১৯ আগস্ট ২০১৯

প্রতিবেশীর রোহিঙ্গা লজ্জা

প্রতিবেশীর রোহিঙ্গা লজ্জা - ছবি : সংগৃহীত

চলতি মাসের প্রথম দিকে ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে জোর করে তাদের দেশ মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেয়ার পর ওই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, মিয়ানমারে ফিরে গেলে তাদের নিশ্চিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি এবং কারারুদ্ধ হতে হবে। গত অক্টোবরে সাতজন রোহিঙ্গাকে জোর করে বিতর্কিত প্রত্যাবাসনের পরই ভারত থেকে পাঁচজনকে বের করে দেয়ার এ ঘটনা ঘটল। বর্তমানে সেখানে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু অবস্থান করছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। ভারতের বর্তমান উগ্র-ডানপন্থী সরকার আগেই বিশেষভাবে সব রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। তাই মনে হচ্ছে, এই দ্বিতীয় উচ্ছেদের সময় ভয়ভীতি সঞ্চার করে তাদের বিতাড়ন করা হবে।

আন্তর্জাতিক আইনে যেসব দেশে নির্যাতন ও হয়রানির ঝুঁকি রয়েছে, সেসব দেশে কাউকে পাঠানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এ ধরনের হুমকি দিচ্ছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এক বছরেরও আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও দমনাভিযানের পর সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম ও তৎপরতাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং সেখানকার সরকারি কর্মকর্তাদের ফৌজদারি অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ এবং অন্য অনেক মানবাধিকার গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এখনো প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে নিরাপদ নয় বলে মনে করে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সর্বশেষ বিতাড়নের পরিপ্রেক্ষিতে, তাদের ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে যে ভাগ্যবরণের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, একই ধরনের পরিস্থিতি তারা এড়িয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ধারণা, গত মাসেই ১৩ শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী ভারত থেকে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

অতি সম্প্রতি ১৬ শিশু ও ছয় নারীসহ ৩১ জন শরণার্থী ভারত-বাংলাদেশ সংলগ্ন ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে’ চার দিন ধরে আটকা পড়ে। বাংলাদেশ তাদের প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় এবং দুই দেশ তাদের নিয়ে কী করবে, সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে না পারায় তারা আটকা পড়ে যায়। অবশেষে ভারত ওই গ্রুপটিকে ২২ জানুয়ারি গ্রেফতার করে। অন্যান্য ‘অবৈধ অভিবাসীর’ মতোই ওই বন্দীদের হয়তো দীর্ঘ কারাভোগ করতে হবে। এ ধরনের কারাদণ্ড শুধু ভারতীয় আইনেরই লঙ্ঘন নয়, বরং এই অযৌক্তিক গ্রেফতার ও ডিটেনশন আন্তর্জাতিক আইনেও নিষিদ্ধ। আর প্রথানুযায়ী, তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত ভারতের বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে আচরণ দেখিয়েছে, তাতে বহু ভারতীয় কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন লঙ্ঘন করে নিয়মিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে খারাপ আচরণের মাধ্যমে দণ্ড থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় তাদের সাহস আরো বেড়েছে।

রোহিঙ্গাবিরোধী নীতি
ভারতে অবস্থানরত বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ২০১২ সালের আগে অথবা মিয়ানমারে ওই বছরের সহিংসতার পর ভারতে আসে। ২০১৭ সালের গণহত্যার আগ পর্যন্ত তারা ভালো অবস্থায় ছিল। ওই সময় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের তেমন একটা স্বাগত জানানো হতো না। কিন্তু ভারত তাদের ব্যাপারে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ভারতে পাঁচ বছর বসবাসকারী একজন রোহিঙ্গা আমাকে বলেছেন, ‘আমাদের বেশির ভাগই প্রথমে বাংলাদেশে যাই। কিন্তু সেখানে তেমন কোনো কাজ না থাকায় অথবা খুব খারাপ কাজের কারণে এবং এখন সেখানে যে শরণার্থীরা আছে; সরকার আমাদের তাদের মতো করে সমর্থন না দেয়ায়, আমরা ভারতে চলে আসি।’ তিনি বলেন, ‘ভারতে যেসব লোক অবস্থান করে- তারা সেখানে আরো বেশি অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পায়। আমাদের জন্য সেখানে সত্যিকার চাকরি খুঁজে পাওয়া যায়।’

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেকের ক্ষেত্রে ভারতে ওই সব সুযোগ-সুবিধার বেশির ভাগই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তারা ভারতকে বাংলাদেশের চেয়ে অধিক শান্তিপূর্ণ ও আনন্দদায়ক হিসেবে পেয়েছে। তবে ভারতে বসবাস করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। কাজের অভাব আছে; কিন্তু সরকার শরণার্থীদের উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে তেমন বাধা দিচ্ছে না। অপর দিকে, স্কুলগুলোতে আরো অধিক শরণার্থী শিশুর যোগদানের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এমনকি কিছু এলাকায় তাদের মৌলিক সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এখন ভারতে সংখ্যালঘু বিশেষত মুসলমানদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। সেখানে বসবাসরত অনেক রোহিঙ্গা মুসলিমের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। মোদি সরকার মুসলিমদের, বিশেষভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সন্ত্রাসী এবং অবৈধ বাঙালি (মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যেভাবে বলেছে সেভাবে) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিজেপি ভারতের মুসলিম শরণার্থীদের ভারতীয় সমাজের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের চরম দক্ষিণপন্থী আন্দোলনকে চাঙা করার জন্য মুসলিমদের খেলার পুতুল হিসেবে ব্যবহার করছে।

এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার এবং তাদের সমর্থকেরা কাজে যোগদান, শিক্ষা, আশ্রয়, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের মৌলিক মর্যাদাসহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৌলিক মানবাধিকারের বেশির ভাগই খুব কঠোরভাবে ধ্বংস করে দিতে সফল হয়েছে।

অতি সম্প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন (ইউএনএইচআরসি) কর্তৃক স্বীকৃত, রোহিঙ্গাদের শরণার্থী কার্ড জব্দ করেছে। আগে থেকেই সে দেশে প্রায় ১৮ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গার আইনগত প্রটেকশন বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষা, কাজ এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ সব কর্মকাণ্ড ও সেবার জন্য একটি রেসিডেন্সি ভিত্তিক ‘আধার কার্ড’ প্রয়োজন। রোহিঙ্গা পরামর্শদাতা এবং শরণার্থীদের মতে, এগুলো আগে কিছু রোহিঙ্গার জন্য ইস্যু করা হয়েছিল। যারা সরকারি শর্ত পূরণ করেছিল তাদের এসব সুবিধা দেয়া হতো। কিন্তু এসব সেবাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ভারতে রোহিঙ্গাদের ওপর অধিক নজরদারি করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা বারবার বায়োডাটা, আঙুুলের ছাপ এবং পেপারওয়ার্ক সংগ্রহ করার মাধ্যমে তাদের হয়রানি করছেন। জম্মু ও হরিয়ানার মতো এলাকায় পুলিশ খুব বেপরোয়া। সেখানে রোহিঙ্গারা বেশি হয়রানির শিকার। এ কারণে তারা দেশের অন্যান্য এলাকায় অথবা বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। ভীতিপ্রদর্শন, নির্বিচারে গ্রেফতার ও ডিটেনশন এবং নির্যাতন বেড়ে গেছে।

সরকার সম্পত্তির মালিক হতে অথবা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে রোহিঙ্গাদের বাধা দিচ্ছে। এ কারণে তারা দুর্গম এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করতে অথবা বস্তির মতো ঘরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

ঘৃণ্য অপরাধী ও চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা
২০১৪ সাল থেকে পুরো ভারতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বৃদ্ধি পায়। অপরাধের দোহাই দিয়ে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চলে। গত এপ্রিলের এক রাতে নয়াদিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর কালিন্দী যোগী বসতি পুড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে বসবাসরত ২২৬ জন অধিবাসীকে সরিয়ে নিয়ে বসতিটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু হামলাকারীরা আবার সেটার ক্ষতি করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা হলে ভারতে আবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপক আগমন ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হয়। জম্মুর উত্তরাঞ্চলে যেখানে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বসবাস করে, সেখানে চরমপন্থী সংক্রান্ত কল্পকাহিনী ছড়িয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের প্রয়াস চালানো হলো। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে তাদের বের করে দেয়ার জন্য বিলবোর্ড ব্যবহার এবং পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। এসব অপপ্রচার ও বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও অনেক রোহিঙ্গা নিজেদের সেখানে সম্পূর্ণরূপে আত্তীকরণ করে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করছে। এ জন্য তারা হিন্দি ভাষাও শিখে নিয়েছে। অন্য কিছু রোহিঙ্গা যারা এখনো আধার কার্ডধারী, তারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা নিরাপদ। তারা কাজের জন্য পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে, তবুও এসব রোহিঙ্গারও পূর্ণ নিরাপত্তা নেই। তারা নাগরিকত্ব অথবা কমপক্ষে বসবাসের অনুমতিও চাইতে পারে না। অন্য দিকে, কয়েক হাজার কম সুবিধাভোগী রোহিঙ্গাকে ভীতি, বঞ্চনা, দৈনন্দিন হয়রানি এবং বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারত রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে জোর করে বের করে দেয়ার যে চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে এখনো মিয়ানমারে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে মারাত্মক বিপদের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে রোহিঙ্গাদের জোর করে প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্বকে।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী রঙ লাগিয়ে ইতোমধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত রোহিঙ্গাদের অব্যাহত ভীতি ও বঞ্চনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন আমরা ভারত সরকারকে তার বিভেদ সৃষ্টিকারী বাগাড়ম্বর এবং বিপজ্জনক নীতি পাল্টানোর জন্য চাপ না দিলে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামভীতি দ্বারা রোহিঙ্গারা অব্যাহতভাবে ক্ষতির সম্মুখীন ও বলি হতে থাকবে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর
মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ




bedava internet