২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

তারা মিয়ার ঢাকা দর্শন

তারা মিয়া - ছবি : সংগ্রহ

আকাশের তারা নয়, তার নাম তারা মিয়া। বয়স ৪৫ বছর। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাঁটেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ডান বাহু অচল। খাবার খেতে হয় বাঁ হাতে। জীবন চলে অন্যের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে বহু কষ্টে। এসেছিলেন সুদূর সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে ঢাকা দর্শনে। তার ‘ঢাকা দর্শন’ কৌতূহলোদ্দীপক। তার জীবনে সাধ-আহ্লাদ যেন থাকতে নেই। তবুও এবার ঢাকা দর্শন ছিল বাধ্যতামূলক। অতীব প্রয়োজনে। পুলিশের বদৌলতে আর বদান্যতায়!

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললে কী হবে, তারা মিয়া নাকি তার চেনা ৫২ জনসহ অজ্ঞাত আরো ৭০-৮০ জনের সাথে মিলে অবশ হাতেই রামদা, হকিস্টিক ও রড, অর্থাৎ দেশীয় সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করেছেন পুলিশের ওপর। কী সাংঘাতিক কথা!

নড়বড়ে বিশ্বাসে গড়া আমাদের সংশয়ী মন এতে সায় দিতে চায় না। তবুও পুলিশের মুখনিঃসৃত কথা! তাদের দাবি আমজনতা হয়ে আমরা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই কিভাবে? উপেক্ষা করি কেমন করে? হাজার হোক আমাদের জানমাল রক্ষায় জীবনপাত করছেন পুলিশ ভাইয়েরা। তাদের একজন যখন বলছেন, তখন কান পেতে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে শুনতেই হবে। ভদ্রজনেরা তা-ই করেন।

রাত নেই, দিন নেই- সব সময় রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যতিব্যস্ত বাহিনী কী করে ভুল করবে? তা হতে পারে না। তাদের দম ফেলার ফুরসত কই? একটুও অবসর নেই। তাদের একজন যখন তারা মিয়ার দিকে আঙুল তুলেছেন, তা বিশ্বাস না করে কি উপায় আছে? কার এত সাহস, এ অভিযোগ অবিশ্বাস করে। আর বেচারা তারা মিয়া ঢাকায় এসেছেন উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিতে। বিচারকের কাছে তার মনের কথা খুলে বলতে; পুলিশের ওপর এতটুকুু আস্থা না রেখে। কত বড় দুঃসাহস, ভাবা যায়! আদব-কায়দা বলে কিছু নেই। যত সব ‘গেঁয়ো ভূত’।

আর বেরসিক গণমাধ্যম এ নিয়ে পিছু লাগে। তোলে মস্ত বড় এক প্রশ্ন- প্রতিবন্ধী তারা মিয়াকে দিয়ে এমন কাজ হতে পারে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। এর বাস্তবতা কতটুকু? দেশবাসীর সামনে গণমাধ্যম প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর পক্ষে কিভাবে সন্ত্রাসী এমন কাণ্ড ঘটানো সম্ভব? অথচ তার স্বাভাবিক জীবন বলতে কিছু নেই। উপরন্তু নিজের দেহ বয়ে চলাই দুরূহ। সেই তারা মিয়া কিভাবে ঘটাতে পারেন এমন ভয়ঙ্কর অপরাধ?

দেশের একটি ইংরেজি দৈনিক প্রথম পৃষ্ঠায় তারা মিয়ার ঢাউস ছবি ছেপেছে। সাথে নাতিদীর্ঘ একটি সংবাদকাহিনী। পরদিন গুরুত্ব দিয়ে লেখে একই বিষয়ে সম্পাদকীয়। পত্রিকাটি যেন তারা মিয়াকে তারকাখ্যাতি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লাগে। অনেকের মনে হতে পারে, মিডিয়ার খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজ নেই, যত সব অকাজের ঢেঁকি!
অথচ পুলিশের যে সহকারী উপপরিদর্শক এত কষ্ট করে, খেটেখুটে মামলাটি করলেন, সেই তারিকুল ইসলামকে বিবেচনায় নিলো না গণমাধ্যাম। পাত্তাই দিলো না। এতে ‘ভারসাম্য’ রক্ষা হয় কিভাবে?

ঘটনাটি একটু খুলেই বলা দরকার। তা না হলে হেঁয়ালি মনে হতে পারে। জামালগঞ্জ থানায় পুলিশ বাদি হয়ে তারা মিয়াসহ অনেকের নামে যে মামলা করেছে; তার বিবরণ অনুযায়ী- দিনটি ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের ঠিক দুই দিন আগে, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮। আনুমানিক বিকেল ৪টা ৪০ মিনিট। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর বাজার এলাকায় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থনে বেআইনিভাবে বেশ কিছু লোক মিছিল বের করেছিল। মিছিল করতে গিয়ে তারা সড়ক অবরোধ করে। আর করে বসেছিল পুলিশের ওপর হামলা। এতে মামলার বাদি সহকারী উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলামসহ জামালগঞ্জ থানার অন্তত পাঁচজন পুলিশ আহত হন। এই যদি হয় ঘটনা, তাহলে এএসআই তারিকুল মামলা করবেন না কেন? এতে তার দোষটা কী? তারিকুল আহত হয়ে ঘটনার দুই দিন পর মামলা করেছেন। দেরি করে মামলার ঘটনাই কি প্রমাণ করে না, তারিকুল কত মানবিক!

লোকজন এটি দেখেও না দেখার ভান করে। তারা শুধু তারা মিয়ার বয়ানই বিশ্বাস করে বসল? তারা মিয়া না হয় সাংবাদিকদের বলেছেন- ‘আমার পক্ষে কী করে পুলিশের ওপর হামলা করা সম্ভব, যেখানে আমার ডান হাত প্রায় অচল। আর বাঁ হাত ভালো মতো কাজই করে না। আমি রাজনীতি করি না। ভিক্ষা করে জীবন চলে...। আমি আমার পরিবারের টিকে থাকা নিয়ে চিন্তিত। কোনো মিছিলে অংশ নেইনি। তাহলে কিভাবে একা পুলিশের ওপর হামলা করলাম?’

তারা মিয়া জামালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন ১৫ জানুয়ারি। রাজধানীতে দিনগুলো কাটে গাছতলায়, খোলা আকাশের নিচে আর ভবনের ফাঁকা বারান্দায়। তাতে কী! এত কিছুর পরও তার ঢাকা দর্শন সার্থক। দেখলেন কত কী। জীবনে যা দেখেননি, সেই সব। ঢাকার লাল-নীল বাত্তি। মনোমুগ্ধকর নিয়ন আলো। ইহজীবনে আর দেখা হয়ে উঠবে কি না বলা মুশকিল। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তাদের জীবনে বর্ণিল কোনো ঘটনা নেই। রঙিন কোনো কামনা-বাসনা নেই। জীবন শুধুই বিবর্ণ। তাদের পক্ষ থেকে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলামকে স্বাগত, অভিনন্দন। তিনি অন্তত তারা মিয়ার ঢাকা দর্শন সার্থক করেছেন।

তার কল্যাণেই আজ তারার কপালে জুটেছে তারকাখ্যাতি। যদি ধরেই নেয়া হয়, তিনি ভুল করে মামলায় তারা মিয়ার নাম দিয়েছেন। তাতে কী? কথায় আছে না, ‘ভুল তো মানুষই করে’। আর যদি ভুল হয়েও থাকে; তা হলেও তারা মিয়ার বর্ণহীন জীবনে এটি বর্ণিল ছটা হয়ে স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে যাবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এটি তার জীবনে সুমধুর সুরের মূর্ছনা। পঙ্গু তারা মিয়ার জীবনে এটি কম কী? মস্ত বড় অর্জন। এখন তিনি পরিচিত মুখ। এ জন্য কেউ যদি তাকে ঈর্ষা করেন, তাতে দোষের কিছু নেই। তারা মিয়ার তারকাখ্যাতিতে দেশের গরিবদের তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা স্বাভাবিক। তাদেরই একজন যে তারকা বনে গেছেন।

পুনশ্চ : তারা মিয়ার কপাল সত্যিই ভালো। ২৩ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের আগাম জামিন পেয়েছেন। তার মতো ‘গায়েবি’ মামলার হাজার হাজার আসামি এখনো আগাম জামিনের প্রহর গুনছেন। তারা সবাই গ্রেফতার এড়াতে বাড়িছাড়া, ফেরারি। তারা জানেন না, কী তাদের অপরাধ? এমন মামলার আসামিরা হাইকোর্টে আসছেন দলবেঁধে জামিনপ্রার্থী হয়ে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে চলে গায়েবি মামলার হিড়িক। প্রায় প্রতিটি মামলার বাদি পুলিশ। এর শিকার শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক অবস্থায় তারা মিয়ার শ্রেণিভুক্ত।
[email protected]


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme