১৮ নভেম্বর ২০১৮

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদধ্বনি শোনা যায়

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদধ্বনি শোনা যায় - ছবি : নয়া দিগন্ত

খুব বেশি পুরনো কথা নয়; আমরা ঘরে এবং স্কুলে দৌড়ে গিয়ে ট্যাপকলে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতাম। এরপর আমরা উন্নতি করা শুরু করি এবং ট্যাপকলের পানিতে ভীত হয়ে পড়ি। আমাদের বলা হলো, ‘ট্যাপের পানি রোগ ছড়ায়।’ প্রথম দিকে ফুটানো পানির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এরপর চার দিকে মিনারেল ওয়াটারের নামে প্লাস্টিকের বোতলে ভরা পানি বিক্রয় হতে থাকে। বহু বছর পর্যন্ত আমরা ভেবেছিলাম, মিনারেল ওয়াটারের বোতলের পানি পাহাড়ি এলাকার ঝরনা থেকে আসে। কিন্তু পরে এক বন্ধু অজ্ঞতার এই অন্ধকার থেকে আমাদের বের হতে সহযোগিতা করেন। এ বন্ধু পাকিস্তান কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (পিসিএসআইআর) লাহোরে কর্মরত ছিলেন। একদিন তিনি আমাদের মিনারেল ওয়াটারের নামে পানির বোতল বিক্রয়কারী কোম্পানির উৎপাদনের আসল ব্যাপার সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, বোতলজাত পানি পাহাড়ি ঝরনা থেকে আসে না, বরং মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করা হয়।

এরপর তা শোধন করার পর বোতলে ভরে বিক্রয় করা হয়। পিসিএসআইআর এসব বোতলজাত পানির রাসায়নিক পরীক্ষা করলে কয়েকটি কোম্পানির পানি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। ধীরে ধীরে জানা যেতে থাকে, বোতলে বিক্রয় হওয়া পানি শুধু পাকিস্তান নয়, বরং অনেক দেশেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা প্লাস্টিকের বোতলে রাখার পর ওই পানি রোগ জীবাণু থেকে নিরাপদ রাখা বেশ কঠিন। প্লাস্টিকের খালি বোতল মানবজীবন ও পরিবেশের জন্য যে সমস্যা সৃষ্টি করে, তা নিয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। তবে কষ্টদায়ক বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিকের পান করার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র তার নাগরিকের এ মৌলিক অধিকার পূরণে ব্যর্থ। তাদের পানি কিনতে হচ্ছে। আর যে পানি কিনে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও রোগজীবাণু থেকে মুক্ত নয়। রাষ্ট্র দুর্বল, আর বেসরকারি সংস্থাগুলো শক্ত ও মজবুত। পাকিস্তানে প্রায় সময়ে আলোচনা হয়, রাষ্ট্রের বিপরীতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কে মজবুত করল?

বেসরকারি সংস্থা বলতে শুধু ওইসব সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীকে মনে করা হয়, যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। অথচ ওইসব বেসরকারি সংস্থার দিকে মনোযোগ দেয়া হয় না, যারা অত্যধিক নীরবতার সাথে, রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নিয়ে নিজেদেরই নাগরিকদের কাছে বিক্রি করে। সুপ্রিম কোর্ট ওইসব সংস্থা বা বড় বড় কোম্পানিকে প্রশ্ন করেন, আপনারা কার অনুমতিতে, কোন আইনের বলে কী পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে বোতলে ভরেছেন? নিজেরা কতটুকু লাভ করেছেন এবং রাষ্ট্রকে কী পরিমাণ ট্যাক্স দিয়েছেন? এভাবে প্রশ্ন তোলায় বলা হচ্ছে, পাকিস্তানে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সাহস ভেঙে দেয়া হচ্ছে; পাকিস্তান ও তার পাশের দেশগুলোতে মুক্ত বাণিজ্যের নামে বাণিজ্যকারী কয়েকটি বড় কোম্পানি স্বচ্ছ ব্যবসা করছে না। আর এভাবে তারা বিরাষ্ট্রীয় সত্তার (নন স্টেট অ্যাক্টর) রূপ নিচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় সত্তার চেয়ে বেশি মজবুত।

আমাদের ভোলা উচিত নয়, দক্ষিণ এশিয়াতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজ আমাদের আশপাশে বহু ইন্ডিয়া কোম্পানি নজরে পড়ছে। এরা কোথাও মাটি থেকে তেল উত্তোলন করছে, কোথাও কয়লা উত্তোলন করছে, কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, আবার কোথাও অস্ত্র বানাচ্ছে। ওষুধও তৈরি করা হচ্ছে, তবে এ ওষুধ সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে হাতের নাগালে পায় না। সড়ক ও সেতু বানানো হচ্ছে। তবে এ নির্মাণের উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। দরিদ্র মানুষদের জন্য লক্ষাধিক ঘর বানানোর প্রকল্প শুরু করা হচ্ছে। এ প্রকল্প স্থানীয় ঠিকাদারদের গুপ্ত শরিকানায় শুরু করা হবে, যারা আগে থেকেই দরিদ্রদের জমি দখল করে ধনীদের জন্য হাউজিং স্কিম বানানোর ব্যাপারে ‘বেশ প্রসিদ্ধ’। এভাবে পোর্টস অ্যান্ড শিপিং বিভাগেও বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় জেলেদের বেকার বানানোর কারণে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের অধিকার সংরক্ষিত করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সাহস কি জোগানো যায় না? বিদেশী কোম্পানিগুলো নিজেদের ফায়দার জন্য এখানে আসছে। তারা আমাদের জমি এবং আমাদের সম্পদ ব্যবহার করে মুনাফা করতে আসে। আমাদের রাষ্ট্র তার শ্রমিক-কৃষকের অধিকার সংরক্ষণ করা উচিত। আমাদেরই জমি থেকে উত্তোলিত পানি ন্যায্যমূল্যে ব্যবহার করার অধিকার কি আমাদের নেই? বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো আমাদেরই সম্পদ ব্যবহার করে আমাদের পরিবেশ দূষিত করছে। এটা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় যে, ওই সব কোম্পানিকে পরিবেশ দূষণে বাধা দেবে? এসব নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর নজরদারি করবে কে?

আধুনিক যুগের নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলোকে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বা ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিও বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের মাত্র ১০ শতাংশ বড় কোম্পানি বিশ্বব্যাপী ৮০ শতাংশ লভ্যাংশের অংশীদার। অ্যাপল, ওয়ালমার্ট ও শেলসহ বিশ্বের দশটি বড় করপোরেশনের মোট লাভ ১৮০টি দরিদ্র দেশের আয়ের চেয়েও বেশি। আর এ কারণে যখনই জাতিসঙ্ঘসহ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় ওইসব বড় কোম্পানিকে মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়, তখনই আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলো এর বিরোধিতা করে। চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে ১৯৭২ সালে জাতিসঙ্ঘে প্রথমবার বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি চিলিতে জাতীয়করণের নীতি শুরু করায় চিলির সেনাবাহিনী ও আদালত অসন্তুষ্ট হয়। তার বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। তিনি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে নিজেই নিজেকে গুলি করেন। তিনি যে কথা জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করেন, তার গুঞ্জন এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি।

জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে ২০১৪ সালে ইকুয়েডর ও দক্ষিণ আফ্রিকা যৌথ প্রস্তাব পেশ করেছিল, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে মানবাধিকারের বিরুদ্ধাচরণে বাধা দেয়া হোক এবং ১৯৪৮ সালের ‘মানবাধিকারের জন্য সর্বজনীন সনদ’ অনুসরণে বাধ্য করা হোক। এ ব্যাপারে পাকিস্তানে আইন প্রণয়ন জরুরি। পাকিস্তানে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা অনেক সহজ, তবে দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও ট্যাক্স চোর বড় বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করা বেশ কঠিন। যদি একজন রাজনীতিবিদের দুর্নীতি ক্ষমার অযোগ্য হয় এবং তার বিরুদ্ধে জেআইটি (জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম) গঠন করা যায়, তা হলে বিলিয়ন বিলিয়ন রুপির সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও ট্যাক্স চোর কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে জেআইটি কেন গঠন হবে না? আমাদের রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগ একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে থাকেন, একে অপরের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে সময় এসেছে, তারা পার্লামেন্টের ভেতর সবাই মিলে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন, যারা আমাদের মাটি থেকে আমাদের পানি তুলে আমাদের কাছে বিক্রয় করে; যারা আমাদের উপকূল আমাদের জেলেদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং যখন কেউ বলে, সবার আগে দেশের স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি দাও, তখন যারা তাকে ‘দেশের শত্র“’ আখ্যায়িত করে।

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৪ অক্টোবর, ২০১৮ সংখ্যা থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com


আরো সংবাদ

নির্বাচনী প্রার্থীদের নদী রার অঙ্গীকার মঙ্গলকর : তথ্যমন্ত্রী ধর্মহীন রাজনৈতিক দলের সাথে জোট করে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় : সৈয়দ রেজাউল করীম লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি : মহাসচিব রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ড. কামাল : হানিফ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বিচারিক ক্ষমতা ছাড়া সেনাবাহিনী মোতায়েনের সফলতা নিয়ে সংশয় মহাজোটে ভিড়ছে ভুঁইফোড় দল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন : ওবায়দুল কাদের আ’লীগ-বিএনপি উভয় দলেই একাধিক প্রার্থী আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে কোন্দল জামায়াত নীরবে চালাচ্ছে তৎপরতা বিভিন্ন স্থানে বিরোধী নেতাকর্মী গ্রেফতার অব্যাহত

সকল