সমাধানে পৌঁছা যেতে পারে। চলমান যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের কারণে তুরস্কের স্বার্থ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি এবং দখলকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেটিকে প্রতিহত করার ব্যাপারে আমরা তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকা দেখতে চাই।

ইসরাইলে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, সেটি এই অঞ্চলের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে? ধরে নেয়া যায় যে, নেতানিয়াহুর সরকার ইতোমধ্যেই গাজায় হামলা করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে- আগামী দিনে সেই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। ইসরাইল ইরানের পরমাণু চুক্তিকে টার্গেট করাও অব্যাহত রাখবে।
তুরস্কের সাথে তেলআবিবের সম্পর্ক বিশেষভাবে সাম্প্রতিক ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে উন্নত হবে বলে আশা করাটা কঠিন।

দু’দেশ ২০১৬ সালে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়নি। ইসরাইলি নির্বাচনে বৈদেশিক নীতির চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির বিষয়ে বেশি আলোকপাত করা হবে বলে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, ইসরাইলি সরকার একটি ব্যস্ত পররাষ্ট্রনীতি এজেন্ডার মুখোমুখি হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উভয় দেশের সম্পর্ক অতীব গুরুত্ববহ ভূমিকা পালন করবে।

নির্বাচনে জয়লাভের পর বক্তৃতায় নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে বলেছেন, ইসরাইল কখনো তার চেয়ে ভালো বন্ধু পায়নি। যা-ই হোক না কেন, আঙ্কারার বেলায় আমরা একই কথা বলতে পারি না। ট্রাম্প কোনো সময়ে তুরস্কের জন্য সর্বোত্তম প্রেসিডেন্ট হবেন, এ ধরনের কথা বলা অসম্ভব। ওয়াশিংটন এবং তার দীর্ঘ সময়ের সর্বোত্তম ন্যাটো মিত্র আঙ্কারা তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিতে যাচ্ছে বলে মনে হয়।

এখনো এটা অনিশ্চিত- কখন ও কিভাবে তারা তাদের সম্পর্ককে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন। যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে অন্য অনেক ফ্যাক্টরও কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে ইসরাইল পরিস্থিতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রথমত, ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তেলআবিব থেকে ইসরাইলের রাজধানী সেখানে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ব্যাপারে আঙ্কারা যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছে। এ ছাড়াও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থায় (ওআইসি) নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে আঙ্কারা এ ব্যাপারে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ট্রাম্প এখন ইসরাইলের পক্ষে আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং দখলকৃত গোলান ভূখণ্ডকে ইসরাইলি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

তুরস্ক স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ‘শেষ পর্যন্ত তারা যা প্রয়োজন তা-ই করবে’ এবং তারা ‘একপক্ষীয় সিদ্ধান্তের’ বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করবে। রাশিয়াও ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে নিন্দা জানিয়েছে। অবশ্য এটা বলা নিম্প্রয়োজন, তুরস্কের সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় ব্যাপারে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফাটল ধরার অপর একটি কারণ। ইসরাইলের পক্ষে যেকোনো একতরফা সিদ্ধান্তে তুরস্ক সরকার অসন্তুষ্ট হচ্ছে, এটা ট্রাম্প মনে করতে পারেন। এখন তুর্কি সরকার মনে হয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রাশিয়া ও ইরানের সাথে সহযোগিতা অব্যাহত রেখে সন্তুষ্ট।

লেখক : তুর্কি রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সূত্র : আরব নিউজ
ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ

বন্দুকযুদ্ধে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ মামলার আসামি নিহত চীন-বিরোধী জোট গড়তে তৎপর ভারত জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাল সবুজের মিলনমেলা জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিক্ষোভ : দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ব্যবসায় মন্দার পদধ্বনি মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা ২৬ মার্চ যেকোনো মূল্যে ব্যাংকের আত্মসাৎকৃত টাকা আদায় করতে হবে : হাইকোর্ট টিকিট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে স্টেশন মাস্টারসহ ৪ জন বরখাস্ত আটাবে সম্মিলিত ফোরাম পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী সংগ্রাম সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের মামলা প্রত্যাহারে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সকল




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik