২১ নভেম্বর ২০১৮

বিরোধী দলে থাকলে চাই, সরকারে থাকলে কেন নয়?

জাতীয় সংসদ ভবন - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে দেশের জনগণ যে সোনার বাংলাকে গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, সেই গণতন্ত্র আজ শৃঙ্খলিত। শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে দেশ গণতন্ত্রের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু গত ২৩ মার্চ প্রকাশিত জার্মানির বার্টেলসমান স্টিফটাংয়ের সমীক্ষায় বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া এবং উগান্ডাকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ ওই পাঁচটি দেশ গণতন্ত্রের সর্বনি¤œ মানদণ্ডের একটিও পূরণ করেনি।

ওই সব দেশের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াই সংগ্রাম করেছে ভূ-ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নজির নেই। তবু সেই গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। গণতন্ত্র একটি উচ্চমানের শব্দ। একটি স্বাধীন সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশে তা ভোগ করার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। গণতন্ত্র মানে যা ইচ্ছে তা করা নয়! তবে গণতন্ত্রের রূপ ষড়ঋতুর মতো পরিবর্তন হয় বলেই রাজনৈতিক অঙ্গনের বহুল প্রচলিত প্রবচন (Of the people, by the people, for the people) বাক্যগুলো এখন আর তেমন একটা শোনা যায় না। তবে এখন করা উচিত (Of the leader, by the leader, for the leader)। যা আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ভোটাধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যখন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে কেউ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায় না। আমেরিকার ৩৩তম রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যানের একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে- এমন যখন একটি সরকার বিরোধীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার নীতিতে অবিচল থাকে, তখন ক্রমাগত নিবর্তনমূলক ব্যবস্থাকে আরো শাণিত করে তোলার একটি পথকে বেছে নেয়; যতক্ষণ না পর্যন্ত এটা সমগ্র জনগণকে আতঙ্কিত করে তোলার উৎস হিসেবে কাজ করে এবং রাষ্ট্রের জনগণ এক আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করে। আওয়ামী লীগ দাপটের সাথে দেশ শাসন করছে। তাদের সফলতার কর্মকাণ্ড যেমন জনগণ দেখেছে, তেমনি তাদের ব্যর্থতার বিচারও জনগণ করবে। সরকার সফল নাকি বিফল তার প্রমাণ হয়তো আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিলবে।

কিন্তু বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বিদায় বেলায় কেয়ারটেকার সরকার বাতিলের যে আংশিক রায় দিয়ে গেছেন, তা কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে মুদ্রিত থাকবে। এক কলমের খোঁচায় পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বর্ষার বাদলে ডুবিয়ে দিয়েছেন। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশ-বিদেশের নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো সময়ের তুলনায় ছিল অধিকতর স্বচ্ছ এবং সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। মূলত এটাই ছিল কেয়ারটেকার সরকারের প্রথম মডেল নির্বাচন। ১৯৯৬ সালে কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী একই ইস্যুতে হরতাল-অবরোধ করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ পুরনো সেই স্মৃতি ভুলে গিয়ে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা বলেছিলেন নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। কিছু দিনের মধ্যেই সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসে সব কথা ভুলে চর দখলের মতো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে পাঁচ বছর পার করে দিলো। কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারল না। এ থেকে এটাই প্রমাণ হয়, ক্ষমতাসীন শাসকের হাতে ক্ষমতার চাবি রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তেমনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতাও তাদের কাছে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। আর পৃথিবীর কোথাও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয় না। তা হলে বাংলাদেশে কেন? সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে গদি থেকে তাদের বিতাড়িত করা অসম্ভব।

কারণ, সংসদ নির্বাচনের পর ফলাফল যদি তাদের মনঃপূত না হয়, তাহলে তারা পুরনো সংসদ ডেকে নির্বাচনী ফল বাতিল করে সংসদের মেয়াদ আরো বাড়িয়ে নিলেও তখন কেউ কিছুই করতে পারবে না। কারণ, ওই সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসনের এক শ্রেণীর নীতিহীন কর্তাব্যক্তি তখন মাসতুতো ভাইয়ের ভূমিকা পালন করবে। ক্ষমতাসীন শাসক ক্ষমতায় থেকে যতগুলো নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে, সব কয়টি বিতর্কিত হয়েছে। বিতর্কিত নির্বাচনের পরিণতি ভালো হয় না এটা ক্ষমতাসীন শাসক অনুধাবন করতে না পারলেও বিরোধী দল ঠিকই টের পায়। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, সেখানে যখন খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনে যে অনিয়ম হবে না তা বলা যায় না। এমন বক্তব্য যখন একটি দেশের নির্বাচন কমিশনার দেন তখন সহজে অনুমান করা যায়, এই কমিশনারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। বহুদলীয় গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বহুদিন কারাগারে ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার গদিতে আসীন হওয়ার পর ’৭৫ সালে বহুদলীয় রাজনীতি ও সংসদীয় ব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে তিনিই একদলীয় শাসন (বাকশাল) প্রবর্তন করেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা এখন যা বলছে ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিএনপির নেতারাও ঠিক একই কথা বলতেন। অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতির ভাষা যদি আজকের আওয়ামী লীগের মতো হয় তখন তারা কী করবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজনীতিকেরা যখন বিরোধী দলে থাকে তখন যেমন সাচ্চা গণতান্ত্রিক হয়ে যান; তেমনি সরকারে থাকলে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেন। গত ৪৭ বছরে আমরা এই মহড়া দেখে আসছি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন জামায়াতকে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির আন্দোলন করেছিল, তখন জামায়াত কোনো সমস্যা ছিল না। আওয়ামী লীগের দ্বিমুখী চরিত্র শুধু যে জামায়াতের সাথে ঘটেছে তা কিন্তু নয়! তারা যখন ক্ষমতায় থাকে তখন গণতন্ত্র হরণ করে আর বিরোধী দলে যখন থাকে তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে; যা একটু বিশ্লেষণ করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। ইতিহাস সাক্ষী, কেয়ারটেকার সরকার গঠনের দাবিতে আওয়ামী লীগ ব্যাপক জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। অথচ এখন ক্ষমতার দাপটে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির কথা বেমালুম ভুলে গেল। এই কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করার দাবিতে কত হরতাল, কত অবরোধ, কত মানুষের প্রাণ যে হরণ করেছে তা লিখে শেষ করা যাবে না। অথচ আওয়ামী লীগ এখন নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করে না। আওয়ামী লীগ যখন কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি চাইল, তখন সংবিধানে তা ছিল না। তখন তারা বলত সংবিধান তো আর বাইবেল-কুরআন নয়! সংবিধান হচ্ছে জনগণের জন্য। আর এখন বলছে কেয়ারটেকার পদ্ধতি সংবিধানে নেই- সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না।

দলটি যখন বিরোধী দলে থাকে তখন আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল, অবরোধ, গানপাউডার দিয়ে মানুষ হত্যা, রেললাইন তুলে নেয়াকে আন্দোলনের বিজয় হিসেবে মূল্যায়ন করে। কিন্তু বিরোধী দলের হরতাল, মিছিল, প্রতিবাদ, দলীয় মিটিং করাকে ষড়যন্ত্র বা নাশকতা হিসেবে জাহির করে। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছিল। তখন এটা ছিল তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু এখন বিরোধী দলের ঘরোয়া মিটিংকে রাষ্ট্রদ্রোহী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করে। ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন বর্জন ও অগণিত জান-মালের ক্ষয়ক্ষতিতে নির্বাচন প্রতিহত করেছিল। সেই আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অগণিত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যদিয়ে একতরফা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।

কিন্তু এবারো যদি আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন করার চেষ্টা করে, তা হলে শুধু গণতন্ত্র বিপন্ন হবে বিষয়টি এমন নয়; দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। সরকারের মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছেনÑ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না হলেই এক লাখ লোক খুন হবে। একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তন হতেই পারে! তাই বলে এক লাখ লোক খুন হবে এই বার্তা দিয়ে সরকার নিজেই প্রমাণ করছে, রাষ্ট্রটি কত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। দেশের স্বার্থে গণতন্ত্রের যাত্রাকে আরো সুদৃঢ় করার জন্য আগামীতে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা একান্ত অপরিহার্য। সরকার জনগণের মনের দ্রোহটা অনুধাবন করবে এমনটিই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।


আরো সংবাদ