১৬ অক্টোবর ২০১৮

আ’লীগ ও বিএনপি ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী

আ’লীগ ও বিএনপি ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী - ছবি : সংগ্রহ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শুধু সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী। ’৯০-এর দশকের শেষভাগে এসে জাতীয় পার্টি ওই অবস্থান হারিয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে শুধু পঙ্গু করে রেখেছে তা নয়, হুইলচেয়ার সাথে দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ এরশাদকে আওয়ামী লীগ যেদিকে নিয়ে যাবে, সেদিকেই যাওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। যদি কোনো দিন সুস্থ হওয়ার সুযোগ আসে, সেটি ভিন্ন। আর সুযোগ এলেই পুরনো যৌবন ফিরে পাওয়ার কথা নয়।

যেহেতু আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির লড়াই, সেহেতু একে অন্যকে ঘায়েল করে রাখার চেষ্টা করা স্বাভাবিক বিষয়। যদিও আমাদের দেশের রাজনৈতিক ঘায়েল পদ্ধতিতে রয়েছে প্রতিহিংসা। অর্থাৎ আদর্শকে আদর্শ দিয়ে নয় বরং জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমেই ঘায়েল করা হয়; যা সভ্যতার রাজনীতির সূত্রে পড়ে না। কিন্তু কিছুই করার নেই- পরিবেশ এমনই। বৈশ্বিক বিশ্বে বিশ্বাসী হলেও আমরা উন্নত দেশের রাজনীতির নীতি অবলম্বন করতে ইচ্ছুক নই। যার কারণ ক্ষমতার লালসা। আমাদের ক্ষমতার লালসা এমনভাবে গ্রাস করেছে, যা প্রতিহিংসার দিকে ধাবিত করছে। শুধু যে আমাদের দেশে এমনটি হচ্ছে তা নয়; বর্তমান সময়ে মিসর, সিরিয়াসহ বহু দেশে একই পরিস্থিতি।

মূল কথায় ফিরে আসা যাক। আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও আদৌ হবে কি না, জনমনে সন্দেহ রয়েছে। সরকার চাচ্ছে, নিজেদের অধীনে নির্বাচন দিতে আর বিএনপি তথা বিরোধী দল চাচ্ছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। বিরোধী দল বলতে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল বুঝিয়েছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাবেক বড় মাপের রাজনীতিবিদেরা মিলে নতুন জোট করছেন, সেখানে বিএনপিকে নানান শর্ত মেনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিএনপি সেই জোটে গেলেও নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই, আর না গেলেও পড়বে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বিএনপির দাবিকেই তাদের দাবি বলছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি কোন অবস্থানে আছে, আগেই বলে রেখেছি।

আওয়ামী লীগ কয়েক বছর ধরে ডিজিটাল ও উন্নয়নের জোয়ারের স্লোগান তুলেছে। আকর্ষণীয় ওই স্লোগানের পর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ারই কথা ছিল। কিন্তু তারা সেই সাহস করতে পারছে না। অপর দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট তেমন আন্দোলন করতে পারছে না- যার ফলে আওয়ামী লীগকে বাধ্য হয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ চাইবে বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে। কারণ, দেশে কেবল বিএনপি তাদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী।

বিএনপির ভোটের মাঠে জামায়াত অতিরিক্ত শক্তি, তা স্পষ্ট। অতিরিক্ত শক্তি হলেও আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। যেহেতু আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি, সেহেতু বিএনপির শক্তি কমানোর চেষ্টা আওয়ামী লীগ করবেই। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ বছর ধরে জামায়াতের ওপর চলছে নির্যাতনের স্টিমরোলার। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে পল্লীর কর্মী, কেউই এ নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়নি। ঘরছাড়া হতে হয়েছে, নিদ্রাহীন থাকতে হয়েছে, জেল-জুলুম, গুম-খুন সব রকম জুলুমের শিকার হতে হয়েছে বা হচ্ছে।

তাদের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা কোনো অফিসই তালা মারার বাকি নেই। জামায়াতকে নির্যাতন করেও যখন দমানো গেল না, তখনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলো। যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল, সেই মামলায় জামিন হলেও সাবেক রাষ্ট্রপতির স্ত্রী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে অন্যান্য মামলা দিয়ে আটক রাখা হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে গায়েবি মামলা। এসব মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছেন, বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মৃত ব্যক্তিদের নামে মামলা হচ্ছে, হজে থাকা ব্যক্তিদের নামে মামলা হচ্ছে।

ক্ষমতার রাজনীতি মারাত্মক ব্যাধি। দেশ ও জাতির কল্যাণে রাজনীতি করার দর্পণই কেবল সুন্দর পরিবেশ ও উন্নত রাষ্ট্র উপহার দিতে পারে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন আসল উন্নয়ন নয়, নৈতিকতা ও আদর্শিক উন্নয়নই আসল উন্নয়ন। বিগত ১০ বছর আওয়ামী লীগ যদি দেশের জন্য ভালো কিছু করে থাকে, দেশের মানুষ অবশ্যই তাদের মূল্যায়ন করবে। সরকারের উচিত দেশ ও জনগণের স্বার্থে মানসিকতার পরিবর্তন করা। সংবিধানের দোহাই দিয়ে অযথা দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ভালো নয়। সংবিধান ধর্মীয় কোনো কিতাব নয় যে, পরিবর্তন করা যাবে না? জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনে সংবিধান পুনর্গঠন করে দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার বেলায় সহায়তা করতে আদর্শিক রাজনীতির পরিচয় দেয়ার সময় এসেছে। বোঝা উচিত, ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করা আর সংবিধানের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা আগলে রাখা এক নয়।


আরো সংবাদ