২৪ মার্চ ২০১৯

‘যে ডাক শুনেছি তন্দ্রাহারা রাত্রির প্রহরে’

-

বর্তমান বাংলাদেশ স্বাধীনতার আগে ছিল ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’-এর অংশ এবং বর্তমানে এটি স্বাধীন ‘পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’। এতে করে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। একটি দেশের জনগণের আচার-আচরণ কেমন হবে, সেটি সে দেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ওপর নির্ভর করে। তাদের আচরণের ভালো-মন্দ দিক এবং এর সামাজিক অভিঘাতও এটাই। তবে এ বিচার আপেক্ষিক। দেশভেদে ও সমাজভেদে এর নানারূপ ও বোধ পরিলক্ষিত হয়। সমাজে ধর্মীয় নীতি-আদর্শ উপেক্ষিত হলেও সব দেশেই কিছু স্বাভাবিক নিয়মকানুন থাকে, যা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষার্থে মেনে চলা জরুরি। এসব নিয়ম যখন উপেক্ষিত হয়, তখন আর সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের নিশ্চয়তা থাকে না- সমাজ উল্টো পথে চলে। ধর্ম নির্দেশিত পথের বাইরে, এসব স্বাভাবিক নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তাই জনজীবনে এমন একটি রীতি প্রচলিত হতে দেখা যায়, যার ফলে সমাজ একটি মিশ্র রূপ ধারণ করে।

নিজস্ব ধর্মের বাইরে এটা করতে গিয়ে জনগণ দেশে একটি অসমসত্ত্ব কালচার গড়ে তোলে, যা প্রায়ই বিশ্বের প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী দেশগুলোর কালচারকে আত্মস্থ করার চেষ্টার ফলাফল। তাই একটি দেশের সমাজজীবনে নানাবিধ সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিছু লোক বিশেষত যারা নিজেদের চিরায়ত আভিজাত্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে চলতে চান এবং যারা তা চান না, তাদের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়ে যায়। কেউ কেউ সেটা সহজে মেনে নিতে না পারলেও তাদের কিছু করার থাকে না, যদি সমাজে ধর্মীয় রীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত না হয়। নিজ ধর্মীয় রীতি চালু থাকলে সবাই সে ধর্মমতে সমানভাবে চলেন এবং সমাজে একটি হোমোজিনিয়াস বা সমসত্ত্ব রীতি প্রচলিত হয়ে যায় এবং সবার জন্যই একটি স্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে সামাজিক সংঘর্ষের প্রশ্ন কমই উঠে এবং উঠলেও তার মীমাংসা ধর্র্মসম্মতভাবে হয়ে যায়- সঙ্ঘাত তেমন একটা হয় না। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের সমাজ আজ আর সে পর্যায়ে নেই। তাই স্বাধীন দেশের নারী-পুরুষদের আচরণও দৃষ্টিকটুভাবে বদলে যাচ্ছে।

বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে খাস ঢাকার অভিজাত পরিবারের মেয়েরা, কি ঘোড়ার গাড়িতেই হোক বা হুড তোলা রিকশাতেই হোক, আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যেতে ঘোড়ার গাড়ি বা রিকশাটি কাপড়ের চাদর দিয়ে মুড়িয়ে নিতেন। তারাই তখন বিবেচিত হতেন খান্দান বা অভিজাত বলে। তারা থাকতেন আজকের পুরান ঢাকায়। সেটিই ছিল তখন মূল ঢাকা। আজকের মূল ঢাকা শহর এর অনেক উত্তরে। অভিজাত মেয়েরা এখন অনেকেই হল ভর্তি পুরুষের সামনে মঞ্চে ফ্যাশন শো করেন। কেউ কেউ ইয়াবা খান। জিন্সের প্যান্ট শার্ট পরে বাইরে বের হন। এরা সিঙ্গাপুর, হংকং, বিলেত, ভারত, আমেরিকা বেড়াতে বা শপিংয়ে যান। এরাই যেন আদর্শ, এরাই সারা দেশে অনুকরণীয়।

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র কোনো ছাত্রীর সাথে কথা বললে সে সময়ের আট আনা ফাইন দিতে হতো। ষাটের দশকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের বসার ব্যবস্থা ছিল আলাদা। ক্লাসের বাইরে বা ভেতরে প্রকাশ্যে তাদের কথা বলতে তেমন একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এখন তা বদলে গেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘন-গাঢ় শ্যামল গাছের তলে নিরিবিলি একত্রে বসে ছাত্রছাত্রীরা ডালভাজা খায়, বাদাম খায়। গালগপ্প করে। বাসে করে দূরে সমুদ্রসৈকতে রাতবিরাতে পিকনিক করতে চলে যায়। সিনেমা দেখতে যায়। দেশময় উচ্চ ও নি¤œ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরাও তাই করে। এতে লাভক্ষতি কতটা হয় জানি না;

তবে এটুকু জানি, বর্তমানের পুঁজিবাদী সভ্যতা সম্পদ দেয়, সম্ভ্রম সে অনুপাতে দেয় না। এ যুগে আন্দোলনকারী নারী রাজপথে পুলিশের হাত কামড়ে ধরে, ধস্তাধস্তি করে। উন্নতি ও অগ্রগতির সাথে সাথে আমাদের আয় বৃদ্ধি কম হয়নি। দেশ এগিয়েছে। দরদালান বেড়েছে, রাস্তাঘাটের অবস্থা যাই হোক। মূল্যবোধের অবক্ষয়ও বেড়েছে। পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নেত্রী পুলিশের গালে কষে এক চড় বসিয়েছিলেন। সে সময়ে ঢাকায় যে পাড়ায় থাকতাম তিনিও সে পাড়ায়ই থাকতেন। তাই ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলাম। আর আজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লাঠালাঠি করে।

আজকাল দৈনিক কাগজগুলো নর-নারীর যেসব রঙিন চিত্র ছাপায়, আমাদের যৌবনে এসব চিত্র পিনআপ ম্যাগাজিনে সাদাকালোয় ছাপা হতো। আজকাল ইন্টারনেটে, টেলিভিশনে, ফেসবুকে কী না দেখা যায়! উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা তা দেখছে। তা দেখে অনুকরণ করছে। তাই খুন, জখম ধর্ষণ বাড়ছে। সমাজ বদলে গেছে। আমাদের কাল এখন অনেক ক্ষেত্রে অন্ধকার যুগ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সে কালে সমাজে শান্তি বেশি ছিল। আজ কলুষিত সমাজে অশান্তিই যেন মুখ্য। মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। বন্ধন শিথিল হচ্ছে আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের। দয়ামায়া, স্নেহ-মমতা বিদায় নিচ্ছে। আগে একজন বিপদে পড়লে ১০ জন এগিয়ে যেত। এখন কারো বিপদে কেউ এগোয় না, কারণ পাছে কোন বিপদে পড়তে হয়। এ ছাড়াও সঙ্কীর্ণ স্বার্থসিদ্ধি তো আছেই।

আজকে বাংলাদেশের সমাজে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তার মূলে আছে অন্য দেশ বা জাতির অন্ধ অনুকরণপ্রবণতা। কার্লাইলের সেই বিখ্যাত উক্তি বিশ্বাস করি : ‘দ্য ইস্ট ইজ ইস্ট অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট ই ওয়েস্ট, দ্য টুয়াইন শ্যাল নেভার মিট’। নিজস্ব মূল্যবোধকে আশ্রয় করেই আমাদের এগোতে হবে। বিশেষত মুসলমান হিসেবে আমাদের একটি সুন্দর ও পরিপূর্ণ জীবন বিধান আছে যা ভারত বা পাশ্চাত্যের জীবনাচরণের তুলনায় অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গ ও সুশৃঙ্খল। পূতপবিত্র জীবন যাপনই আমাদের জীবন বিধানের মূল আদর্শ। ক্ষমতায়নের নামে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে নারীদের যেভাবে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আমাদের মূল্যবোধের পরিপন্থীই শুধু নয়; সমাজের জন্য ক্ষতিকরও। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় পারিবারিক আদর্শহীনতার কারণে মায়েরা সন্তানদের সুশিক্ষা দিতে পারছেন না। সমাজও পারছে না। তাই সমাজে চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, ব্যভিচার, মাদক, আত্মহত্যা, দুর্নীতি ইত্যাদি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এসব অনাচার দূরীকরণে ধর্মচর্চা ও নারী-পুরুষের সংযমই একমাত্র উপায়। নারী-পুরুষ পর্দা মেনে চলত বলেই সেকালে সামাজিক অপরাধ কম ছিল।

পবিত্র আল কুরআনে নারী-পুরুষের পর্দার কথা বলা হয়েছে। সেখানে নারীদের পর্দার আগে সূরা আন নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে পুরুষের পর্দার কথা বলা আছে- ‘একজন ঈমানদারের উচিত দৃষ্টি অবনত রাখা এবং তার পবিত্রতা সংরক্ষণ করা’। এর পরবর্তী আয়াতে আছে- ‘ঈমানদার মহিলাদের বলুন, সে যেন দৃষ্টি অবনত রাখে। পবিত্রতা অবলম্বন করে এবং যতটুকু প্রয়োজন তার অতিরিক্ত সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং ওড়না দ্বারা মাথা ও বুক ঢেকে রাখে’ (সূরা আন নুর ২৪, আয়াত ৩১)। নারীর বাবা, ছেলে ও স্বামী ছাড়া পর্দা করার বৈশিষ্ট্যগুলো কুরআন-হাদিসে দেয়া আছে। এর প্রধান ছয়টি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ : ০১. পর্দা পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে আলাদা। পুরুষকে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল এবং হাতের কব্জি ছাড়া সমগ্র শরীর ঢেকে রাখতে হবে। ০২. নারীদের পোশাক এমন আঁটসাঁট হতে পারবে না, যার ফলে দেহকাঠামো স্পষ্ট বোঝা যায়। ০৩. নারীদের পরিধেয় পোশাক স্বচ্ছ হবে না। ০৪. নারীরা এ রকম আকর্ষণীয় পোশাক পরবে না যা বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করে। ০৫. নারী এমন পোশাক পরবে না যা বিপরীত লিঙ্গের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করে এবং ০৬. ঈমানদার নারী এমন পোশাক পরবে না যা অবিশ্বাসীদের পোশাকের সাথে মিলে যায়। তবে আজকের দিনে অহরহ এসব কিছুর ব্যত্যয় দেখা যায়।

বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র। এতদসত্ত্বেও এর সাথে বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারী-পুরুষের রুচি মিলিয়ে দেখলে আমরা কোনো মিল খুঁজে পাই না। অনেকের মতে, সম্ভবত এ কারণেও নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। এর প্রতিকারের জন্য নারীরা মিটিং, মিছিল ও মানববন্ধন করে বটে তবে তাতে কোনো ফায়দা হয় না। দিন দিনই অবস্থার অবনতি ঘটছে। এর কারণ, এগুলো সমস্যা নিবারণের স্থায়ী উপায় নয়। বলা হয়েছে ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী (সূরা আত তুর ৫২, আয়াত ২১)। আসল পথ তাদের ‘পর্দা’ মেনে চলা। তাহলে নারী-পুরুষ পরস্পরকে অবশ্যই সমীহ করবে। এ সমীহ পুরুষ নারীদের আগে করেছে।

আসুন, আমরা প্রকৃতার্থেই একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখি। একই সৌন্দর্যের অধিকারিণী দু’বোনের একজন হিজাব পরিহিতা এবং অন্যজন শর্ট পরিহিতা। তারা দু’জন রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। বিবেচনা করুণ, রাস্তার পাশে বসা বখাটে ছেলেরা কাকে টিজ করবে? সহজেই বলা চলে, শার্ট পরিহিতা মেয়েটিকে। কার্যত হিজাব বা পর্দা মহিলাদের সম্মান বৃদ্ধি, নিরাপত্তা বিধান ও পবিত্রতা সংরক্ষণ করে। তাই পরম পাক আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাঁর রাসূল সা:-কে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রী কন্যা এবং সাধারণ মোমেন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের ওপর টেনে দেয়, এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের কোনোরকম উত্ত্যক্ত করা হবে না’ (সূরা আল আজহাব ৩৩, আয়াত ৫৯)। আল্লাহ আরো বলেন- ‘তোমরা (নারীরা) নিজ গৃহে অবস্থান করবে। প্রাচীন অজ্ঞতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না’ (সূরা আল আজহাব ৩৩, আয়াত ৩৩)।

বিয়ের আগে এবং বিয়ের পর নারী-পুরুষের জীবনে পবিত্রতা সব ধর্মেই কাম্য। তাই সতীত্ব রক্ষার স্বার্থে বিয়ের আগে এবং পরে তাদের বেশভূষা ও আচরণ এর অনুকূলই হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় নারীকে আজ যেমনটা হতে হচ্ছে, তেমনি পদে পদে লাঞ্ছিতা, অপমানিতা- এমনকি বাসে পর্যন্ত ধর্ষিতা হতে হয় এবং হচ্ছেও। রাজপথে নেমে প্রতিকার চেয়েও কোনো ফল হচ্ছে না। এর প্রতিকার নারী-পুরুষ উভয়ের সংযমী ও ‘পর্দানসিন’ হওয়া। সে সহজ ও কার্যকর পন্থা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ইসলাম ধর্মে বাতলানো আছে। এ বিষয়টি আমাদের সমাজপতি, রাজনীতিক ও পণ্ডিত সমাজ ভেবে দেখলে দেশ, জাতি ও সমাজ উপকৃত হবে। আমি যাবতীয় প্রগতির উৎস চির নবীন ইসলামে বিশ্বাসী।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al