২৭ মে ২০১৯

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হাফিজ : জাতির বিবেক

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হাফিজ - ছবি : সংগ্রহ

গত ১৭ এপ্রিল চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অব: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম আবদুল হাফিজ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ওই দিনই নামাজে জানাজা শেষে তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার তিরোধানে দেশ ও জাতি হারাল বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী দেশপ্রেমিক এক বীর সৈনিককে; সমাপ্তি ঘটল নানা কর্মকাণ্ডে ভরপুর এক গৌরবময় জীবনের। সৈনিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি রেখেছিলেন কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা, তেমনি সুদীর্ঘ অবসর জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে। ব্রিগেডিয়ার হাফিজ ছিলেন দেশবরেণ্য চিন্তাবিদ। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে দেশের বাইরেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং ডাক পড়তে থাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বক্তব্য তুলে ধরার। তিনি সুযোগ লাভ করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করার। তিনিই প্রথম বাংলাদেশী সৈনিক, যিনি এই বিরল মর্যাদা ও সুযোগ পেয়ে দেশ ও সেনাবাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হাফিজ ছিলেন এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভার অধিকারী আদর্শ সৈনিক, যিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। তার ধ্যান-ধারণা ও কর্মব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশ ও জাতি। এমন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি দেশের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে তার ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা প্রকাশের মাধ্যমে জাতিকে সতর্ক ও সচেতন করতে বেছে নিয়েছিলেন কলমকে। ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষাতেই ছিলেন সমান পারদর্শী। দেশের জনপ্রিয় সব ইংরেজি-বাংলা দৈনিক পত্রিকায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে অসংখ্য কলাম লিখে দেশের একজন সেরা নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হয়েছেন। বিদেশেও তার লেখা প্রশংসিত হতে থাকে। তিনি ছিলেন একজন সফল কলমসৈনিক ও চিন্তাবিদ। নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমাদের সমাজে এমন প্রতিভাধর কলমসৈনিকের বড়ই অভাব।

সৈনিক জীবনের শেষ পর্যায়ে ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ও স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (ইওওঝঝ)-এর মহাপরিচালক পদে যোগ দিয়ে একে একটি আদর্শ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে এটি দ্রুত একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভে সক্ষম হয়। বিস জার্নাল তারই নেতৃত্বে প্রকাশিত হতে শুরু করে।

তার সম্পাদনায় ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে তা সুধীসমাজের ব্যাপক প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। বিস-এর মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভারত ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই নিরাপত্তা ও আন্তঃদেশ সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে যোগদান করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে নিজেকে এবং বিসকে সুপরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুদীর্ঘ ছয় বছর অবিরাম পরিশ্রম করে তিনি ইওওঝঝ-কে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। বর্তমানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারউজ্জামান দক্ষ গবেষক হতে ব্রি. জে হাফিজের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। দেশের খ্যাতিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবদুর রবও ছিলেন তার স্নেহভাজনদের অন্যতম। জাতি তার মহৎ কাজকে চিরদিন স্মরণে রাখবে বলে আমরা আশা করি।

আশির দশকের মাঝামাঝি আমার সাথে ব্রি. জে হাফিজের পরিচয়। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর কে এম মহসিনের অধীনে পিএইচডির জন্য গবেষণারত। গবেষণা কার্যক্রমের প্রয়োজনেই বিসে কাজ করার সুবাদে মরহুম আবদুল হাফিজের স্নেহ লাভে সক্ষম হই।

দুই যুগ পরে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে মহাখালী ডিওএইচএসের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস শুরু করায় আমাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। দেখা হলেই দেশের বিভিন্ন বিষয়ে আমার সাথে খোলামেলা আলোচনায় তিনি অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। অনেক কাছ থেকে তার মতো একজন মহান দেশপ্রেমিক সৈনিকের সান্নিধ্য লাভ এবং তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পাই। আমি ছিলাম তার একজন একনিষ্ঠ শ্রোতা এবং কলামের নিয়মিত পাঠক। তার অনেক কলামেই আমাদের মনের কথা প্রকাশ পেত। দু’জনের চিন্তার ক্ষেত্রেও ছিল অনেক মিল। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমরা উভয়েই একমত ছিলাম। চাকরিজীবনে তার সহকর্মী না হয়েও ছিলাম তার একজন প্রিয় পাত্র। আদর্শিক চিন্তা-ভাবনার মিল থাকায় আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধন এবং আন্তরিকতার সৃষ্টি হয়। বছরখানেকের মতো তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। এ অবস্থায় দু-একবার সাক্ষাৎ হলেও আগের মতো আলোচনার আর সুযোগ ছিল না। শেষ সাক্ষাৎ ঘটে ঢাকা সিএমএইচে যখন তিনি অচেতন।

আমার পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছি; তবে তিনি আমাকে চিনতে পেরেছিলেন কি না জানি না। অত্যন্ত ক্ষীণকণ্ঠে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কে? আমরা তার মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন।
লেখক : পরিচালক, সামরিক ইতিহাস কেন্দ্র, ঢাকা


আরো সংবাদ

Instagram Web Viewer
hd film izle pvc zemin kaplama hd film izle Instagram Web Viewer instagram takipçi satın al Bursa evden eve taşımacılık gebze evden eve nakliyat Canlı Radyo Dinle Yatırımlık arsa Tesettürspor Ankara evden eve nakliyat İstanbul ilaçlama İstanbul böcek ilaçlama paykasa
agario agario - agario