২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমিরাত ও বাহরাইন সিরিয়ায় দূতাবাস খুলছে কেন?

বিধ্বস্ত সিরিয়া - ফাইল ছবি

সাত বছর পর সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সিরিয়ায় তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলেছে। এর একদিন পর বাহরাইনও তাদের দূতাবাস পুনর্বার খুলে দিয়েছে। দু’দেশের দূতাবাস পুনরায় খুলে দেয়াকে বিশ্লেষকেরা সিরিয়ার ব্যাপারে উপসাগরীয় দুই দেশের নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেছেন। তারা এটাকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার এবং তার আরব প্রতিপক্ষের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নের একটি চিহ্ন বলে বর্ণনা করেন। দূতাবাস খোলার ঘোষণার পর আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাস এক টুইটার বার্তায় বলেন, পরবর্তী পর্যায়ে আরব উপস্থিতি এবং সিরিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশটিতে তুরস্ক ও ইরানের গভীর প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার কারণেই এই উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়ে।

বাহরাইনের কর্মকর্তারাও তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রায় একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গত ২৮ ডিসেম্বর তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সিরিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে, সেই সাথে তাদের নিজেদের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকাকে শক্তিশালী ও সক্রিয় করার লক্ষ্যে দূতাবাস পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অবশ্য এটা উপলব্ধি করার বিষয় যে, উভয় দেশের কর্মকর্তারা সিরিয়া সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কেন নিয়েছেন, সেটা ব্যাখ্যা করার একটি পথ তাদের বের করতে হবে। কারণ তারা সিরীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহীদের প্রতি কয়েক বছর ধরে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন এবং সিরিয়ার কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। যাই হোক না কেন, তারা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব হ্রাস করার জন্য তারা দূতাবাস পুনরায় খুলে দেয়ার প্রস্তাব দেন।

প্রথমত, এটা অত্যন্ত অভাবনীয় বা অসম্ভব ব্যাপার যে, দুটি উপসাগরীয় দেশ মনে করে- ইরানের মিত্রশক্তির সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তারা সিরিয়ায় ইরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবেন। যদি আল আসাদ নিজে ইরানের সাথে তার ঐতিহাসিক জোট ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তা হলেই কেবল এ ধরনের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু সিরীয় নেতা এ ধরনের কোনো তৎপরতা চালানোর বা উদ্যোগ নেয়ার কোনো লক্ষণ নেই। পক্ষান্তরে, সিরিয়ার সরকার বেশ কয়েকবার জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে, সরকারের আমন্ত্রণেই ইরানি সেনা এবং শিয়া মিলিশিয়ারা সিরিয়ায় রয়েছে।

অধিকন্তু যদি সিরিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া হয়, সেটা হবে আমিরাত ও বাহরাইনের অগ্রাধিকার। তারা ইরানপন্থী একটি সরকারকে বৈধতা ও সমর্থন দেয়নি। কারণ ইরানপন্থী সরকার তাদের নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। সিরিয়ায় সরকারবিরোধীরা আল আসাদ এবং তার ইরানি মিত্রশক্তি, উভয়কে তাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়।

দ্বিতীয়ত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং বাহরাইন সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে, সিরিয়ায় দূতাবাস খুললে ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব হ্রাস পেতে সাহায্য করবে। তারা কাতারে তাদের কূটনৈতিক মিশনের সাথেও ওই একই ধরনের আচরণ করেছেন। ২০১৭ সালের জুনে দু’দেশ দোহার সাথে এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন এবং উপসাগরীয় দেশটির ওপর অবরোধ আরোপ করে। ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগে এই অবরোধ আরোপ করা হয়। দেড় বছর পর সেখানে ইরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউএই বা বাহরাইন কেউ কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করেনি।

তৃতীয়ত, আমিরাত ইরানি প্রক্সিদের সাথে কাজ করতে অধিক ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এমনকি তাদের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়েছে তেহরান। আমিরাত নিজের স্বার্থেই এটা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়েমেনি বিপ্লবের শুরুতে আবুধাবি ইয়েমেনে হুতিদের সাথে কাজ করতে দ্বিধা করেনি। তারা দেশটির ইসলামপন্থীদের আল ইসলাম পার্টিকে হেয় করার জন্য হুতিদের সাথে কাজ করেছে। অধিকন্তু, আরব আমিরাত সত্যিকার অর্থে কখনো ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। তেহরান অব্যাহতভাবে আবুধাবির একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে থাকবে।
সুতরাং আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা কোনো ব্যবস্থা না নিলে আমিরাত এবং বাহরাইন সিরিয়ায় তাদের দূতাবাস পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সত্যিকার কারণ কী?

গণতন্ত্রবিরোধী একটি জোট
বাহরাইন প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি, সৌদি আরবের আগাম অনুমতি না নিয়ে এ ধরনের বড় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে না। সিরিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ গ্রহণের আগে হয়তো বাহরাইন রিয়াদের সাথে আলাপ করেছে।

সুতরাং এটা হতে পারে যে, এই দুটি দূতাবাস পুনরায় খোলার মাধ্যমে রিয়াদ দামেস্কের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। রিয়াদ সম্ভবত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান পর সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে বিপ্লবী শক্তির একটি প্রধান পাল্টা বা বিরোধী শক্তি হিসেবে সিরিয়ায় আবুধাবির সবসময় কৌশলগত দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর রোধ এবং ইসলামী দলের ক্ষমতায় আসা বন্ধ করতে আবুধাবি কাজ করছে। আল আসাদ এবং ইরান সিরিয়ায় যা চায়, তার সাথে আবুধাবির এই দুটি লক্ষ্যের মিল রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই লক্ষ্যগুলো উপলব্ধি করতে আরব আমিরাতের প্রয়োজন, সিরিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে আল আসাদের বিজয়। সিরিয়ার যুদ্ধ সঙ্ঘাতে আবুধাবি সরকারবিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা কখনো সরকারের প্রতি সমর্থন বন্ধ করেনি।

আসাদকে জয়লাভে সহায়তা
সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আল আসাদের মা আনিসা, বোন বুশরা ও তার ছেলেমেয়েসহ আসাদের ঘনিষ্ঠ অনেক আত্মীয়স্বজনের জন্য আমিরাত তার দরজা খোলা রাখে। এ ছাড়াও আসাদপন্থী বহু ব্যবসায়ী কোনো সমস্যা ছাড়াই আমিরাতে ব্যবসায় অব্যাহত রাখেন। এদের মধ্যে আসাদের চাচাত ভাই রামি মাখোফও ছিলেন। রামি সিরিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। কথিত আছে, তিনি দেশটির ৬০ শতাংশ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

২০১৪ সালে ইউএইভিত্তিক বহু ব্যক্তি ও কোম্পানি আল আসাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ সিরিয়া সরকারকে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহ করেন। সত্যিকার অর্থে, ইউএই দামেস্কের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করেনি এবং সিরিয়ার দূতাবাস আবুধাবিতে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তাই ইউএই দামেস্কে তাদের দূতাবাস পুনরায় খোলার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme