১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সৌদি-মার্কিন উত্তেজনা ও জামাল খাসুগি

সৌদি-মার্কিন উত্তেজনা - ছবি : সংগ্রহ

ট্রাম্পের বিস্ফোরক মন্তব্য, বিন সালমানের জবাব এবং তুরস্কে সৌদি ভিন্নমতের সাংবাদিক জামাল খাসুগির রহস্যজনক অন্তর্ধানে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকান সমর্থন ছাড়া সৌদি রাজতন্ত্র দুই সপ্তাহও টিকতে পারবে না। অতএব সৌদি নিরাপত্তায় আমেরিকান এ সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিতে হবে রিয়াদের। এর জবাবে ৩৩ বছর বয়সী সৌদি ক্ষমতাধর প্রধান প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগেই সৌদি আরব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৌদি রাষ্ট্র নিরাপত্তার জন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। সৌদি আরব নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রশস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে টাকা দিয়েই কিনে। অতএব নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরব বাড়তি কানাকড়িও যুক্তরাষ্ট্রকে দেবে না।

ট্রাম্প-সালমান এই বাগ্যুদ্ধ যে স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, তা যেকোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের কাছে স্পষ্ট হবে। তাহলে কি এমন রহস্য এর পেছনে কাজ করছে, যাতে ট্রাম্প সৌদি বাদশাহর ক্ষমতা থাকা-না-থাকার ব্যাপারে এমন সংবেদনশীল একটি মন্তব্য করলেন। বেফাঁস কথা বলার বিষয়টিকে ট্রাম্পের জন্য অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয় বলে ধারণা করা হয়। তবুও সৌদি আরব নিয়ে তার মন্তব্য বেহিসাবি নাও হতে পারে। ট্রাম্পের উগ্র আমেরিকান জাতীয়তাবাদী নীতি নতুন কিছু নয়। তিনি আমেরিকান মিত্রদের নিরাপত্তার ছায়া দেয়ার জন্য এর আগেও বিভিন্ন দেশের কাছে অর্থ চেয়েছেন। এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটের মধ্যে বেশ অস্বস্তিও রয়েছে। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ থেকেও সমর্থনের বিপরীতে তিনি বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। এসব উপায়ের মধ্যে রয়েছে, প্রতিরক্ষাসামগ্রী ক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামোয় সৌদি বিনিয়োগ, সৌদি আরবে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়া প্রভৃতি।

এর বাইরে ট্রাম্প সম্ভবত আরো বেশি কিছু পেতে চাইছেন, যা দেয়ার মতো অবস্থা হয়তো সৌদি শাসকদের নেই। জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়া আর বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে বিপুল দামে অস্ত্র কিনে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা এবং ইয়েমেনে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালানোর কারণে সৌদি অর্থনীতি এক নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। অর্থসঙ্কট কাটাতে দেশটির শাসকরা এক দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে আমেরিকান চাহিদা মেটাতে অংশীদার হওয়ার জন্য, অন্য দিকে নিজ দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থকড়িতে হাত দিতে হয়েছে। এটি করতে গিয়ে রাজপরিবারের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও তাদের অর্থসম্পদের একটি অংশ দিতে বাধ্য করেছেন যুবরাজ বিন সালমান। এরপর আরো যুদ্ধ চালানো, অস্ত্র কেনা আর যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের সন্তুষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ সম্ভবত সালমান অ্যান্ড সন্সের কাছে নেই।

এ ছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র ইসরাইল সৌদি আরব ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে যে বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারে সহায়তা চেয়েছিলেন, তা সম্ভবত পাননি। বিশেষত, জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে ফিলিস্তিন ও জর্ডানকে সম্মত করতে সৌদি আরব সফল হয়নি। এসব কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বিন সালমানের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

এ ছাড়া, সৌদি আরবের আকাক্সক্ষা অনুসারে ইরানের সাথে পরমাণু নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বাতিল করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশের অভ্যন্তরে ও ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে তীব্র চাপে রয়েছেন। চুক্তি থেকে সরে আসার পর ইরানের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে গিয়ে পদে পদে বিপত্তির মুখে পড়ছে ট্রাম্প প্রশাসন। তুরস্ক ও ভারতের মতো মিত্রদেশ ইরানের তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা মানতে চাইছে না। এ ধরনের ঝুঁকি গ্রহণের বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের কাছ থেকে আরো বেশি কিছু পেতে চাইছে সম্ভবত।

সৌদি আরবের যুবরাজ বিন সালমান এই চাওয়ার জবাব যে ভাষায় দিয়েছেন সেটি বেশ লক্ষণীয়। এভাবে কথা বলার দু’টি কারণ থাকতে পারে এমবিএসের। প্রথমত, তার কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইম্পিচ করার যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা দ্রুত পরিণতি লাভ করতে পারে এমন কোনো তথ্য থাকতে পারে। সেটি হয়ে থাকলে সময় থাকতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটি দূরত্ব সৃষ্টি করা লাভজনক বিবেচিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিন সালমান বিশ্ব রাজনীতিতে উত্থানশীল পক্ষ রাশিয়া-চীনের সাথে একটি সম্পর্ক তৈরি করার পথে এগোতে চাইতে পারেন।

এর বাইরে তৃতীয় একটি কারণ থাকতে পারে যে, সৌদি শাসন পরিবর্তনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যে এজেন্ডা ছিল, সেটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সালমান প্রশাসনের শুধু সৌদি আরবের জনগণের মধ্যে সমর্থন ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে, তাই নয়। সেই সাথে সৌদি রাজপরিবারের বড় অংশ শাসন পরিবর্তন চাইছে। বিন সালমান অনূর্ধ্ব চল্লিশের এক গ্রুপ তৈরি করে সৌদি প্রশাসনকে কব্জা করে রেখেছেন। এটিকে সিনিয়ররা কোনোভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না।

বিন সালমানের এসব পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচক হাতেগোনা যে ক’জন ছিলেন, তাদের একজন ছিলেন বিখ্যাত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসুগি। তিনি আল আরব টেলিভিশনসহ একাধিক গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সৌদি রাজপরিবারের বেশ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। সৌদি শাসকরা ইসলামপন্থীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে আধুনিক হওয়ার যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তার সমালোচক ছিলেন খাসুগি।

২০১৭ সালে তিনি শাসকদের নিপীড়নের মুখে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি আরব ত্যাগ করেন। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন। এই কলামে বিন সালমানের নীতির কট্টর সমালোচনা থাকত। জামাল খাসুগি এক তুর্কি রমণীকে বিয়ে করতে কিছু কাগজের জন্য আঙ্কারার সৌদি কন্স্যুলেটে ঢোকার পর আর বের হয়ে আসেননি। তুর্কি মিডিয়ায় বলা হচ্ছে, কন্স্যুলেটের ভেতরে রিয়াদ থেকে নিয়ে আসা ঘাতকদের দিয়ে জামাল খাসুগিকে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়টির উপর ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখার কথা বলেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান। এ নিয়ে সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সৃষ্ট পরিস্থিতি সৌদি আরবের ক্ষমতার বলয়ে নতুন কোনো মেরুকরণের ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

সৌদি সূত্রগুলো বলছিল, সৌদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শত বছরের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরো ৩০ বছরের জন্য নতুন একটি সমঝোতায় পৌঁছায় সৌদি রাজপরিবার। কারো কারো মতো এ সময় আসলে ১০ বছর। সৌদি-মার্কিন গোপন সমঝোতা যে সময়ের জন্যই হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে দুই দেশের সম্পর্কে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তাতে সংশয় নেই। জামাল খাসুগির ঘটনায় এই ঝড়ো হাওয়ার সাথে তুরস্কও সম্ভবত জড়িয়ে পড়ছে।


আরো সংবাদ




Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme