১৮ আগস্ট ২০১৯

আরব দেশগুলোর ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ

আরব দেশগুলোর ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ - ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের তরল স্বর্ণের দেশ হিসেবে পরিচিত আরব রাষ্ট্রগুলোতে এখন যেন নতুন কোনো উদ্দীপনা নেই, জীবনযাত্রায় নেই কোনো স্পন্দন, কেমন যেন বৈচিত্র্যহীন বাঁধাধরা গৎবাঁধা জীবন। এক সঙ্কটের পর আরেক সঙ্কট। আরব রাষ্ট্রগুলো একের পর এক আঞ্চলিক সঙ্কটে এখন বিভক্ত। সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন,্ ইরান ও ফিলিস্তিন সর্বত্রই সমস্যা ও সঙ্কট।

সর্বোপরি অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এ অঞ্চলকে আবার অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে হুমকির সৃষ্টি হয়েছে। আন্তঃআরব মতপার্থক্য আরব দেশগুলোকে ও আরব লিগকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে আরব লিগ যেন অচল হয়ে আছে। সংগঠনটির সভা, প্রস্তাব ইত্যাদি কখন জনসমক্ষে দৃষ্টিগোচর হয়েছে তা মনে পড়ছে না। জর্দানে অতি সম্প্রতি ছয় দেশের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থাটির আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আরব লিগের কার্যক্রম ও বর্তমান নিষ্ক্রিয়তার বিষয়াদি আলোচনায় স্থান পায়। জর্দানের একটি সূত্র জানায়, আরব দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে প্রধান আঞ্চলিক ফাইলগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, মিসর ও জর্দানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কৃষ্ণসাগরের অবকাশ যাপন কেন্দ্রে আলোচনায় মিলিত হন। তারা আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেন।

আরব নেতারা আগামী মার্চে তিউনিসিয়ার রাজধানীতে বার্ষিক আরব শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করেছেন। তাই শীর্ষ সম্মেলনের কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এ সভাটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণসাগরের অবকাশ যাপন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের আলোচ্য সূচির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল আরব লিগের সিরিয়ার সদস্য পদ প্রসঙ্গ। উল্লেখ্য, সিরিয়ায় গণ-অভ্যুত্থান বা গণজাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় আরব লিগে সিরিয়ার সদস্য পদ বন্ধ বা স্থগিত করা হয়।

পরবর্তীকালে দামেস্ক ও আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে থাকে। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে তাদের দূতাবাস আবার খুলে দিয়েছে। জর্দান সিরিয়ার সাথে তাদের সীমান্ত আবার খুলে দিয়েছে এবং সিরিয়া ও আরব কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আবার সফর শুরু হয়েছে। আরব দেশগুলো বিশেষত কাতার সিরিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য চাপ প্রয়োগ করায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ ক্রমেই উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে লেবাননের সরকারও বিভক্ত। আর লেবাননে নির্বাচনের দীর্ঘ কয়েক মাস পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও সিরিয়াকে আবার মেনে নেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেশটির সরকারকে যেন ইরান থেকে দূরে রাখা যায় এবং উত্তেজনাপূর্ণ সাত বছরের পর যেন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র আবার নতুন করে তৈরির উদ্যোগ নেয়া যায়। এই সাত বছরে ইরান এবং তার প্রক্সিরা উভয়ে সিরিয়ায় আত্মনিয়োগ করেছিল। একইভাবে এখন সিরিয়ায় রাশিয়া ও তুরস্ক উভয়ের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সাথে সাথে ইরাকের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো দূতাবাস আবার খোলার কারণে সম্প্রতি সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। আরব দেশগুলো পদস্থ ইরাকি কর্মকর্তাদের তাদের দেশে স্বাগতও জানিয়েছে। চলতি মাসের প্রথমার্ধে জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ সরকারিভাবে বাগদাদ সফর করেছেন। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আবদেল মাহদি এ সফরকে ঐতিহাসিক সফর বলে বর্ণনা করেছেন। জর্দানের জন্য ইরাক ও সিরিয়ার স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জর্দানের সাথে ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত রয়েছে। জর্দানের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই উয় দেশের সাথে সম্পর্ক থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি সরাসরি ইরানের সাথে সম্পর্কিত। ইরান অব্যাহতভাবে হস্তক্ষেপ করতে থাকলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। আরব দেশগুলোও ওই অঞ্চলে আর কোনো যুদ্ধ দেখতে চায় না। জর্দানে অনুষ্ঠিতব্য আরব শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হবে। ফিলিস্তিনি ইস্যুটি বেশির ভাগ আরব দেশের আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু দুই রাষ্ট্র সমাধানের বিষয়টি এখন নস্যাৎ হয়ে গেছে। ছয় আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হবে আরব শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে আরব লিগের শীর্ষ সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরব নেতারা কি সত্যিকার অর্থে পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত হয়ে আরব বিশ্বের কল্যাণ ও উন্নয়নে এগিয়ে যেতে?


আরো সংবাদ




bedava internet