২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? - ফাইল ছবি

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ‘সূর্য অস্ত যেত না’। কী করে ব্রিটিশরা এই বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছিল? কথিত আছে, ক্ষুদ্র এই দ্বীপ দেশটির পক্ষে বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার পেছনে কাজ করেছিল তাদের ভাষা ইংরেজিতে প্রচলিত তাৎপর্যপূর্ণ অজস্র প্রবাদবাক্য, যেগুলো তারা মেনে চলত। এসব প্রবচনের অনেকগুলো তাদের সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বাংলা অঞ্চলের ভাষা বাংলায় এমন কায়দা করে অনুবাদ করা হয়েছে- যা শুনলে মনে হয় এগুলো বাংলায় প্রচলিত প্রবাদবাক্য। যেমন, ইংরেজিতে প্রচলিত একটি প্রবাদ, Something is better than nothing, এর বাংলা ’নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’। আরেকটি প্রবচন এখানে প্রাসঙ্গিক এবং তা হলো- After clouds comes fair weathe, যার বাংলা করা হয়েছে ‘দুঃখের পরে সুখ আসে’।

আলোচ্য বিষয় হলো, গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আর বিএনপিকে অনৈতিকভাবে হারিয়ে দেয়ার পরও যে নগণ্যসংখ্যক আসন তারা পেয়েছেন, তা নিয়ে তাদের সংসদে যাওয়া সমীচীন কি না তা খতিয়ে দেখা। অবশ্য এ ব্যাপারে আমাদের মতো রাজনীতির বাইরের লোকের তুলনায় সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকরাই ভালো বলতে পারবেন।

ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি বলে আসছে, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না এবং সংসদেও যাবেন না। এটা তারা বলতেই পারেন। কারণ যে স্টাইলে নির্বাচন হয়েছে, তাতে কেবল ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নয়, বরং পুরো জাতি বিস্মিত ও মর্মাহত। সরকার বলতে চাইছে এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এ দাবি শুনলে, ঢাকাইয়া জবানিতে বলি, ’ব্যালট বাকছ ভি হাছব’। যা হোক, ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির সংসদে যাওয়া ‘উচিত’ বলব না, তবে ‘দরকার’। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি সঙ্গত কারণেই বলে আসছে- তারা এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেটা ঠিক।

এ অবস্থায় এরা যদি সংসদে যায় তবে এটা ধরেই নেয়া যায়, আওয়ামী লীগের নেতারা পুলকিত হয়ে বলবেন- তাদের সংসদে আগমনই প্রমাণ করে, এবার নির্বাচন সঠিক হয়েছে। আওয়ামী লীগাররা এটা স্বীকার করতে চাইছেন না, গত ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বেপরোয়া ভোট জালিয়াতি, বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার, সারা দেশে ভোটারদের ভোটদানে বাধা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়েও বিএনপি যে ক’টি আসন পেয়েছে, তা বাস্তবতার নিরিখে হিমালয় বিজয় সমতুল্য। যে ভীতিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে, তাতে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির কোনো আসনই পাওয়ার কথা ছিল না। ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’। এত বাধাকে উপেক্ষা করে যে সব ভোটার বিএনপিকে নগণ্য ক’টি আসনে হলেও জিতাতে পেরেছেন, তাদের প্রতিবাদের ভাষা সংসদের ভেতরে-বাইরে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

এই নির্বাচনে সরকার সরকারি বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন প্রভৃৃতি প্রতিষ্ঠানকে কব্জায় নিয়ে এবং দলীয় ক্যাডারদের কাজে লাগিয়ে ১০ কোটিরও বেশি ভোটারকে ‘এতিম’ বানিয়ে ছেড়েছে। ক্ষমতাসীনদের ভাষায় ‘এতিমের টাকা চুরি করে খাওয়ায়’ বিএনপিপ্রধান জেল খাটছেন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে- ১০ কোটি ভোটারের ভোট চুরি করে তাদের রাজনৈতিক এতিম বানিয়ে আওয়ামী লীগ এখন জাতির কাছে কী জবাব দেবে? দেশে যদি এই ভোটবঞ্চিত এতিমদের প্রতিবাদের ভীতিহীনভাষা থাকত, তারা ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে বা ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে যেমন করেছিল, তেমনি বিক্ষোভ-প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসত। সেটা বাস্তবে হতে পারছে না। তবে কি ধরে নেবো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এরশাদের স্বৈরশাসন এবং আইয়ুব খানের ঔপনিবেশিক শাসনামলের চেয়েও উদ্বেগজনক।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলে থাকেন, বিএনপি সংসদে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না এলে তাদের মুসলিম লীগের ভাগ্য বরণ করতে হবে। এটা এক ধরনের চাপ এবং হুমকি। বিএনপি আওয়ামী লীগের মতোই প্রতিষ্ঠিত একটি বড় দল। ক্ষমতাসীন দলের ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’ নীতির কারণে বিএনপি এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে ছয়টি আসন পেয়েছে যা অবিশ্বাস্য। যুদ্ধক্ষেত্রে পৃষ্ঠ প্রদর্শন না করে ওই ছয়জন সংসদ সদস্যকে নিয়েই বিএনপি সংসদে যাওয়া উচিত। তাদের এই প্রত্যাখ্যাত নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ও বিশ্বাসযোগ্য নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে যথা শিগগির ন্যায়সঙ্গত পুনর্নির্বাচন আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সে নির্বাচনে যদি বিএনপি হেরে যায় এবং আওয়ামী লীগ জিতে, কারো কিছু বলার থাকবে না। মোট কথা, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোটারদের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে, তা জাতি মাথা পেতে নেয়ার মতো নয়।

কাজটি কঠিন হবে। সংসদ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধ্যকতায় তিনবার উচ্চারণে ’হ্যাঁ’ বা ’না’ জয়যুক্ত হয়েছে ধরনে চলে। তাতে সে সংসদে বিএনপির বাহ্যত কিছুই করার থাকে না। তবে একটি লাভ হবে। সেটা হলো- আওয়ামী লীগ ভোটারদের এ কথা বলতে পারবে না যে, বিএনপিকে ভোট দিয়ে কী হবে? কারণ তারা সরকার গঠন করতে না পারলে সংসদে আসে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় আগামী নির্বাচন হয়তো আরো প্রহসনমূলক হতে পারে। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে বিএনপিকে সংসদের ভেতরে-বাইরে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখা জরুরি, এ দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে বিলুপ্ত বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

বিএনপি সংসদে যাওয়া প্রয়োজন এবং দেশে ন্যায়ভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলুক। বিড়ালের গলায় বিএনপিকেই ঘণ্টা বাঁধতে হবে। ইতিহাস এর সাক্ষী হয়ে থাকবে। জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এ লড়াইয়ে বিএনপিকে পণ করতে হবে, ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’।

আওয়ামী লীগের কেউ কেউ দাবি করেন, এবার ‘তরুণ প্রজন্ম তাদের জিতিয়েছে।’ কথাটা আংশিক সত্য। দেশের ব্যাপকসংখ্যক তরুণ ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। তবে সারা দেশে আওয়ামী লীগের বেপরোয়া তরুণরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ২৯ ড়িসেম্বর রাতে নৌকায় সিল মেরে ব্যালট দিয়ে বাক্সে ভর্তি করার মতো ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে দলকে অবিশ্বাস্য ও আকাশ-পাতাল ভোটের ব্যবধানে জিতিয়েছে। এ নির্বাচন তরুণ প্রজন্মের সামনে এক কঠিন ও বিব্রতকর অনিয়মের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, সেটা হলো- দেশে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-আদর্শবোধ বলে কিছু আর নেই। দেশে চালু হয়েছে সেই সর্বনাশা প্রবাদপ্রতিম নীতি- ‘Might is right’ যার মানে ’জোর যার মুল্লুক তার’।

দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ জোর খাটিয়ে জিতেছে, ভোটারদের বিনম্র শ্রদ্ধার ভোটে নয়। মারাত্মক অন্যায়ের গুরুভার অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা একটি জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায় না। একটি প্রভাবশালী দল হিসেবে বিএনপির সামনে আজ অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগও এসেছে তা হলো, জাতির দেহ থেকে এ অন্যায়ের কালিমা মুছে দিয়ে নতুন দিনের সূচনা করা। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ কথা দু’টি অহরহ শোনা যায়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যা হলো এটা কি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কিংবা ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’র কাজ? সংশ্লিষ্ট দলটির ব্যাপারে সিরিয়াসলি ভেবে দেখার দিন জাতির সামনে এসে গেছে।

নির্বাচনে বারবার কারসাজি করে জিতে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে থাকার অধিকার কোনো দলকে কেউ দেয়নি। এর প্রতিকার ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বা চিন্তা সুদূরপরাহত। আশা রাখতে হবে After clouds comes fair weather, যার অর্থ ’দুঃখের পরে সুখ আসে’। বারবার ভোটবঞ্চিত হয়ে দুঃখের সায়রে হাবুড়–বু খাওয়ার জন্য রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়নি। নির্বাচনে কে জিতল কে হারল তার চেয়ে বড় বিষয়- ভোটাররা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলেন কি না এবং তাদের ভোট সততার সাথে গণনা করে নির্বাচনের ফলাফলে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হলো কি না। এটা নিশ্চিত হলেই নির্বাচন নিয়ে জনগণ খুশি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি এ সুসংবাদ জনগণ পায়নি। বিষয়টি রাজনীতিকদের মাথায় রাখতে হবে। অন্যথায় স্বাধীনতা ও উন্নয়ন উদ্দেশ্যহীন বলে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme