১৫ অক্টোবর ২০১৮

আরব নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যৎ

আরব নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যৎ - ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরব ন্যাটো গঠন নিয়ে আলোচনাটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি নিয়ে এমন এক সময় আলোচনা হচ্ছে, যখন ইরানের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি মুসলিম দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের উত্তেজনা হঠাৎই বেড়ে গেছে। মনে করা হচ্ছে, ছয় আরব দেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আঞ্চলিক সহযোগী জোট গঠন করতে এই উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
এক দিকে বলা হচ্ছে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেবে। আবার অন্য দিকে বলা হচ্ছে, সুন্নি মুসলিম মিত্রদের এই সামরিক জোট হবে এমন একটি পুতুল সংস্থা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঐতিহ্যগত মিত্র ইসরাইলের হাতে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিনামূল্যের একটি হাতিয়ার উপহার দেবে। মনে হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক জোট তৈরির দিকে ঠেলে দিয়ে সৌদি আরবকে সত্যিকার অর্থেই আবারো ভুলপথে পরিচালিত করছে।

রয়টার্স নিউজ এজেন্সি চারটি ভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়ে আরব ন্যাটো-সংক্রান্ত রিপোর্টটি করেছে। তবে এটি স্পষ্ট নয় যে, এ অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তার মোকাবেলা করতে ছয়টি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র, মিসর ও জর্দানের সমন্বয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট তৈরির সিদ্ধান্তটি ঠিক কোথায় নেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, গত বছর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের সময় সৌদি আরবের প্রতিনিধিরা যখন ট্রাম্পের সাথে একটি বৃহৎ অস্ত্রচুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জোট (এমইএসএ) নামে পরিচিত এই জোট তৈরির পরামর্শ দেয়া হয়েছিল অথবা এও হতে পারে যে, হোয়াইট হাউজই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এসব দেশের মধ্যে গভীর সহযোগিতা চাইছে।

সাধারণভাবে ইন্টারনেট অনুসন্ধান করলে এর মূল ধারণাটির ব্যাপারে অবাক করা তথ্য পাওয়া যায়। এই তথ্য অনুসারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার সেরা বন্ধু ট্রাম্প-জামাতা জেরড কুশনারের মাধ্যমে এ ধারণার সূচনা করেছিলেন। এ ধারণা অনুসারে, শুধু সুন্নি মুসলিমদের ‘আরব ন্যাটো’ মিত্ররা ইরানের শিয়া অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারবে। কুশনার ব্যক্তিগতভাবে একজন অর্থোডক্স ইহুদি। ট্রাম্পের মেয়েকে বিয়ে করে তিনি তাকে ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তর করেন। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুই রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি ফর্মুলার অনেকখানি অপমৃত্যু ঘটানোর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছেন বলে মনে করা হয়। কুশনার একাধারে নেতানিয়াহুর বিশেষ বন্ধু আবার বিন সালমানেরও একান্ত বন্ধু হিসেবে পরিচিত।

বিভিন্ন উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এই আরব জোটের পরামর্শটি প্রথম বিশেষভাবে আলোচনায় আসে যখন প্রস্তাবিত আরব ন্যাটোর চার সদস্য দেশ বছরখানেক আগে কাতারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবরোধ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মিসর ও বাহরাইন ২০১৭ সালের জুন মাসে কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এর সূচনা ঘটায়।

তারা অভিযোগ করে, দেশটি ইরান ও তার সন্ত্রাসী চরমপন্থী গোষ্ঠীকে সমর্থন করে। কাতার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। তবে একই সাথে কাতারের আমির তার ক্ষুদ্র কিন্তু জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশটি প্রতিপক্ষ শক্তি দখল করে নিতে পারে আশঙ্কায় রাতারাতি সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেন। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর সৌদি আরবের উচ্চাকাক্সক্ষী ক্রাউন প্রিন্স ও জারদ কুশনারের অন্যতম সেরা বন্ধু মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বিশাল অস্ত্রচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ জন্য প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় ইরানের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিকে।
এটি সত্য যে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক মতপার্থক্য ব্যবহার করে এই অঞ্চলে ইরান তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। এটাও সত্য, এ অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীকে দেশটি সমর্থন করছে। এসব গোষ্ঠীর ইরাক ও সিরিয়ায় আনুষ্ঠানিক চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। কারণ, এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা এখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার কোনো অজুহাত আর পাবে না।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইরাক ও সিরিয়ার প্রত্যেক পশ্চিমা সৈনিক মুসলমানদের দেহের এক একটি কাঁটার মতো। এ কারণে এ অঞ্চলে পাশ্চাত্যের উপস্থিতিকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করার সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই উচিত নয় ইরানের। ইরানের বেশির ভাগ যুবকই চরমপন্থী প্রভাব সম্প্রসারণ নীতি প্রত্যাখ্যান করে। তারা ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত ও মৃত শিশুদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী হতে চায় না; তারা আলেপ্পোর ধ্বংসাবশেষকে ঘৃণা করে। একই সময়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুও হতে চায় না।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক হাক্কি ওকাল যথার্থই বলেছেন, ছয়টি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র, মিসর ও জর্দানকেও এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে যে, এ অঞ্চলে ইরানের সম্প্রসারণের বিরোধিতা কেবল কূটনীতির মাধ্যমে হতে পারে। নেতানিয়াহু ও কুশনারের হাতে এ অঞ্চল নিয়ে খেলাধুলা করার মতো হাতিয়ার তুলে দেয়ার কোনো অর্থ হতে পারে না। এ অঞ্চলে একটি নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট তৈরির ধারণা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের তেহরান ও ইরানের অন্যান্য বড় শহরে বোমাবর্ষণকে সহায়তা করবে। যার ফলে সেখানে শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতাকারী তরুণেরাও মারা যাবে।

অবশ্যই, হোয়াইট হাউজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার মতো অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে গভীরতর সহযোগিতা দেখতে চায়, যেটি রয়টার্স নিউজ এজেন্সির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই হোয়াইট হাউজ আঞ্চলিক সহযোগীদের সঙ্গে জোটের ধারণা নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট। কিন্তু এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত গোটা মধ্যপ্রাচ্যের।

আইএস বা আলকায়েদা কারা কী উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে, সেটি এখন অনেকটাই রহস্যাবৃত হয়ে আছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, মধ্যপ্রাচ্যে আজ যে নরকতুল্য একটি মৃত্যুপুরীর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তার বাহানা করা হয়েছে এ দু’টি চরমপন্থী দলকে। এই দলের অনেকে চিকিৎসা পেয়েছে ইসরাইলে। তাদের অস্ত্রের উৎস হিসেবে পরোক্ষভাবে এর বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ভূমিকা রেখেছে বলে নানান রিপোর্টে উঠে আসছে।

এখন মধ্যপ্রাচ্যকে আরেকটি হানাহানি আর মৃত্যুপুরীতে পরিণত করার গোপন অভিলাষ চরিতার্থ করতে ‘আরব ন্যাটো’ জোট করার কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসরাইল তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে আরো সম্প্রসারণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র আরব সম্পদকে আরো বেশি অস্ত্র বিক্রি অথবা অন্যভাবে হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ গ্রহণ করবে। আর এ ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন প্রভাব বিস্তারের নীতি গ্রহণ করে সৌদি আরব বা ইরান দুই পক্ষই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার ভূমিকায় নেমেছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে আজ যা চলছে তা আরো বিস্তৃত হয়ে ছড়াবে ইরান এবং সৌদি ভূমি পর্যন্ত। আরব ন্যাটোর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ হলো এটি।

 


আরো সংবাদ