২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

গণতান্ত্রিক দেশে দল নিষিদ্ধ হয় কি?

গণতান্ত্রিক দেশে দল নিষিদ্ধ হয় কি? - ছবি : সংগ্রহ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় বা ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা ব্যাপক। দেশে অনেকগুলো ইসলামপন্থী দল রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজ ভাণ্ডারীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, জামায়াতের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যে নিবন্ধন লাগে, নির্বাচন কমিশনের কাছে সেসব শর্ত তারা পূরণ করতে পারেনি বলে তাদের নিবন্ধন দেয়া হয়নি। কিন্তু তাদের নিষিদ্ধ করার জন্য এরই মধ্যে কোর্টে একটি মামলা রয়ে গেছে। মামলার রায়টা যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা দল হিসেবে জামায়াত বাতিল হয়েছে, তা বলতে পারি না। যদি কোর্টে রায় হয়ে যায়, তাহলে জামায়াত দল হিসেবে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। (সূত্র : নয়া দিগন্ত)।

২০১৩ সালের ১ আগস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তিনজন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চের দু’জন নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে ছিলেন। অন্যজনের ছিল ভিন্নমত। এ রায়ের সাথে সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় হাইকোর্ট সরাসরি আপিল করার সনদ দেন। রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে ওই দিনই জামায়াত আপিল করে। আদালত হচ্ছে ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। আমরা আশা করব, আদালত সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।

গণতান্ত্রিক দেশে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয় না, এমনকি সেকুলার দেশেও নয়। আমেরিকা কিংবা ইউরোপে রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয় না। সেকুলার রাষ্ট্রেও ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন আছে। ইউরোপের বহু দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি রয়েছে। অন্য দিকে, সেকুলার ভারতে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী রয়েছে। ওই সব দেশে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কেউ দাবি করেনি। তাহলে আমাদের দেশে কেন তা করা হচ্ছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বৈকি। জামায়াতে ইসলামী ১৯৭৯ সাল থেকে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দলটির মধ্যে কোনো অপরাধী থাকলে বিচার হতে পারে আইন মোতাবেক। ইতোমধ্যে দলটির অনেকেরই বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে। আরো কেউ অপরাধী থাকলে তাদের বিচার হতে পারে। কিন্তু সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা ভালো নজির হবে না বলেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। যদি অপরাধ ঘটে থাকে, তাহলে কিছু ব্যক্তি অপরাধ করেছে- একই কথা অনেক দলের ব্যাপারে সত্য হতে পারে।

বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন, সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ গঠন করা। বাংলাদেশের উন্নয়ন বিদ্বেষপরায়ণ বিদেশী মহলের মনঃপূত নয়, এটি আমাদের মনে রাখতে হবে। মোট কথা, দেশের ও গণতন্ত্রের স্বার্থে গুরুত্বহীন ইস্যু বাদ দেয়া প্রয়োজন। জামায়াত বা ধর্মীয় দল যারা করেন তারা এ দেশেরই সন্তান। নাগরিক হিসেবে তাদের রাজনীতি করার অধিকার সংবিধানসম্মত। আদর্শে বিশ্বাসী মানুষকে দমিয়ে রাখলেও তার আদর্শকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে- যে রাষ্ট্রে মানুষের ঘুম ভাঙে ফজরের আজানের আওয়াজ শুনে, সে রাষ্ট্রে ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করা সঙ্গত নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, এই অঞ্চলের ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে ধর্মীয় রাজনীতি।

রাজনীতিতে উত্থান-পতন স্বাভাবিক। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে এর বহু প্রমাণ পাওয়া যাবে। বিগত ৪০ বছর ধরে আলোচ্য দলটি আইনগতভাবে রাজনীতি করছে। তারা জামায়াতের নামেই জাতীয় সংসদে কয়েকবার নির্বাচিত হয়েছেন। এমনকি মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। গত উপজেলা নির্বাচনে তারা ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। একটি জাতীয় নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এ দেশটা আমাদের সবার। ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের ভোটব্যাংক কত বড়, তা বিশেষত বিগত উপজেলা নির্বাচনে দেশবাসী দেখেছে।

সম্রাট আলেকজান্ডারের হাতে বন্দী ভারতীয় রাজা পুরুকে আলেকজান্ডার জিজ্ঞেস করেছিলেন- পুরু, আমার কাছে আপনি কী চান? জবাবে পুরু বলেছিলেন সারা বিশ্বে ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’ হিসেবে সবার কাছে আপনি পরিচিত। মহানের কাছ থেকে মহান কিছুই আশা করি।’ সম্রাট আলেকজান্ডার কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর সসম্মানে পুরুকে মুক্তি দিলেন। চাইলে বন্দী পুরুকে আলেকজান্ডার কী-ই না করতে পারতেন। কিন্তু কিছুই করেননি। এ জন্য আজো আলেকজান্ডার ‘গ্রেট’ হিসেবে ইতিহাসের পাতা দখল করে আছেন। ইতিহাসে অবশ্য এর বিপরীত উদাহরণও আছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনেরা আলেকজান্ডারের মতো মহত্ত্বের পরিচয় দিয়ে সব দলের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবেন, এটি দেশবাসীর প্রত্যাশা।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme