১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

জাতি বিভাজনের অবসান কাম্য

ছবিটি প্রতীকী -

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র স্থান পেয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে জাতি হিসেবে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি। তবে একটি নেতিবাচক বিষয় হচ্ছে, এই জাতির মাঝে বিভাজন অথচ বিভক্ত জাতি অগ্রগতি হাসিল করতে পারে না। এই বিভাজনের অবসান না হলে জাতীয় অগ্রগতি ব্যাহত হবে। জাতিসত্তার পরিচয়কে কেন্দ্র করে আমাদের জাতির মাঝে বিভাজনের সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের পুরো জনগোষ্ঠী আজ প্রধানত দু’টি শিবিরে বিভক্ত। একটি ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদী, অন্যটি ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদী। এক দিকে ‘স্বাধীনতার সপক্ষ’; হওয়ার দাবিদার, অন্যদিকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’র ওয়ারিশ। একটি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি’, অন্যটি ‘বিপক্ষের শক্তি।’ এক দিকে ধর্মনিরপেক্ষতার সুবাদে ধর্মের (বিশেষজ্ঞ ইসলাম ধর্ম) বিরোধিতা, অন্য দিকে ধর্মের প্রতি অনুরাগের নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমারেখা অতিক্রম করা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষুদ্র একটি অংশ ছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেছিল। জামায়াত ইসলামী নেতাদেরসহ ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলা হয়ে থাকে। অপর দিকে, চীনপন্থী বামদল ও উগ্রপন্থী অনেককে মার্কসিস্টদের সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। অথচ তাদের নেতারাও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ছিলেন। ১৯৭১-এ কমরেড আবদুল হক, আবদুল মতিন, আলাউদ্দীন এবং মোহাম্মদ তোয়াহার সশস্ত্র দলগুলোর কর্মকাণ্ড ছিল আধিপত্যবাদ বিরোধিতার নামে মুজিবনগরের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে।

যশোর, নাটোর, বরিশাল ও নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সশস্ত্র ক্যাডারদের সাথে মুক্তিবাহিনীর বারবার সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে। চীনপন্থী একজন শীর্ষ বামপন্থী নেতা বর্তমানে সরকারের মন্ত্রী। তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়নি। সেদিন জনগণ সাহায্য-সহযোগিতা, প্রেরণা-উৎসাহ না দিলে সহস্র মুক্তিযোদ্ধা তো বটেই, বিশেষভাবে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ লড়তে পারতেন না।

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অজান্তে এবং তাদের আওতার বাইরে ভারত সরকারের একটি শক্তিশালী লবি ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পৃথক বাহিনী গঠন করেছিল। প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব এম আর আখতার মুকুল লিখেছেন, ‘মুজিব বাহিনী কোনো সময়েই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করেনি। রণাঙ্গনে ১১টা সেক্টরের কোথাও এরা সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে লড়াই পর্যন্ত করেনি। বরং মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর মধ্যে বারকয়েক লড়াই হয়েছে। ভারত সরকারের শিখ মেজর জেনারেল ওবানের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে পৃথকভাবে প্রায় ১৩ হাজার সদস্যের মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।... মুজিব বাহিনী গঠনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর প্রবাসী সরকার ভারত সরকারের এ ধরনের দ্বৈত ভূমিকার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দিয়েছিল, ‘দেখুন, সব ডিম কি এক ঝুড়িতে রাখতে আছে?’ ... মোদ্দা কথা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর সাথে মুজিবনগর সরকার ও মুক্তিবাহিনীর সম্পর্ক ছিল সঙ্ঘাতপূর্ণ এবং এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক সত্য।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ এপ্রিল ১৯৯৮)।

মাসুদুল হক তার রচিত, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং ‘সিআইএ’ (প্রথম প্রকাশ, পয়লা মে, ১৯৯০) বইটিতে লিখেছেন, ‘২৫ মার্চের পর শুধু যুদ্ধ প্রস্তুতিই নয়, যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য যাতে বজায় থাকে, সে পরিকল্পনা রচনার প্রস্তুতি নেয় ভারত সরকার এবং পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব অর্পিত হয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ওপর। ... বাংলাদেশ সরকারের অজ্ঞাতে তানদুয়ায় গড়ে তুলতে থাকে তার নিজস্ব বাহিনী, সে বাহিনীর নাম মুজিব বাহিনী। যা হোক, সেই বহুলালোচিত মুজিব বাহিনীর দুইজন শীর্ষ নেতা এখন প্রভাবশালী মন্ত্রী। এভাবে বিভাজনের বীজ মুক্তিযুদ্ধের সময় বপন করা হয়েছিল, যা আজ মহীরুহের আকার ধারণ করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের তাবৎ কর্মকাণ্ডে বিভাজন পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত পরিচয়ে আমরা ‘বাঙালি’। অপর দিকে, রাষ্ট্রীয় ও ভৌগোলিক পরিচয়ে ‘বাংলাদেশী’।

তা ছাড়া, একটি ধর্মীয় পরিচয়ও আছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চাকমা, মারমা, খাসিয়া, মুরং, সাঁওতাল, হাজং, গারো, টিপরা এবং আরো কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বাস করেছে। ভাষাগত কিংবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে তারা বাঙালি নয় এবং কোনোকালে ছিল না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (যিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনাকারী জাতীয় সংসদের একজন সদস্য ছিলেন) সংসদেই স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘আমি একজন চাকমা, বাঙালি নই।’ প্রতিবাদের নিদর্শনস্বরূপ লারমা ১৯৭২-এর সে সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। যারা বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বাস করেন, তারা অবশ্যই বাংলাদেশের অধিবাসী। যারা বাংলাদেশের অধিবাসী, তারাই ‘বাংলাদেশী’।

এম আর আখতার মুকুল লিখেছেন, ‘মোদ্দা কথায় বলতে গেলে, তখন কলকাতায় বাঙালি বর্ণহিন্দুদের মধ্যে একদিকে যেমন ইংরেজি শিক্ষার ধুম পড়ে গিয়েছিল, অন্য দিকে তেমনি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রদর্শিত পথে হিন্দু ধর্মীয় মৌলবাদের পুনরুত্থান শুরু হয়েছিল। এই শিক্ষিত বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় হিন্দুত্বের প্রলেপে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠার উত্তেজনায় উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী।’ (বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ, দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ ডিসেম্বর ১৯৯৮) মরহুম মুকুলের বক্তব্য অনুযায়ী এটাই প্রমাণিত হয়, শিক্ষিত বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় হিন্দুত্বের প্রলেপে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার উত্তেজনায় উন্মুখ হয়ে উঠেছিল।

একদিকে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল বা সমর্থকগোষ্ঠী, অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসী দল ও সমর্থকগোষ্ঠী। এ দেশে শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ এই দু’টি ঘরানায় বিভক্ত। ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ যে শিক্ষক সমাজ, তারাও নানা দলে বিভক্ত। ‘জাতির বিবেক’ বলে অভিহিত সাংবাদিকেরা জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন। তাদের সংগঠনও জাতীয় রাজনীতির ধারায় দু’টি শিবিরে বিভক্ত। মোট কথা, কিছু ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে জাতির মাঝে বিভেদ-বিভাজন লালন করে চলছে। মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, জাতির পিতা ও স্থপতি, স্বাধীনতার ঘোষণা আর স্বাধীনতার ‘মালিকানা’ নিয়ে বিতর্ক আজো শেষ হয়নি। জাতীয় নেতাদের নিয়ে আমরা বিভক্তির অজুহাত তৈরি করেছি।

মরণের পরে পার্থিব সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানুষ চলে যায়। তখন তার কোনো দল বা শ্রেণী থাকে না। অনেকের মনে তাই প্রশ্ন জাগে, আমরা বুদ্ধিজীবীদের জন্য পৃথক গোরস্থান করে কি মৃতদের মাঝেও বিভাজনের সৃষ্টি করছি না? আওয়ামী লীগের আপনজন ছিলেন না বলে সর্বস্তরের মানুষ ও শুভানুধ্যায়ীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. পিয়াস করিমের মৃতদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উন্মুক্ত জায়গায় রাখতে দেয়া হয়নি।

জাতি হিসেবে আমাদের এখন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। একে অপরকে দোষারোপ করে, জাতিকে বিভাজিত রেখে দেশের কল্যাণ ও অগ্রগতি কখনো সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত না করতেন, তাহলে হঠাৎ কারো ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতো না। আবার, কেউ না কেউ সে ঘোষণা না দিলে অস্ত্র নিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ ও আনসারেরা যুদ্ধে নামতে হয়তো উদ্বুদ্ধ হতো না। যার যা অবদান, তার স্বীকৃতি দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও এ কথা সত্য, জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তার নাম করেই। তিনিই ছিলেন সেদিনের বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা। একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি সৃষ্টি করতে অপারগ হলে আমাদের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত হবে। জাতির অগ্রগতির লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে অবিলম্বে বিভাজনের অবসান ঘটাতে হবে। কবি বলেন,
‘একটি লতা ছিঁড়তে পারো তোমরা সহজেই;
কিন্তু যদি দশটি লতা পাকিয়ে এনে দেই,
তারে ছিঁড়তে পারা নয়কো সহজ কাজ,
ছিঁড়তে তারে পাগলা হাতি হয়তো পাবে লাজ।’


আরো সংবাদ