২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মালয়েশিয়ার নতুন সরকার চীনা আধিপত্যের বিরোধী

মাহাথির মোহাম্মাদ - ফাইল ছবি

চীনের একসময়ের বন্ধু মাহাথির মোহাম্মদ এখন ওই অঞ্চলে চীনা আধিপত্যের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় চলতি বছরের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যে ‘নির্বাচনী সুনামি’র মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনালের ৬০ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটেছেÑ তার ধাক্কা এখনো গোটা বিশ্বে গিয়ে আছড়ে পড়ছে।

৯৩ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ধাঁধাঁ লাগিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই কাঁপিয়ে দেননি; বরং দেশের বাইরের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চমক সৃষ্টি করেছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এতে তিনি বলেছেন, ‘নতুন সরকার ৪০ বিলিয়ন ডলারের চীনের অবকাঠামো সংক্রান্ত বিনিয়োগ বাতিল করার ব্যাপারে এগিয়ে যাচ্ছে।’

পূর্ববর্তী সরকার বেইজিংয়ের সাথে সন্দেহজনক যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, বর্তমান সরকার সে ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মালয়েশিয়ার নতুন সরকার দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডে চীনা নৌবাহিনীর দৃঢ়তা ও বিরামহীনভাবে সামরিকায়নের ব্যাপারেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালয়েশিয়ার ওই এলাকায়, অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগরে কয়েকটি দ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং দ্বীপগুলোর ওপর দাবিদার একটি রাষ্ট্র হচ্ছে মালয়েশিয়া। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পানিপথের ওপর চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিতে মালয়েশিয়া উদ্বিগ্ন।
ফলে, স্বাধীনচেতা মাহাথির চীনের ওপর থেকে তার দেশের গভীর নির্ভরশীলতা হ্রাস করার জন্য জাপান এবং পশ্চিমাদের সাথে শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। মালয়েশিয়াকে দীর্ঘ দিন ধরে চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেখা গেছে। কিন্তু ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য বা স্মরণীয় পালাবদলের কারণে দেশটি এখন এশিয়ায় বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে।

কৌশলগত রিপোর্ট
মাহাথির ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় থাকাকালে তার বাকপটুতা এবং পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামূলক অবস্থান বা দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন।

মালয়েশীয় নেতা মুসলিম দেশগুলোকে একতরফা দখলদারিত্বের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে জলাঞ্জলি দেয়ার মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলে আমেরিকার বিশেষ বাহিনীকে নিয়ে এসে কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ’র কথা বলে বকবক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছিলেন।
মিসরের আনোয়ার সাদাত এবং ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নোসহ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) নেতাদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে মাহাথির পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতি ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের ব্যাপারে সমর্থন ব্যক্ত করেন।

তার স্বাধীন ও দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে যথাসময়ে তিনি বিশ্বব্যাপী প্রশংসা অর্জন করেছেন। স্বাধীন ও সাহসী ভূমিকায় তিনি গোটা মুসলিম বিশ্ব ও বাইরের জগতে একজন বীরপুরুষ হিসেবে আবির্ভূত হন। যখন তিনি বিশেষভাবে পশ্চিমা দেশগুলোতে তার কর্তৃত্বপরায়ণ স্টাইলের নেতৃত্বের জন্য সমালোচিত হলেন, তখন মাহাথির মানবাধিকার যে শাশ্বত বিষয় বিতর্কিতভাবে তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং মানবাধিকার ও মানুষের স্বাধীনতার নীতি প্রাচ্য সভ্যতার শত্রুভাবাপন্ন বলে যুক্তি প্রদর্শন করেন।
মাহাথিরের উপদেষ্টাদের একজন আমাকে বলেছেন, তখন মালয়েশিয়ার নেতারা চীনকে একটি বড় বন্ধুভাবাপন্ন দেশ এবং একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি যা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাল্টা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে- এমনভাবে দেখতেন। কিন্তু গত দুই দশকে ওই অবস্থানের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।

এখন এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এতে সম্পূর্ণরূপে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। চীনের প্রভাব বেড়েছে এবং এশিয়ার নতুন নেতা হিসেবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিয়ে কৌশলে আমেরিকাকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে চায়। এই পটভূমির বিপরীতে গিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাহাথির চীনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে সমালোচনামূলক অভিমত তুলে ধরেছেন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে তিনি চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তাকে খোলাখুলিভাবে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
চীনের ব্যাপারে মাহাথির তার ঐতিহ্যগতভাবে গঠনমূলক মন্তব্য করা থেকে বেরিয়ে এসে বেইজিংয়ের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘সর্বগ্রাসী হওয়ার পথে অগ্রসরমান’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের ওপর তাদের প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে দৈহিক শক্তি জোরদার করছে বলে উল্লেখ করে, এতে ভীত না হওয়ার আহ্বান জানান।

দৃঢ়চেতা মালয়েশিয়া
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মালয়েশিয়ার আগের সরকারের সাথে বেইজিংয়ের চুক্তি স্বাক্ষরের সমালোচনা করেছেন মাহাথির। আগের সরকার ১ এমবিডি দুর্নীতি কেলেঙ্কারির মধ্যেও চীনের কাছ থেকে বড় আকারের চীনা আর্থিক সহায়তা (২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) চেয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তার পূর্বসূরি নাজিব রাজাককে নিজের স্বার্থে দুর্নীতিগ্রস্ত চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশকে বেইজিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য দায়ী করেন। মাহাথির বলেন, এর বিনিময়ে মালয়েশিয়ার স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিকায়নের ব্যাপারে মালয়েশিয়াকে নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ করা হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার নতুন সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতিসহ দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার স্বার্থরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। মালয়েশিয়া আরো খোলামেলাভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিকায়ন ও প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা এবং ওই অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য একটি নতুন শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। যাই হোক না কেন, আরো নাটকীয়ভাবে মালয়েশিয়া বড় আকারের চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাতিল করার বিষয়ও বিবেচনা করছে। উল্লেখ্য, মালাক্কা প্রণালী এবং দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগত উপসাগরীয় অঞ্চলে এসব চীনা অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল।

চীনা প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা, স্থানীয় শ্রমিকদের কাজে সম্পৃক্ত না করা এবং সর্বোপরি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে মাহাথির উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার ঋণের ব্যাপারে মালয়েশিয়া উদ্বিগ্ন। দেশটি শ্রীলঙ্কা আর লাওসের মতো ঋণের ফাঁদে পড়ার ব্যাপারে গভীরভাবে চিহ্নিত।

যেসব প্রকল্প পুনর্বিবেচনার জন্য সর্বাগ্রে রয়েছে সেগুলো হলো : চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি কর্তৃক নির্মাণাধীন ২০ বিলিয়ন ডলারের ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক, পাওয়ার চায়না ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক নির্মাণাধীন ১০ বিলিয়ন ডলারের মিলাকা গেটওয়ে প্রকল্প এবং চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়ামের একটি সাবসিডিয়ারির নির্মাণাধীন ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন।
মালয়েশীয় সরকার চীনা প্রকল্প, ১০০ বিলিয়ন ডলারের ফরেস্ট সিটিতে রিয়েল এস্টেট ইউনিট ক্রয়ের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এই প্রকল্পটি মালয়েশিয়ার প্রধান ভূখণ্ডের ক্রেতাদের কাছে বিশেষভাবে বাজারজাত করা হয়।

মালয়েশীয় সিনেটর ও ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিউ চিন তুং গত মাসে আমাকে বলেছেন, যাই হোক না কেন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটি চীনা বিনিয়োগের বিরোধী নয়। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে- মালয়েশিয়া একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত মানসম্পন্ন বিনিয়োগ চায় এবং স্থানীয় লোকজনের জন্য উপযুক্ত চাকরি তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়।
বর্তমানে বেইজিং মাহাথিরের মধ্যে পুরনো বিশ্বস্ত বন্ধুকে দেখতে পাচ্ছে না; তাকে এখন একজন উচ্চপর্যায়ের সমালোচক হিসেবে দেখছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে। ছোট ছোট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো এবং চীনের মধ্যে এখন পারস্পরিক কল্যাণকামী ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিই প্রধান হয়ে দেখা দিচ্ছে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme