২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে তলানিতে বাংলাদেশ!

-

বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে ব্রিটিশ কোম্পানি কুয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস লিমিটেড (কিউএস) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ তালিকায় শুধু ঢাবি নয়, আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। তবে ৫০০টির মধ্যে বাংলাদেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এসেছে। এগুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ব্র্যাক, নর্থসাউথ, ইউনাইটেড ও ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি।

কিউএস র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামব্রিজে অবস্থিত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। এ ছাড়া, র‌্যাংকিংয়ে প্রথম সারির দিকে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড, যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্য মতে, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ বছর ১৭৫তম অবস্থানে রয়েছে। অন্য দিকে ৩০১ থেকে ৩৫০-এর মধ্যে আছে বেসরকারি ব্র্যাক, নর্থসাউথ ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। শেষের ৫০টির মধ্যে স্থান পেয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এশিয়ার ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১২৭তম, যা ২০১৭ ও ২০১৮ সালের র‌্যাঙ্কিং থেকে আরো ১৮ ধাপ পিছিয়েছে এ দুই বছরে। কিউএস র‌্যাংকিংয়ে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ১২৪তম আর ২০১৭ সালে ছিল ১০৯তম।

কুয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) প্রতি বছর ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করে থাকে। এ ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে : প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাফল্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়ের হার ইত্যাদি।

কিউএসের নতুন এ র‌্যাঙ্কিংয়ে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় যেসব দেশে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে, সেসব দেশের শিক্ষার মানও উন্নত হচ্ছে। উন্নতি করা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উল্লেখযোগ্য। পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো।

তাহলে কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং কেন এত পিছিয়ে? কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা ১০০-তে জায়গা করতে পারল না? প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু চিন্তা করলে আমরা পেয়ে যাবো। সেরা র‌্যাঙ্কিংয়ের শর্তগুলো কী কী এবং আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতি কেমন।

খেয়াল করলে দেখা যায়, র‌্যাঙ্কিংয়ের প্রথমে অবস্থানরত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মূলত একটি গবেষণানির্ভর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি প্রথম সারির দিকের বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যও এ গবেষণাকেন্দ্রিক। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতার নথি ঘাঁটলে দেখা যায়, এগুলোর বাজেটের বেশির ভাগ গবেষণায় ব্যয় করা হয়।

অথচ উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রবণতার উল্টো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৩তম বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের ৬৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না। গবেষণার বদলে চলে মুখস্থনির্ভর পড়ালেখা, চলে চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই চাকরির চিন্তা, ভবিষ্যৎ চিন্তার ঘুণপোকা ঢুকিয়ে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের মুক্ত জ্ঞানচর্চার স্থান। শিক্ষার্থীরা গবেষণা করবেন, নতুন নতুন উদ্ভাবন করবেন, জাতিকে বিশ্বদরবারে মেলে ধরবেনÑ এটাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশ্য। কিন্তু হচ্ছে ঠিক ব্যতিক্রম। শিক্ষার্থীদের হাতে দেয়া হচ্ছে কিছু পাঠ্যবই, লেকচার শিট, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা আর নামমাত্র রিসার্চ পেপার, যার যথার্থতা শিক্ষকেরা ঠিকভাবে বিচার করেও দেখেন না। তাদের মুক্ত জ্ঞানচর্চার সুযোগ না দিয়ে বরং ক্লাসে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি, এসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা হয়। এই যদি হয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতির হিসাব, তাহলে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক নয় কি?

সবচেয়ে বড় বিষয় এটিই, গবেষণা খাতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং মাপকাঠির অন্যতম জায়গা; অথচ এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা বেশি। এর জন্য দু’টি বিষয়কে প্রধানত দায়ী করা যায়। শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত গবেষণামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দের হারের চিত্র খুবই হতাশাজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ১৪ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ মোট বাজেটের ২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ১ শতাংশ, যা বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঠাঁই না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচ্য।

এছাড়া এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারত ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি নাইজেরিয়ার মতো দেশ ২০২০ সাল নাগাদ অন্তত দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০টির মধ্যে অন্তর্ভুক্তের লক্ষ্য ঠিক করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিকল্পনার কথা শোনা যায় না। এখানে র‌্যাঙ্কিংয়ের ধার না ধরার প্রবণতা লক্ষণীয়।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে হলে গৎবাঁধা নিয়মনীতির ঊর্ধ্বে উঠে অগ্রসর হতে হবে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সৃজনীশক্তি দিয়ে নতুনত্ব উপহার দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পড়ালেখা, চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে সৃজনশীলতার দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন, তা শিক্ষকদের বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে শিক্ষার্থীরা গতানুগতিক গণ্ডির বাইরের বিশাল নতুনত্বের স্বাদ উপভোগে ব্যর্থ হবেন।

এ ছাড়া, জাতীয়ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করতে হবে, যাতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে যেতে পারে।
লেকক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ুধযরফধনঁ৬৮@মসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme