১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

গণতন্ত্রের মুক্তি মিলছে না ক্যামেরুনে

আরো এক মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট পল বাইয়া - ছবি : এএফপি

আরো একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ক্যামেরুনে। মধ্য আফ্রিকার দেশটি এবারো বের হতে পারল না বর্জন, সহিংসতা আর একচেটিয়া নির্বাচনের ধারা থেকে। গত রোবাবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল আসতে দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে নির্বাচনে যে আরো এক মেয়াদের জন্য বিজয়ী হতে চলেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল বাইয়া সেটি অনেকটাই নিশ্চিত। এটি হবে তার সপ্তম মেয়াদ। ৩৬ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা প্রেসিডেন্ট বাইয়া অনেকের কাছেই নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের রোল মডেল।

আফ্রিকা মহাদেশের আরো অনেক দেশের মতোই সমস্যা আর অস্থিরতায় জর্জরিত ক্যামেরুন। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সঙ্কট রাজনৈতিক। বিশেষ করে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চলের মধ্যে বিরোধ বহু বছরের পুরনো। যথারীতি এবারের নির্বাচনও বয়কট করেছে ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলের নাগরিকরা। নির্বাচন বানচালের হুমকিও দিয়েছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্রগোষ্ঠী। এমনকি নিরাপত্তার কারণে একাধিক সমাবেশও স্থগিত করতে হয়েছে প্রেসিডেন্ট বাইয়াকে। ভোটের দিনও সংঘর্ষ হয়েছে। সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে অন্তত দুইজন। বেশ কয়েকটি শহরে ভোটকেন্দ্রে গোলযোগ হয়েছে। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকরাও ভোট বর্জন করেছেন।

মূলত ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই দেশটিতে এই বিরোধের সূত্রপাত। ক্যামেরুনের কিছু অংশ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ, আর কিছু অংশ ছিল ফরাসি উপনিবেশ। ১৯১৬ সালে দেশটি থেকে জার্মান সেনাদের তাড়িয়ে দখল নেয় ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনারা। এর তিন বছর পর দেশটি ভাগ হয়ে যায় ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যে। ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড যায় ফরাসিদের দখলে, বাকি ২০ শতাংশ শাসন করে ব্রিটিশরা। সেখান থেকেই মূলত দেশটির জনগোষ্ঠী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা আজো রয়ে গেছে।

সংখ্যায় বেশি হওয়ার কারণে ফরাসি ভাষাভাষীদের হাতেই দেশটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বহুদিন ধরে। সবসময় তাদের হাতে বৈষম্য আর নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছে ইংরেজি ভাষাভাষীরা। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় নির্যাতন নিপীড়নেরও শিকার হতে হয়েছে তাদের। ২০১৬ সালে ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলের স্কুলগুলোতে ফরাসি ভাষা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নেয় জাতিগত আন্দোলনে। সেই আন্দোলন থেকেই দক্ষিণাঞ্চলীয় ইংরেজি ভাষাভাষীদের কিছু অঞ্চল নিয়ে ঘোষণা দেয়া হয় স্বাধীনতার। ‘অ্যামবাজোনিয়া’ নামের সেই নতুন রাষ্ট্রটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পায়নি। সেই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছে প্রেসিডেন্ট পল বাইয়ার প্রশাসন। কয়েক শ’ লোক নিহত হয়েছে স্বাধীনতাপন্থী সশস্ত্র যোদ্ধাদের সাথে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে।

বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট বাইয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেন ১৯৮২ সালে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরই তিনি ক্রমেই হয়ে ওঠেন স্বৈরশাসক। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এক মেয়াদে (১৯৭৫-৮২)। একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচনে জিতে ক্রমেই শক্ত করেছেন নিজের অবস্থান। বাইয়ার জনসমর্থন রয়েছে এটা ঠিক; কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ক্রমেই হয়ে উঠেছেন স্বৈরশাসক। প্রথম দিকে যারা তার বিরোধিতা করেছেন তাদেরও অনেকে ধীরে ধীরে বাইয়ার দলে ভিড়েছেন তাকে হটানোর উপায় না পেয়ে।

এবারের নির্বাচনে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না বাইয়াকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো। অবশ্য দীর্ঘ প্রায় চার দশকের শাসনে সেটি হতেও দেননি বাইয়া। এবারের নির্বাচনে বাইয়ার প্রধান বিরোধীরা অনেকটাই বিভক্ত ছিল। তাই জয়ের পাল্লা বাইয়ার দিকেই ভারী। অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যেও যেন বাইয়াকে হারানোর চেয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেশি ছিল। তাদের দৃষ্টি ভবিষ্যতের দিকে। বাইয়াকে সরানো সম্ভব নয় সেটি তারা বুঝতে পেরেছেন, তাই বাইয়া পরবর্তী যুগের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন এই নেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ইয়োনাতান এল মোরস ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, এবারের নির্বাচনে এমন কয়েকজন প্রার্থী আছেন যাদের মূল টার্গেট ২০১৮ নয়, ২০২৫ সালের নির্বাচন।

এই বিশ্লেষকের মতে, ২০২৫ সালে বাইয়ার বয়স হবে ৯২ বছর, তখন হয়তো তিনি কোন উত্তরসূরির হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চাইবেন, আর সেই পথ পরিষ্কার করতে এবারের নির্বাচনে এসব প্রার্থী নিজেদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরতে চান। যদিও সাত বছর পরেও বাইয়া ক্ষমতার লোভ ছাড়তে চাইবেন কি না সেটি কে বলতে পারে। আফ্রিকারই আরেক দেশ জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে ৯৩ বছর বয়সে এসে স্বেচ্ছায় নয়, সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

৮৫ বছর বয়সী বাইয়ার ব্যাপারে অনেক ভোটারেরও বিরক্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন- তার দেশ শাসনের মতো শারীরিক সামর্থ্য নেই। বছরের বড় একটি অংশ তিনি ব্যক্তিগত সফরে বিদেশে কাটান। ভোটের কয়েক দিন আগে ইব্রাহিম সাদিকি নামে রাজধানীর এক ভোটার বিবিসিকে বলেন, ‘বুড়ো লোকটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার এখন উচিত কোনো গ্রামে নিরিবিলি পরিবেশে বসবাস করা, নাতি-নাতনীদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটান।’

রিপাবলিক অব ক্যামেরুন
রাজধানী: ইয়াউন্ডে
স্বাধীনতা অর্জন: ১৯৬০
রাষ্ট্রভাষা: ইংরেজি ও ফরাসি
আয়তন: চার লাখ ৭৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা : দুই কোটি ৪৪ লাখ
প্রেসিডেন্ট: পল বাইয়া
প্রধানমন্ত্রী: ফিলেমন ইয়াং
পার্লামেন্ট : দুই কক্ষ বিশিষ্ট
ধর্ম: ৭০ শতাংশ খ্রিষ্টান, ১৮ শতাংশ মুসলিম
শিক্ষার হার : ৭১ শতাংশ


আরো সংবাদ