২৩ মে ২০১৯

মোদি ক্ষমতায় এলে ভারত ন্যাটোর সদস্য হবে?

নরেন্দ্র মোদি - ছবি : সংগ্রহ

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন যা দিল্লির ভাষায় ‘লোকসভার নির্বাচন’ ১১ এপ্রিল শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব ১৮ এপ্রিল শেষ হয়েছে। ভোটপ্রদান পর্ব এবার এক মাসেরও বেশি দিন ধরে মোট সাত পর্বে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে পর্বের নির্বাচন শেষ হবে। সপ্তম বা শেষ পর্বের ১৯ মে ভোটগ্রহণ। ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। ওই দিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোনো আসনে এগিয়ে আছে, তা বোঝা যাবে। ফলে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসবেন তার ইঙ্গিতও পাওয়া যাবে। সন্ধ্যার পরে সব ফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কারা এবার দিল্লির মসনদে ক্ষমতাসীন হচ্ছেন।

ভারতের লোকসভা নির্বাচন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল মোগল আমলের কথা, যারা ৩০০ বছর ভারত শাসন করেছেন। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তাদের জায়গা দখল করে ব্রিটিশ। বন্দরনগরী কলকাতা থেকে শাসন শুরু করলেও দিল্লির আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারেননি ব্রিটিশরা। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতা আসে স্বাধীন ভারতের নেতাদের কাছে। মোগল আমল থেকে এখন মোদির শাসন। মোদির জনপ্রিয়তা কমলেও এখনো বিকল্প রাহুল বা প্রিয়াঙ্কা নন বলে অনেকে মনে করেন। কংগ্রেস রাজনীতি সে জায়গায় এসে এখনো দাঁড়াতে পারেনি বলে দেশটির বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন।

১৯৭৭ সালে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া জোরেশোরে বয়ে গিয়েছিল ভারতের রাজনীতিতে। তখন মূলত হুঁশিয়ার জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের ফলে কংগ্রেসবিরোধী তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধে। ’৭৭-এ স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে মোরারজি দেশাই দিল্লির মসনদে প্রথম কংগ্রেসবিরোধী সরকার গঠন করলেও ইন্দিরা গান্ধীর কূটকৌশলী রাজনৈতিক চালে তাকে ধরাশায়ী হতে হয়। দেশাইয়ের সরকারের পতন হলে চরণ সিংহের সরকার গঠিত হয়। তবে তা টেকেনি। এরপর ফের ক্ষমতায় আসেন ইন্দিরা। পরে ১৯৮৯ সালে বিশ^নাথ প্রতাপ সিংয়ের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও সেই কোয়ালিশনও টেকেনি। কারণ, এক দিকে বাম আর অন্য দিকে বিজেপি, দুই পরস্পরবিরোধী দল বাইরে থেকে সরকারকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তবে তীব্র মতপার্থক্য নিয়ে কি সরকার স্থায়ী হতে পারে? ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এরপর বাজপেয়ি, দেবগৌড়া প্রমুখ দিল্লিতে কংগ্রেসবিরোধী সরকার গঠন করেন একের পর এক। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ২৮২টি আসন পেয়ে বিজেপির একক শাসন কায়েম করেন সর্বপ্রথম।

মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি অচল হয়ে পড়ে যদি তাতে অব্যাহত স্রোত না থাকে; এ ছাড়া প্রতিটি প্রজন্মে নতুন নেতৃত্ব যদি জন্ম না নেয়। সারা ভারতে বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয় নির্বাচনী মওসুম। এ দিকে, দেশটির এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে রাজনীতিকেরা বড় বড় জনসভায় বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। ভারতে কেউ কেউ বলেছেন, এই উৎসব ১৩০ কোটি মানুষের ‘গণতন্ত্র উদযাপন’। এবারের নির্বাচনে ৯০ কোটি ভোটার। ভোটগ্রহণের জন্য ১০ লাখ ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষ ‘লোকসভা’য় ৫৪৩ আসনে নির্বাচনের মাধ্যমে দিল্লিতে সরকার গঠনে দরকার হয় ২৭২টি আসন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ ভারতে নিবন্ধিত দল ১৭০৯টি। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকটি দলের দুই বা তিনটির বেশি রাজ্যে প্রভাব আছে। পাঁচ বছর ধরে দেশ শাসন করার জন্য নির্বাচিত লোকসভার সদস্যরা তাদের মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেবেন। ভারতের নির্বাচনে একটি প্রবণতা লক্ষণীয়; ভোটাররা সাধারণত শক্তিমান নেতাদেরই অনুরাগী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলা হয় ভারতের নতুন শক্তিমান পুরুষ। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস। ১৩৪ বছরের প্রাচীন দলটি নির্বাচনে মাত্র ৪৪টি আসনে জয়ী হয়। কংগ্রেসের বিশ্বাস, কর্মসংস্থানের সঙ্কুচিত সুযোগ আর আয়রোজগারের সঙ্গিন দশা জনমনে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করে রেখেছে, তাতে গরিষ্ঠ আসনে তারাই জিতবেন। নির্বাচনী প্রচারে তরুণ রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করেছেন বোন প্রিয়াঙ্কা। অনেকেই তার মধ্যে তার দাদী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।

নির্বাচনে কী ফল দাঁড়াতে পারে, সেটি আগে বলা মুশকিল। ভারতে একটি ইংরেজি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্পাদক ড. প্রণয় রায় সমীক্ষা করে দেখিয়েছেন, এবারের নির্বাচনী ফলের মাধ্যমে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠিত হতে পারে। এতে কমতে পারে বিজেপির আসন সংখ্যা। তবে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকবে। সব কিছু স্পষ্ট হবে ২৩ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর। এর পর দেখা যাবে, আবার কত লোকসভা সদস্য কেনাবেচা হন, যা ভারতের গণতন্ত্রের ভয়ঙ্কর বিপদ। প্রণয় রায় ৩০ বছর ধরে নির্বাচনী সমীক্ষা চালিয়েছেন। অতীতে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মিলেছে পূর্বাভাস। তিনি গত ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে তিনটি রাজ্যের ফল সম্পর্কে যা বলেছিলেন তাও যথাযথ মিলে গিয়েছিল।

বলা হয়, ‘ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ’। দেশটির ঐতিহ্য রয়েছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি’র। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, বিজেপি আবার ক্ষমতায় এলে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ কি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুক্তবাজার চায়। এশিয়ায় সামরিক শক্তি বাড়াতে ভারতকে এখন ন্যাটো জোটে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল পর্যন্ত উঠেছে। নরেন্দ্র মোদি আবার ক্ষমতায় এলে ভারতের ন্যাটোর সদস্য হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, এতে করে এশিয়ায় বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ দমন, গণতন্ত্রের বিকাশ ও মুক্তবাজারের পথ আরো সুগম হতে পারে।
লেখক : নব্বইয়ের সাবেক ছাত্রনেতা


আরো সংবাদ




agario agario - agario