২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভারতে মোদিবিরোধী আন্দোলন ও মমতা ব্যানার্জি

মমতা ব্যানার্জি - ছবি : সংগৃহীত

চলতি বছরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সর্বশেষ সিবিআই-পুলিশ সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ধরনা আন্দোলন ঘিরে ভারতের সরকারবিরোধীরা কার্যত একজোট হয়েছে। রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে ফারুক আবদুল্লাহ, অখিলেশ যাদব, শারদ পাওয়ার, চন্দ্রবাবু নাইডু সবাই একাট্টা হয়ে নরেন্দ্র মোদির বিদায় চাচ্ছেন। বিরোধী নেতারা টুইট করে এবং ফোন করে মমতার মোদিবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের ছেলে তেজস্বী নেতা যাদব সোমবার কলকাতার ধরনা মঞ্চে এসে উপস্থিত হন। অন্য দিকে একই দিনে সংসদে একই ইস্যুতে কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, ডিএমকেসহ সব দলের সংসদ সদস্যরাই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে একসময় সংসদের দুই কক্ষ রাজ্যসভা ও লোকসভা স্থগিত করে দিতে হয়। সংসদ ভবনে এ ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো বৈঠকে বসে পরবর্তী কয়েক দিনের আন্দোলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। নিঃসন্দেহে মমতার এই মোদি তথা দিল্লিবিরোধী আন্দোলন বিরোধী দলের পালে নতুন করে শক্তি সঞ্চার করেছে।

এ দিকে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের রায় তাতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি আনলেও এই সঙ্ঘাত যে সহজে মিটছে না তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এ ঘটনা নিছক ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিবিআই) বনাম একটি রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর সঙ্ঘাত নয়, কিংবা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক গালিগালাজও শুধু নয়। রোববার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া কলকাতার নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ বরং একটি অত্যন্ত গুরুতর সমস্যারই অশনিসঙ্কেত, আর সেটা হলো ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আসা হুমকি। ভারতের প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যে সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা, তার ভিত ধরেই যেন নাড়া দিয়েছে কলকাতার এ ঘটনা।

ভারতের সংবিধানে যদিও খুব স্পষ্ট করে বলা আছে- শাসনব্যবস্থার কোন অংশ রাজ্য সরকার ও কোন অংশ কেন্দ্রীয় সরকার দেখবে (এবং কোন কোনটা উভয়েরই দায়িত্ব, অর্থাৎ ‘যৌথ তালিকায়’), তার পরও ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের এখতিয়ারের সীমা নিয়ে বাগি¦তণ্ডা গত ৭০ বছরেও থামেনি।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে সরকারকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রের রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এসআর বোম্বাই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সে প্রক্রিয়া অনেক কঠিন হয়ে গেছে। এখন আর প্রধানমন্ত্রীর মর্জি হলেই এত সহজে কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ছেঁটে ফেলা সহজ নয়। কিন্তু তার পরও রাজ্যকে বিড়ম্বনায় ফেলার অনেক হাতিয়ার এখনো কেন্দ্রের হাতে আছে। আর মূলত সেই প্রশ্নকে ঘিরেই দিল্লির মসনদে থাকা মোদি-অমিত শাহ জুটির বিরুদ্ধে ফুঁঁসে উঠেছেন মমতা ব্যানার্জি।

ভারতে আঞ্চলিকতার রাজনীতি করে বিভিন্ন প্রদেশে যে শক্তিগুলোর উত্থান, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস তারই অন্যতম। ফলে যথারীতি তার এ আন্দোলনে তিনি পাশে পেয়েছেন বিহার, উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র এমনকি জম্মু-কাশ্মিরের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিকেও। কিন্তু বিরোধীদের এই সম্মিলিত আন্দোলন কি ভারতের সংবিধানকে বিপন্ন করে তুলবে?

ভারতে সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই কাগজে-কলমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি সংস্থা হলেও তারা যে আসলে পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে, সেটি কোনো গোপন কথা নয়। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত কয়েক বছর আগে সিবিআইকে ‘খাঁচায় বন্দী তোতাপাখি’ বলে বর্ণনা করেছিল। অর্থাৎ যারা নিজেরা ইচ্ছামতো চলাফেরা করতে পারে না, সরকারের শেখানো বুলিই যাদের বলতে হয়।
সেই সিবিআইয়ের একদল অফিসার রোববার সন্ধ্যায় কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজিব কুমারের বাংলোতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এসে হাজির হন। রাজিব কুমার ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের অফিসার। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। কিন্তু তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে কাজ করছেন, কলকাতার পুলিশপ্রধান হিসেবে তিনি মুখ্যমন্ত্রীরও অতি আস্থাভাজন।

এতটাই যে এর আগে যখন পশ্চিমবঙ্গে সারদা চিট ফান্ডের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে ও তাতে নাম জড়িয়ে যায় অসংখ্য ছোট-বড় তৃণমূল নেতার, মমতা ব্যানার্জি এই রাজিব কুমারকেই দিয়েছিলেন এর তদন্তভার। রাজিব কুমারের সেই ‘স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম’ ওই কেলেঙ্কারিতে এক ‘বিদ্রোহী’ কুনাল ঘোষ ছাড়া কোনো তৃণমূল নেতারই সংস্রব পায়নি, তা অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ।

কলকাতা পুলিশ তাদের ‘বস’কে রক্ষা করতে যেটা করে, তা স্বাধীন ভারতে আর কোনো দিন কোথাও হয়েছে কি না সন্দেহ। তারা ওই সিবিআই কর্তাদের বাংলোতে ঢুকতে তো দেয়ইনি, টেনেহিঁচড়ে তাদের পুলিশের গাড়িতে তুলে কাছের থানাতেও নিয়ে যায়। ঘণ্টা দুয়েক আটক থাকার পর ওই সিবিআই অফিসাররা থানা থেকে বেরোতে পারেন।

ভারতে একটা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকার বা তাদের পুলিশেরই। কিন্তু সেই যুক্তিতে সেই ‘দারোগা’রা যেভাবে কেন্দ্রের সিবিআই-বেশী ‘কোতোয়াল’দের পর্যন্ত পাকড়াও করে নিয়ে গেছেন, দিল্লিতে ভারত সরকারের নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের এখনো তা বিশ্বাস করতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে। তখনই অনুমান করা গিয়েছিল, এই সঙ্কট আরো বড় আকার নেবে- আর ঠিক হয়েছেও তা-ই।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ধরনায় বসার সাথে সাথেই একে একে তার দিকে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ, ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো বহু বিরোধী নেতা।

কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী পর্যন্ত টুইট করেছেন, ‘এই লড়াইয়ে আমরা মমতা ব্যানার্জির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ব।’
মমতা ব্যানার্জি আসলে খুব সুকৌশলে এ লড়াইকে একটা ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ চেহারা দিতে পেরেছেন।
কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআইকে পাঠিয়ে কেন্দ্র কি ঠিক করেছে? কিংবা নিজের পছন্দের পুলিশ কর্তাকে আড়াল করতে মুখ্যমন্ত্রীর ধরনায় বসা কি ঠিক হয়েছে? বাগি¦তণ্ডা এখন চলছে এসব ইস্যুতে।

দুই মাস পরই ভারতের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা বিরোধী শিবিরে প্রধানমন্ত্রিত্বের অন্যতম দাবিদার মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভাগ্যে এই ঘটনার কী প্রভাব পড়বেÑ তুমুল আলোচনা চলছে তা নিয়েও।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme