১৯ আগস্ট ২০১৯

ভারত কি তার সেনা রাখতে চেয়েছিল?

ভারত কি তার সেনা রাখতে চেয়েছিল? - ছবি : সংগৃহীত

গত ১৫ জানুয়ারি নয়া দিগন্তে ‘প্রত্যাবর্তন ও মহাপ্রস্থান’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। লেখক বলেছেন, ‘স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুরের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে ১৩ মার্চ, ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতীয় স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিজ দেশ ভারতে ফেরত পাঠানো। এ দুঃসাধ্য সাধন করা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে দ্বিধা করেননি কিংবা সময় নেননি।’

ইতঃপূর্বে এ বিষয় কেউ কেউ টিভি টক-শোতেও বলেছেন তাদের বক্তব্য, ওই বছরের গোড়ার দিকে ঢাকা পৌঁছার আগে সৈন্য সরানোর জন্য দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সময়ের ব্যাপারে শেখ মুজিবের জিজ্ঞাসা কারো ভাষায়, শেখ সাহেবের ইচ্ছুক সময়ে ছিল এ ব্যাপারে সরানোর সম্মতি ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সংবাদ তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি; শুধু তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন আর জনসভার সংবাদ ছাড়া। এখন ভারত বাংলাদেশ থেকে ‘সেনা সরাতে চায়নি’ বলায় আমাদের হয়েছে দৃঢ় বিশ্বাস, যা অনুসন্ধানে তখনকার ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণই সহায়ক।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। পরদিন লন্ডনস্থ ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকায় ভাষ্যকার জন পিলজার মন্তব্য করেন, ‘ভারত তার সেনা বাংলাদেশে অগ্রসর করানোর ফলে সে দেশই প্রথম আক্রমণকারী বলে গণ্য হবে।’ এর উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘যদি কোনো দেশ আমাদের প্রথম আক্রমণকারী বলে, সেটাকে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ভুলিয়ে দেয়ার চাপ মনে করে, তবে সে দেশ বোকার স্বর্গে বাস করছে।’ (ভারত সরকার প্রকাশিত Bangladesh Documents, Vol-2, Page-224 থেকে উদ্ধৃতি)। যুদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় ৫ ডিসেম্বর ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড গঠনপূর্বক ‘মিত্র বাহিনী’ নাম গ্রহণ করা হয়। ৬ তারিখে ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পরদিন ভুটান স্বীকৃতি দেয় এবং ‘ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ঘোষণা করা হয়। ৮ তারিখে আফ্রিকার ঘানা স্বীকৃতি দেয়। ৯ তারিখে দিল্লিতে বাংলাদেশের কূটনীতিক মিশন খোলা হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরে ১৯৭২-এর ২৪ জানুয়ারি রাশিয়া, ২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্স এবং ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের পরের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ভেটো ক্ষমতাধর পাঁচটি রাষ্ট্রের মধ্যে চারটিরই দেয়া স্বীকৃতি বস্তুত আমাদের পৃথক দেশের স্বাধীন অবস্থান অনেকটাই সুদৃঢ় করেছিল। এর পাশাপাশি ইতোমধ্যেই পাওয়া ভারতীয় স্বীকৃতি এবং যৌথ বাহিনীরূপে এদেশে তাদের সেনা প্রবেশ সঙ্গত কারণেই প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত অবস্থান বোঝালেও, তা দখলদারিত্বের সমার্থক বলে সবাই মনে করেন না। পাকিস্তানের অংশস্বরূপ আমরা এর আগে ছিলাম জাতিসঙ্ঘের সদস্য, যা তিব্বত ছিল না। সেখানে চীন ১৯৫০ সালে সামরিক অভিযান চালিয়ে দখলদারি প্রতিষ্ঠার সামরিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১-এ ভারতের ভূমিকায় অনেকেরই আশঙ্কা পরে সত্য হয়নি।

স্বাধীনতা-উত্তর তীব্র সঙ্কটময় অবস্থা সম্বন্ধে সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তার 'A Legacy of blood' বই-এর ৮, ২০ ও ২৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে ২৫ লাখ টন খাদ্যের আশু প্রয়োজন।’ “নতুন দেশটি জন্মের আট মাসের মধ্যে ভেঙে পড়তে না দেয়ার কৃতিত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। জাতিসঙ্ঘের ঢাকাস্থ ত্রাণ কার্যক্রমের প্রতিষ্ঠান ‘আনরড’ উদ্ধার ও সাহায্য কর্মতৎপরতায় নজিরবিহীন সাফল্যের সাক্ষ্য রেখেছে। ২০টি দেশ তাদের প্রয়োজনীয় জনবল ও উপকরণসহ ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছে।” ‘দুইশত কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সাহায্য আসা সত্ত্বেও ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে দেশটি দেউলিয়া হয়ে যায়।’ দুর্ভিক্ষ শেষাবধি ঠেকানো যায়নি। লেখকের মতে এর কারণ- ‘দুর্নীতি, চোরাকারবার ও চাটুকারদের পরিবেষ্টনী।’ আর মুজিবের অনুশোচনাপূর্ণ কথায়, ‘চাটার দলের খেয়ে ফেলা।’

এককভাবে এ ধরনের সাহায্য আমাদের দেশকে করার মতো সামর্থ্য ভারতের ছিল না। দখলদারিত্বের অভিপ্রায় ছাড়া এমনটা আসলে কেউ করে না। আমাদের জন্য ভারতের একান্ত কাম্য যে, স্বাধীনতা তা পাকা-পোক্ত করতে পাকিস্তানের সাথে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানপূর্বক পাকিস্তানের স্বীকৃতি প্রদান এবং জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ পাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্যই ভারত এখানে সেনা রাখতে চাওয়ার কথা ছিল না; অর্থাৎ তার নিজের স্বার্থেই রাখত না ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী স্বদেশে নিয়ে রাখার পরেও।
ভারতীয় লে. জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব তার 'SURRENDER AT DACCA' বই-এর ১৫০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘পরেরদিন জেনারেল মানেক শ আমাকে ঢাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন, লুট হওয়ার জনশ্রুতির তদন্তের জন্য। ঢাকা গিয়ে কমান্ডার ও স্টাফদের কলকাতা ও দিল্লি পর্যন্ত এই জনরব পৌঁছানোর ব্যাপারে বলি। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। ফিরে এসে মানেক শকে জানাই, এ ধরনের কিছু না ঘটার নিশ্চয়তা আমাকে দেয়া হয়েছে।’ কিন্তু অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারকে সমর্থন করতে থাকি। যত দীর্ঘ দিন আমরা বাংলাদেশে থাকব, ততই আমাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ফিরে এসেছেন এবং আরো কিছু সময় ভারতীয় সেনা বাংলাদেশে রাখতে তিনি আগ্রহী। অবশেষে শিগগিরই সেনা প্রত্যাহারে তিনি সম্মত হলেন, যা ২৩ মার্চ ১৯৭২ বিদায়ী কুচকাওয়াজে শেষ হয়।

American Papers, pageXLVI - এ বলা হয়েছে যে, এটা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ না হলেও স্মরণ করা প্রয়োজন, পাকিস্তানকে চীনের দৃঢ় ও স্থির কূটনৈতিক সমর্থন একটা মূল কারণ; যা বাংলাদেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে ভারতকে পরিচালিত করেছে। ততদিন বাংলাদেশকে জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ পেতে নিরাপত্তা পরিষদে চীন ভেটো প্রদান বজায় রেখেছিল। এই ভেটোর কথা তখন বিশেষ করে বিবিসিতে প্রচারিত সংবাদে অনেকেই শুনে থাকবেন।


আরো সংবাদ




bedava internet