২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বইপড়া সেকাল-একাল

বইপড়া সেকাল-একাল - ছবি : সংগ্রহ

শৈশবে আবু সাত্তারসহ আমরা ছিলাম চার বাউণ্ডুলে। ‘লক্ষ্মীছাড়া’ এই চার বাউণ্ডুলের মাথায় ‘সরস্বতী’ ভর করার কথা চিন্তাও করত না। সাত্তারের বাবা কাঠমিস্ত্রি আর বাকি তিনজনের বাবা কৃষক। সাত্তার হাতুড়ি-বাটাল চালিয়ে পিঁড়ি-চৌকি বানাতে পারত শৈশবকালেই। আমরা বানাতে পারতাম ‘গরু-বাছুর ও লাঙল-জোয়াল’। বিশেষ করে ডুমুরগাছের ‘টেডালা’ দেখলে গরু বানানোর জন্য হাত নিশপিশ করত। ডালের আকৃতির ওপর নির্ভর করত এর প্রকৃতি। গাই, বাছুর, ষাঁড় গরুর আকৃতি হতো আলাদা আলাদা। গরুর পরে দ্বিতীয় কাজ মাছ ধরা। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর যেসব ডোবা-নালায় পানি আটকে থাকত, সেখানে পানি সেচে মাছ ধরতাম। টাকি, পুঁটি, কই, শিং ছাড়া মাঝে মধ্যে পাওয়া যেত শোল-গজারও। বর্ষার শুরুতে ছিপ-বড়শি নিয়ে মাছ ধরা তো ছিলই। গাঁয়ের দক্ষিণ পশ্চিমের মাঠের নাম টেকের চক।

কোনো একসময় মেঘনার বুক চিরে ভেসে ওঠা ধুধু বালুরচরে তরমুজ-বাঙ্গি, মিষ্টি আলু ও বাদাম ছাড়া আর কোনো ফসল ফলতে দেখতাম না। উটের পিঠের মতো চকের মাঝখান দিয়ে উঁচু থাকায় জমির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের লোক দেখা যেত না। টেকের চরের চওড়া জমিটার পাহারায় থাকতেন এক বুড়িমা। ক্ষেতের আল দিয়ে হাঁটার সময় আমাদের নজর থাকত বাঙ্গি-তরমুজের দিকে। আমাদের নজর এড়ানোর জন্য উনি বড় তরমুজ বালুর নিচে লুকিয়ে রাখতেন। আমরা লাঠির একমাথা অবিরত বালুতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হাঁটতাম। আমরা যখন ক্ষেতের পাশ দিয়ে হাঁটতাম, বুড়িমার মাথা তখন আউলাতে শুরু করত।

একবার দেখি, আমাদের মধ্যে সাত্তার গরহাজির। জানতে পারলাম, মানুষ করার জন্য সাত্তারকে তার বাবা-মা স্কুলে পাঠিয়েছেন। মানুষ হওয়ার শুরুতেই আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে সে। আমরা যে পথে টেকের চকে আসা-যাওয়া করি, সে পথের পাশেই স্কুল। সাত্তারের জন্য সবার করুণা হলো। তাকে একনজর দেখার জন্য স্কুলের কাছে গেলাম। ওস্তাদজিরা তখনো স্কুলে আসেননি। কয়েকবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে নিশ্চিত হয়ে ঢুকে পড়ি স্কুলে। সাত্তারসহ সবার হাতে নতুন বই। পাতায় পাতায় রঙিন ছবি। রঙিন বইয়ের নাম ‘কচি কথা’। নাকের কাছে নিতেই ঘ্রাণ পেলাম। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। নামের অর্থ বুঝতে না পারলেও ঘ্রাণ বুঝতে পারি। আমাদের মতো শিশুরা রঙিন জামাকাপড় পরে বই হাতে স্কুলে যাওয়ার ছবি। বাড়ি এসে ‘কচুপাতা’ বইয়ের জন্য আবদার করলাম। কায়িক দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় আমাকে দিয়ে লেখাপড়া দূরের কথা, ভালো কিছু আশাই করতে পারতেন না বাবা।

আমার প্রসঙ্গ উঠলে বাবা রাগ ঝাড়তেন মায়ের ওপর। মামাদের তুলে মাকে খোঁটা দিতেন। বাবার বিশ্বাস, আলস্যের কারণে মামারা বড় থেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন, আমিও একদিন বাবার কষ্টার্জিত সব কিছু শেষ করে নিঃস্ব হয়ে পড়ব। তার এক কথা, ছেলে কামচোরা। দৈহিক শ্রমের ভয়ে পড়ালেখার নাম করে স্কুলে যেতে চায়। তার পরও নামের দস্তখতসহ হিসাব-কিতাব রাখার জন্য যতটুকু অক্ষরজ্ঞান আবশ্যক আমাকে ততটুকু পর্যন্ত পড়াতে সম্মত হলেন। বাজার থেকে নতুন বইসহ মাটির স্লেট-পেন্সিল এনে দিলেন। বছরখানেক যেতে না যেতে-
‘ভোর হলো দোর খোলো/ ‘খুকুমণি ওঠো রে/ ঐ ডাকে জুঁই শাখে/ ফুলখুকি ছোট রে’/ এবং ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি যাই।’

ছবির সাথে মিষ্টি-মধুর ছড়া গলা থেকে নামতেই চায় না। বছর দু’য়েক যেতে না যেতেই বাবা বাজার থেকে মোটা একটা বই নিয়ে আসেন। নাম ‘বিষাদ সিন্ধু’। অনেক কষ্টে বইয়ের নামটা উদ্ধার করতে পারি। রাতে উঠোনে বিছানা পেতে জলচৌকির ওপর জ্বালানো হারিকেন বসিয়ে আমাকে ডাকেন। মোটা বইখানা হাতে দিয়ে বললেন, পড়, পড়ে পড়ে সবাইকে শোনা।

বাবার আশপাশে আরো কয়েকজন। মহররম মাস সবাই ‘বিষাদ সিন্ধু’ থেকে ইমামদের কাহিনী শুনতে চান। দ্বিতীয় শ্রেণীর একজন ছাত্রের পক্ষে মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ পাঠ করে কাহিনী শোনানো অসম্ভব। সরল-গরল বর্ণের মিশ্রণে, ‘কার’ যুক্ত করে আমার কণ্ঠ থেকে অর্থপূর্ণ বাণী নিঃসরণের আগে চুলের গোড়া থেকে লোনা পানি নিঃসরণ শুরু হয়ে যেত। শীতের রাতেও মাথার ঘামে বই ভিজতে দেখে, আমার পড়ালেখাকে টার্গেট করে শুরু হয় বাবার গালিগালাজ। এর ভয়ে বিদ্যালয়ের পাঠ রেখে রাত-দিন ‘বিষাদ সিন্ধু’ নিয়ে পড়ে থাকতাম। ফাইভ ক্লাস পর্যন্ত তিন বছরে তিন পর্বের গোটা গ্রন্থখানাই মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। এক চাচা পুঁথি পাঠ করতেন। জঙ্গনামা, সোনাভান ও গাজী কালু চম্পাবতী- এই কয়েকটি পুঁথি ধর্মীয় পুস্তক গণ্য করে কাপড়ের গিলাফের ভেতর সযতেœ ভরে রাখতেন। চাচা পুঁথি অর্ধেক পাঠ করে রেখে দিলে বাকি অর্ধেক শোনার জন্য মন উসখুস করত। চাচা বাড়ি না থাকলে গিলাফ খুলে পুঁথি বের করে বাকি অংশ পড়ার চেষ্টা করতাম।

যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন এক বড় ভাই বিয়ে করেন। বউয়ের বয়স আমার বয়সের সমান। পাশের গাঁয়ের বউ নদীর ঘাটে যাওয়ার নাম করে চলে যেত বাপের বাড়ি। আলতা-পাউডার দিয়েও তাকে বশে আনতে পারছেন না। নাইওর আনতে গেলে পালিয়ে থাকে। বাপের বাড়ি থেকে ধরপাকড় করে আনতে হয়। মোল্লা ডেকে দোয়া-দরুদসহ কবিরাজের পানিপড়া, তাবিজ-তুমার সব কিছু দিয়েও বউকে বদলানো যাচ্ছে না। শেষ দাওয়া হিসেবে বউকে বই কিনে দেয়া হলো। বই পড়ে মাস কয়েকের মধ্যেই বদলে যায় সে। কী বই পড়ে বউ বদলে গেল! বড় ভাইয়ের ঘরে খোঁজ করে ‘আনোয়ারা’ নামে একটা বইয়ের সন্ধান পাই। ভাবীর কাছ থেকে কয়েক দিনের জন্য বইখানা চেয়ে এনে পড়তে শুরু করি। আহার-নিদ্রা ভুলে কয়েকবার পড়েছি ‘আনোয়ারা’।

বই পড়ার নেশা মোহাম্মদ নজিবর রহমানের কালজয়ী এই উপন্যাস দিয়েই শুরু। আনোয়ারার রেশ মন থেকে শেষ না হতেই সন্ধান পাই শরৎসৃষ্টির। প্রখ্যাত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র। তার ‘দত্তা’ উপন্যাস কতবার পড়েছি, লেখাজোখা নেই। শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’ পাঠ শেষে নিজের হৃদয়ই দাহ হতে শুরু করেছিল। প্রধান আকর্ষণ ‘অচলা’। সুরেশের কাছে অচলার আত্মসমর্পণ সহ্য করতে পারিনি। অন্তর্দাহে কয়েক দিন ঘুম নষ্ট হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পাই ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালে। ‘ছুটি’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘হৈমন্তী’ ও ‘সমাপ্তি’ যতবার পাঠ করি, ততবারই লাগে নতুন। ‘সমাপ্তি’ গল্প সমাপ্ত করতে গিয়ে বারবার মনে পড়ত- ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা/ নিতান্ত সহজ-সরল,/ সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি/ তারি দু-চারটি অশ্র“জল।/ নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা,/ নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।/ অন্তরে অতৃপ্তি রবে/ সাঙ্গ করি মনে হবে/ শেষ হয়েও হইল না শেষ।’

ধারাবাহিক সিরিজ গ্রন্থের অন্যতম বনহুর ও মাসুদ রানা। সত্তরের দশকের শুরুতে এই দুই সিরিজের ঘোরের মধ্যে ছিলাম।

একসময় মনের মতো বই কেনার সামর্থ্য না থাকায় নানা কৌশলে বই হস্তগত করাসহ ধার কর্জ করে পড়তাম। মদনপুর থাকাকালে জনৈক রিয়াজুদ্দিনের সাথে বন্ধুত্ব ছিল। সে চালের ব্যবসায়ী হলেও বই পড়ত। ওর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়তাম। রোমেনা আফাজের বনহুর আর কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানার ‘পোকা’ ছিল গোকুল দাসের বাগের নূরুল ইসলাম। একহারা গড়ন ও লম্বা নূরুল যখন রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটত তখন মনে হতো, যেন বনহুর হাঁটছে। শুধু বই পড়ার জন্যই বন্ধুত্ব করতে হয়েছিল তার সাথেও। দস্যু বনহুর ও মাসুদ রানা একখণ্ড শেষ হলে পরের খণ্ড পড়ার জন্য অধীর হয়ে থাকতাম। ধার করা বই সময় মতো ফিরিয়ে দেয়ার জন্য পড়তে পড়তে রাত পার হয়ে যেত। সম্পর্কিত এক চাচা পড়তেন সবজান্তা সিরিজের বই। বিচার-সালিশে তিনি অনেক দৃষ্টান্ত উপমা বলতেন। গ্রামের বিচারে রায় কার্যকর করার জন্য দৃষ্টান্ত উপমার তুলনা নেই। সবজান্তা সিরিজের কয়েকটা বইয়ে রয়েছে শিক্ষণীয় সব দৃষ্টান্ত।

কোথাও নতুন বইয়ের সন্ধান পেলে তা না পড়া পর্যন্ত স্বস্তি পেতাম না। সাহিত্য অধ্যয়নকালে পরিচিত হই ঢাকার নীলক্ষেতের সাথে; দুই বাঙলার বইসহ পুরনো বইয়ের বিশাল আয়োজন সেখানে। নিউ মার্কেট এলাকায় গেলেই এক-দেড় ঘণ্টা কাটত নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানে। খুঁজে পাই সুফিবাদের ওপর দুর্লভ কিছু বই।

সত্তরের দশকের শেষদিকে নারায়ণগঞ্জ সুধীজন পাঠাগার এবং বন্দর সাধারণ পাঠাগারসহ বেশ কিছু পাঠাগারের সাথে পরিচয় হলো। চোখের সামনে উন্মোচন ঘটে শত লেখকের হাজার গ্রন্থের। প্রবেশ করি নীহাররঞ্জন গুপ্ত ও বঙ্কিমচন্দ্রের জগতে। বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা ও বিষবৃক্ষ পাঠকালে মন চলে যেত অতিমর্ত্য জগতে। ২০০৩ সালের দিকে ‘বিলেতের পথে পথে’ প্রকাশ করতে গিয়ে নিজেই ঢুকে পড়ি বইয়ের ভুবনে। ঢুকে বুঝতে পারি, বই কত সহজলভ্য। তবে যত সহজলভ্য হচ্ছে, ততই দুর্লভ হয়ে উঠছে পাঠক। একসময় পাঠের পিপাসা এত বেশি ছিল যে, ‘চুরি’ করে বই এনে পিপাসা নিবৃত্ত করতাম। এখন পিপাসা এত কম যে, ‘গিফট’ হিসেবে বই দিয়েও পড়ানো যাচ্ছে না। এত দিন পাঠক বই খুঁজত- আর এখন বই পাঠক খোঁজে। গিফট পাওয়া বইয়ে মন না ভরলেও শোকেস ভরতে শুরু করে দেয়। আগে বই পড়তে শুরু করলে চোখ থেকে ঘুম ছুটে পালাত এখন বই পড়তে শুরু করলে চোখজুড়ে নেমে আসে ঘুম।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme