১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

পেনশনার ও শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের প্রতি

প্রতীকী ছবি - সংগৃহীত

উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকার জনকল্যাণে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, সংস্কার ও পুনর্গঠনে প্রতিনিয়ত বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলছে। আর্থসামাজিক সূচক ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। ইতোমধ্যে সরকার অন্যান্য কল্যাণমুখী সেবার পাশাপাশি মহিলা ভাতা, বৈশাখী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, উপবৃত্তি ইত্যাদি আর্থিক সহায়তা সুবিধা দিয়ে সমাজসেবা করে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যান্ডেট অনুযায়ী ইএফটির মাধ্যমে গ্রাহকের শাখায় সঞ্চয় পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা পাঠাচ্ছে, গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সেবার জন্য সুবিধা ভোগ করে প্রশংসা করছে। তবে সঞ্চয়পত্রের ওপর উৎসকর কর্তনের প্রত্যয়নপত্রের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে হয় ও আবেদন করতে হয়, যা প্রবীণ অবসরভোগীদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের ম্যান্ডেট করা ব্যাংক শাখায় বার্ষিক কর প্রত্যয়নপত্র পাঠানো বা গ্রাহকের শাখায় কর কর্তন করা টাকার প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে সেবা সম্প্রসারণ করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জামানত বন্ধক ছাড়া ঋণ দেয় না।

ব্যাংকঋণ মঞ্জুরির জন্য গ্রহণযোগ্য জামানত প্রয়োজন হয়। সঞ্চয়পত্র লিয়েন বা বন্ধক রাখা বন্ধ রয়েছে। তবে শুধু অবসরভোগী পেনশনার, যাদের পেনশনার সঞ্চয়পত্রের (শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য, নির্দিষ্ট অঙ্কের সীমায় ক্রয়যোগ্য পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্প) আয়ে সংসার চলে তাদের ক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে প্রাপ্তব্য মাসিক মুনাফা হতে সমন্বয় বা পরিশোধযোগ্য বিবেচনায় এনে লিয়েন সুবিধা দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহনির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবেলায় ঋণ সম্প্রসারণ বা মঞ্জুর করার বিষয়টি মানবিক বিবেচনার দাবি রাখে। সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- বাংলাদেশ ব্যাংক সমাজের এ অংশটির জন্য ঋণ ব্যবস্থা সহজীকরণসহ সহজ নীতি প্রণয়ন করে সামাজিকসেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিতে পারে।

চিকিৎসা ভাতা চাকরিরতদের মতো মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা হারে অবসরভোগীদের জন্যও নির্ধারিত, ৬৫ বছর থেকে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা ভাতা গ্রেড নির্বিশেষে অবসরভোগী পেনশনার, আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী ও শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হচ্ছে। পূর্বের চাকরিকাল ৫৭ বছর, যা বর্তমানে অবসর বয়স ৫৯ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ বয়সে রোগবালাই কমবেশি সবাই ভোগে আর পরিবারের কথা আমলে না নিলেও চিকিৎসা ভাতা ব্যয়বহুল বিবেচনায় আনলে ভাতা পুনর্বিন্যাস করে নির্ধারণ প্রয়োজন রয়েছে। চাকরিকালে এক হাজার ৫০০ টাকা, চাকরি শেষে অবসরে ৬৪ বছর পর্যন্ত তিন হাজার টাকা এবং ৬৪ ঊর্র্ধ্ব বয়সীদের পাঁচ হাজার টাকার অধিক পর্যন্ত যুক্তিযুক্ত চিকিৎসা সুবিধা দেয়া দরকার। আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে তারা চিকিৎসাসেবা কিভাবে নেবেন। বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে, তাই বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। তাৎক্ষণিকভাবে জটিল চিকিৎসার প্রয়োজনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ তহবিল থেকে এককালীন সাহায্য সেবার বিষয়টিও বিবেচনায় আনার জন্য নির্দেশিত হতে পারে। অর্থব্যয় ছাড়া প্রশাসনিকভাবে প্রবীণদের জন্য সেবার পরিধি বাড়ানো যায়, রেল, স্টিমার, বাসগুলোতে টিকিট পাওয়া সহজ করার জন্য পৃথক কাউন্টারের কার্যকর ব্যবস্থা ও মানবিক মনোযোগ প্রবীণদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো থেকে রেহাই দেবে। হাসপাতালগুলোতে পৃথক সিটের ব্যবস্থা হলে চিকিৎসাসেবা পেতে সহজ হবে।

সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পে নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। পেনশনার, তিন মাস অন্তর মুনাফা, পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ-নিরাপত্তা, সরকারের বিনিয়োগ প্রকল্প, মেয়াদ বিবেচনায় সুদ হার অপরিবর্তিত রেখে আগ্রহীদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়া দরকার। যারা পেনশন বিক্রয় করে অন্য কোনো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে বেশি লাভের আশায় পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে মেয়াদ পূর্তির পর তাদের একই সুদহারে আবার নবায়ন সুবিধা দেয়াসহ মুনাফা আয় থেকে কর কর্তন না করে আগের মতো করমুক্ত রাখা। কারণ, তাদের জীবিকার শেষ আশ্রয়স্থল সরকারের এই বিনিয়োগ প্রকল্প। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, পেনশন আয় করমুক্ত তাই যুক্তিযুক্তভাবে এই স্কিমের মুনাফা থেকে অকল্যাণকর ও অমানবিকভাবে কর কর্তন রহিত করা দরকার।

যেসব কর্মচারী প্রয়োজনে পেনশন পুরো বিক্রি করে দিয়ে কোনোক্রমে ক্লায়কেশে অর্থাভাবে জীবন ধারণ করে আসছেন, অবসরের পর নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে অর্থাৎ ৬৫ বছর থেকে ঊর্ধ্বে বয়সীদের পুনরায় পেনশনে ফিরিয়ে আনা দরকার। মুদ্রাস্ফীতি, উপার্জনহীনতা, বাজারমূল্য বিবেচনায় তাদের কল্যাণে সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা হেতু সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারিত করে তাদের প্রতি ফিরে তাকানো প্রয়োজন।

২০০৯, ২০০৫ ও আগের বেতন স্কেলগুলো থেকে যারা অবসরে আছেন, তাদের পেনশন বর্তমান চলমান ২০১৫ স্কেলের তুলনায় অনেক কম। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বেতন বা পেনশন বেড়েছে ৪০-৫০ শতাংশ। আগে যে গ্রেড থেকে একজন কর্মচারী অবসরে যান, বর্তমান ২০১৫ সালের বেতন স্কেলের অনুরূপ একই গ্রেড বা স্কেলে বেতন নির্ধারণপূর্বক পেনশন আবার নির্ধারণ জরুরি। অবসরভোগীদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বয়স-দায়িত্ব-সচেতনতা বিবেচনায় তারা অসংগঠিত রয়েছেন। গড় আয়ু বাড়ায় তারা আরো বিপাকে। কারণ, বেশি বয়সে জীবন ধারনের জীবিকা কোথায় পাবেন, মাথাপিছু গড় আয় বাড়ায় তাদের আরো বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। উপার্জন তো তাদের আর বাড়ছে না। তাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে এবং অর্থ ও অর্থতুল্য সেবা পাওয়ায় সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের মানবিক দৃঢ়তার প্রতি কেন্দ্রীভূত থাকে। অর্থমন্ত্রণালয়, আইন, সমাজকল্যাণ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে অবসরভোগীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে আলোচিত বিষয়ে সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণে বাস্তবভিত্তিক আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবসরে যারা আছেনÑ যারা যাচ্ছেন ও ভবিষ্যতে যারা যাবেন, তারা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। পারিবারিক সামাজিকভাবে নিজ মর্যাদায় সুন্দরভাবে জীবনযাপন করবেন এ প্রত্যাশা সব অবসরভোগী ও পেনশনারের।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড
[email protected]


আরো সংবাদ