১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

আঙ্কারা-বার্লিন সম্পর্ক কোন পথে

আঙ্কারা-বার্লিন সম্পর্ক কোন পথে - ছবি : সংগৃহীত

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সম্প্রতি বার্লিন সফর করেছেন। তুরস্কের ইইউ সদস্যপদ লাভের বিরুদ্ধে জার্মানির তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এরদোগান তার অবস্থান ও নীতিতে অটল থেকেই এই সফর করেছেন।

ঠাণ্ডা যুদ্ধকালীন তথা স্নায়ুযুদ্ধ যুগে তুরস্ক কয়েকটি সুযোগ হাতছাড়া করেছে। তখন যে ব্লকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং ইউরোপের আকার ছোট থাকার কারণে তুরস্কের ইইউতে প্রবেশের সুযোগ ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। অবশ্য এর পরিবর্তে তুরস্ক ন্যাটো জোটে প্রবেশ করে। এই জোট সবার জন্য ভালোভাবে কাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলবৎ থাকা থেকে শুরু করে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোর পরেও ন্যাটো কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। মাঝে মাঝে তুরস্ক ন্যাটো থেকে যা অর্জন করেছে তার চেয়ে ও বৃহত্তর ঝুঁকি নিয়ে ন্যাটো জোটের জন্য কাজ করেছে। যাই হোক না কেন, ন্যাটোর নিরাপত্তা ছাড়া তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ইউরোপের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই জোট অবদান রেখে চলেছে।

ইইউ-তুরস্ক : একত্রে কাজ করছে
ইউরোপীয় ক্লাবে যোগদানের ব্যাপারে তুরস্ক ও ইইউর মধ্যে সদস্যপদ সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে ভবিষ্যতেও কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসার আশা তেমন একটা নেই। তুরস্ক ও ইউরোপের মধ্যে মাইগ্রেশন সঙ্কটই হচ্ছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরীক্ষা। তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভোতোগ্লুর সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার অভাবনীয় সহযোগিতার কারণে ইউরোপে শরণার্থী প্রবাহের অবসান ঘটে। তখন ইইউর নেতৃত্ব দিয়েছে জার্মানি। ইইউ ও তুরস্কের মধ্যকার শরণার্থীবিষয়ক চুক্তি এখনো বৈধ এবং তা কার্যকর রয়েছে। অবশ্য চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক ভিসা উদারীকরণ তথা ভিসা সহজীকরণসহ যেসব সুযোগ পাবে বলে আশা করেছিল তার সব পায়নি। তবুও চুক্তির মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয়েছে, উভয়পক্ষ ইচ্ছা করলে এবং একত্রে কাজ করতে পারলে অভিন্ন লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে সক্ষম হবে। ওই অঞ্চলে এখনো তাদের বহু অভিন্ন এজেন্ডা রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকান স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার আগ্রাসী নীতি যেটাকে তিনি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায়ও তুলে ধরেছেন- সেটার ওপর দৃঢ় থাকার কারণে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর সাথে আমেরিকার দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে।

ট্রাম্পের এই নীতির কারণে তুরস্ক ও জার্মানি আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ ইরানের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য অব্যাহত রাখার জন্য বিকল্প পথ খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে ইইউ তুরস্কের সাথে সুর মিলিয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলার বর্জন করে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন বেশ কিছু দিন ধরে।
ইইউতে-তুরস্কের সদস্যপদ লাভের আলোচনা যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন আটলান্টিকের উভয় পারের দেশগুলোর প্রভাব তুরস্কের পক্ষে যায়। আমেরিকা যে বহুমুখী নীতির ভিত্তিতে ওয়ার্ল্ড অর্ডার নির্ধারণ করে তা তুরস্কের পক্ষে যায়। কিন্তু বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন তার সব কিছুকে শেষ করে দিয়েছে এবং এই নীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান গত শুক্রবার জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টিনমিয়ারের আমন্ত্রণে জার্মানিতে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। বার্লিন ও আঙ্কারার মধ্যে দীর্ঘ দিনের দ্বিপক্ষীয় বৈরিতার পর এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। তুর্কি বংশোদ্ভূত ৩০ লাখ জার্মান নাগরিক জার্মানিতে বসবাস করেন। জার্মানি তুরস্কের জন্য পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো কিছু বিবেচনা করে না এবং তুরস্কও একইভাবে জার্মানির স্বার্থ দেখে না। জার্মানি তুর্কির গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে মানসম্মত নয় বলে সমালোচনা করে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জার্মানি জার্মানিভিত্তিক তুরস্কের ভোটারদের উদ্দেশে এরদোগানকে বক্তব্য রাখতে দেয়নি- এমনকি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তৃতা দেয়ারও অনুমতি দেয়নি।

তুরস্কের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্ক পুনস্থাপিত হচ্ছে। এরদোগানের জার্মানি সফরের আগে জার্মান চ্যাঞ্জেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেলের মুখপাত্র সৌজন্যমূলক বিবৃতি প্রকাশ করে। অপর দিকে শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে জার্মান সংবাদপত্র ফাজ-এ এরদোগান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে নিবন্ধ লেখে। গত শুক্রবার মার্কেল-এরদোগান আলোচনা হয় এবং পরদিন মার্কেল এরদোগানের জন্য ব্রেকফাস্টের আয়োজন করেন।

এটা একটা বিরল ঘটনা। জার্মানির কোয়ালিশন সরকার তুরস্কের বিরুদ্ধে আর এগোতে পারবে কি না বা কিভাবে বিরোধিতা করবে এটা একটা প্রশ্ন। তুরস্ক জার্মানির ব্যাপারে এখন নমনীয়তা দেখাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তুরস্ক জার্মান সাংবাদিক ডেনিজ ইয়াসেলকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছে আগে। গত ফেব্রুয়ারিতে তুর্কি প্রধানমন্ত্রীর জার্মান সফরের আগেই তাকে মুক্তি দেয়া হয়। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গোলযোগের কারণে তুরস্কের অর্থনীতি এখন খুব বেশি শক্তিশালী নয়। তার পরও তুরস্কের অর্থনীতি ইউরোপীয় স্বার্থে বিশেষভাবে জার্মানির পক্ষে কাজ করেছে।

২০১৭ সালে জার্মানি ছিল তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক। ২১ বিলিয়ন ডলার ওই সময়ে দেশটি আমদানি করেছিল। তুরস্কের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে যথারীতি তার প্রভাব জার্মান অর্থনীতির ওপরও পড়বে। জার্মান জনগণের জন্য মাইগ্রেশন সবসময় একটা উত্তেজনাকর ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থীর ঢল আসা নিয়ন্ত্রণ করার কারিগর হচ্ছেন এরদোগান। সম্প্রতি সিরিয়ার ইদলিবের ব্যাপারে তুরস্ক-রাশিয়া চুক্তির মাধ্যমে সেখানে গণহত্যা বন্ধে এরদোগান সফল ভূমিকা পালন করেছেন। নিঃসন্দেহে এটার কৃতিত্ব এরদোগানের।

ইইউতে তুরস্কের সদস্যপদের আলোচনা আঙ্কারা ও বার্লিনের মধ্যকার বিতর্কের প্রধান পয়েন্ট হলেও সেটা এখন অগ্রাধিকার ইস্যু নয়। জার্মানি বুঝতে পেরেছে তুরস্ক কেবল সদস্যপদপ্রার্থী নয় বরং দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়। তুরস্কের সমর্থন ব্যতীত ইউরোপ ওই অঞ্চলে একা হয়ে পড়বে।

তুরস্ক ও জার্মানি ট্রাম্প যুগে ওই অঞ্চলে ভারসাম্যমূলক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার বিকল্প পথের সন্ধান করছে। তুরস্ক তার বর্তমান বাজেট ঘাটতি এবং সঙ্কোচনশীল অর্থনীতির জন্য জরুরি সমর্থন চায়। জার্মানি বুঝতে পেরেছে তুর্র্কি জনগণ এরদোগানের পেচনে দাঁড়িয়েছে এবং তারা তার সাথে চলতে চায়। এরদোগান তার নীতি এবং অবস্থানে অটল থেকেই জার্মানির সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে চান। তাই আলাপ-আলোচনা, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং করমর্দন এখন গুরুত্বপূর্ণ। পর্যবেক্ষক মহল আশা করে, দু’দেশের স্বার্থে পারস্পরিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরো সুদৃঢ় হবে।

 


আরো সংবাদ