১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রাফায়েল গ্যাঁড়াকলে ভারত

রাফায়েল গ্যাঁড়াকলে ভারত - ছবি : সংগৃহীত

ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত করার চেষ্টা অনেক দিনের। ওই চেষ্টা আরো জোরদার করার অংশ হিসেবে ফ্রান্স থেকে রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিও করেছিল। কিন্তু তাতেই ফেঁসে গেছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার। এতে যে কেবল মোদির স্বচ্ছ ইমেজে কালি পড়েছে তা-ই নয়, সেইসাথে দলের নির্বাচনী ভবিষ্যতে ছায়াপাত করেছে। তবে এসবের চেয়ে বড় বিষয় হলো, ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে এখন তার অতি প্রয়োজনীয় অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্ত সংযমের পরিচয় দিতে হচ্ছে। পরিণতিতে সামরিক বাহিনীকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়াস থমকে গেছে।

গত মার্চে পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেয়ার সময় এক সিনিয়র জেনারেল বলেছিলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ সরঞ্জামই সেকেলে। মাত্র আট শতাংশ অস্ত্র অত্যাধুনিক। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবস্থা কিঞ্চিত ভালো।

অথচ ভারতকে ঘিরে আছে চীন ও পাকিস্তান। এদের মোকাবিলায় তার প্রস্তুতি থাকা দরকার। কিন্তু আগামী বছর নির্বাচনের মুখোমুখি থাকা ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার রাজনৈতিক বিতর্কের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। ফলে তারা বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র ১৫ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারে ১১০টি মধ্যম পাল্লার জঙ্গিবিমান কেনার দরপত্র শিগগিরই প্রকাশ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ফলে ভারতীয় বিমানবাহিনীকে ১১ স্কয়াড্রন বিমান কম নিয়েই চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে (যদি তারা একসাথে যুদ্ধ করে) দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। উল্লেখ্য, ভারতীয় বিমানবাহিনী মনে করে, তাদের ৪২ স্কয়াড্রন বিমান দরকার। অথচ তাদের হাতে আছে ৩১ স্কয়াড্রন।

এমনকি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫৭টি জঙ্গি বিমান ক্রয় কিংবা দেশেই একটি বিমানবাহী রণতরী বানানোর পরিকল্পনাতেও সম্ভবত অগ্রসর হবে না। এমনকি রাশিয়ার কাছ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেনার যে পরিকল্পনা ছিল (যা অক্টোবরে ভারত-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল) তাও স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া, ছয় বিলিয়ন ডলারে ছয়টি প্রচলিত সাবমেরিন ও সেনাবাহিনীর জন্য সাঁজোয়া যান ও অ্যাসাল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র কেনাও স্থগিত হয়ে গেছে।

চলতি শতকের শুরু থেকে ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সেকেলে হয়ে পড়া শত শত মিগ-২১, মিগ-২৩ ও মিগ-২৭ পরিবর্তন নিয়ে ভেবেছেন। তারা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তেজস নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু এর উন্নয়ন ব্যাপকভাবে বিলম্বিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই তারা রাফায়েল বিমানের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তবে রাফায়েলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অন্যান্য দেশের অত্যাধুনিক বিমান নিয়েও তারা নানা পরীক্ষা চালিয়েছিল।

রাফায়েল কেনার ব্যাপারে আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারও বেশ অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা ওই সমঝোতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ভারতে যাতে এ বিমান তৈরি করা হয় সেজন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা এইচএএলকে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকার হঠাৎ করেই ঘোষণা করে- ১২৬টির বদলে ৩৬টি রাফায়েল বিমান তৈরি অবস্থাতেই ফ্রান্স থেকে কেনা হবে। প্রতিটি বিমানের দামও বেড়ে যায়।

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস দল রাফায়েল চুক্তি নিয়ে মোদি সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছেন। রাফায়েল কেনার চুক্তিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করে আসছেন। তা ছাড়া, রাষ্ট্রীয় সংস্থা এইচএএলকে বাদ দিয়ে মোদির রাজ্য গুজরাটের ব্যবসায়ী ও বিজেপির ঘনিষ্ঠ অনিল আম্বানির প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেন এতে সহযোগী করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। মোদি সরকার এসব সমালোচনার জবাব দিতে পারছে না।

এত দিন মোদি সরকার বলে আসছিল, আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপকে তারা কোনো ধরনের আনুকূল্য প্রদর্শন করেনি। কিন্তু তদানীন্তন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ গত শুক্রবার ফরাসি অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট মিডিয়াপার্টকে জানিয়েছেন, মোদি সরকারই রিলায়েন্স গ্রুপকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তার এ বক্তব্য মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের আঘাত বলে বিবেচিত হচ্ছে। এখন আর তারা সত্যকে আড়াল করতে পারছে না।

১৯৮৯ সালে সুইডিশ অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বাফোর্স থেকে অস্ত্র কেনা নিয়ে কেলেঙ্কারিতে ওই সময়ের কংগ্রেস সরকার নির্বাচনে হেরে গিয়েছিল। এখন কংগ্রেস একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিজেপি সরকারের পতন ঘটাতে চাইছে।

ভারত যখন বেকায়দায় পড়ে গেছে, তখন চীন ও পাকিস্তান দ্রুত তাদের অস্ত্র কিনে যাচ্ছে, সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার কাজ দ্রুত করে যাচ্ছে। ইসলামাবাদের কাছে অত্যাধুনিক বিমান, রণতরী ও সেনা সরঞ্জাম বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বেইজিং। তারা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে। ভারত ও চীনা সামরিক বাহিনীর মধ্যকার ব্যবধান আগেই উদ্বেগজনক মাত্রায় ছিল। এখন তা আরো বেড়ে গেছে। এমনকি যে পাকিস্তান আগে ভারতের কাছ থেকে অস্তিত্ব রক্ষার হুমকিতে থাকত, তারাও এখন পরমাণু অস্ত্র ছাড়াই ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার কথা আস্থার সাথে বলছে।

রাফায়েল নিয়ে বিতর্ক আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য আরেক দফা ভারতের বিরুদ্ধে নিয়ে গেছে।
এখন চীন ও পাকিস্তানের যেখানে জঙ্গিবিমান রয়েছে দুই হাজার, সেখানে ভারতের আছে মাত্র ৬০০টি। এখন ১২৬টির বদলে মাত্র ৩৬টি কেনার অর্থ হলো আরো ৯০টি বিমান হ্রাস পাওয়া। আবার সরকার এখন ক্রয়কার্যক্রম মন্থর করে দেয়ায় সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে।


আরো সংবাদ




Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme