২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ট্রাম্প উপসর্গ, রোগ তাহলে কী?

ট্রাম্প উপসর্গ, রোগ তাহলে কী? - ছবি : সংগ্রহ

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার উত্তরসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘উপসর্গ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এমন কোনো রোগ সৃষ্টি হয়েছে যার উপসর্গ হিসেবে ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করছেন এবং অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র বিষয়ে ভুল নীতি অনুসরণ করছেন। বারাক ওবামা শুধু একজন কালো আমেরিকান এবং মুসলিম বাবার সন্তান হিসেবেই ব্যতিক্রমী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, একই সাথে আরো অনেক ব্যতিক্রম তার মধ্যে রয়েছে। কোনো আমেরিকান বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিপরীতে এ ধরনের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নেয়ার দৃষ্টান্ত নেই। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাতে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন ওবামা। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়তে এক প্রচারণা সমাবেশে ট্রাম্প এবং তার নীতি ও দলের বেশ কিছু পদক্ষেপের সমালোচনা করেন ওবামা। তিনি আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী ভোটকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এ নির্বাচনে সব আমেরিকানকে ভোট দেয়ারও আহ্বান জানান।

ওবামা বলেছেন, মার্কিন রাজনীতিতে এখন একটি পুশব্যাক প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র যে সুন্দর একটি গণতন্ত্র লালন করত, ট্রাম্প তা নষ্ট করে দিয়েছেন। গণতন্ত্রে যখন কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তখন অন্য কিছু এসে সে শূন্যতা পূরণ করে। এখানে ভয়, বিরক্তি, বিদ্বেষ প্রভৃতি সে শূন্যস্থান দখল করছে। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ একটি বিপজ্জনক সময়ের মধ্যে বসবাস করছে। ট্রাম্প প্রশাসন দেশকে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে য্ক্তুরাষ্ট্র মিত্র হারাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাই শুধু গণতন্ত্রের জন্য হুমকি তা নয়, বরং বড় হুমকি হচ্ছে হতাশাবাদ- যা যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ধরছে। এখনকার সংবাদ শিরোনামের দিকে লক্ষ করা হলে দেখা যাবে বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন, অনেক ভয়ানক। এটি কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত আলোচিত উপসম্পাদকীয়র কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে প্রমাণিত হয়- আমাদের গণতন্ত্র যেভাবে চলার কথা ছিল সেভাবে চলছে না। হোয়াইট হাউজের লোকেরা আর প্রেসিডেন্টের আদেশ মানছেন না।

ডোনাল্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার কাজের জন্য কোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানের অনুমোদন পাননি। এ যাবৎকালের তার গড় অনুমোদন হার হলো ৩৯ শতাংশ। এটি গত বছর ডিসেম্বরে সর্বনিম্ন ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। আর অনুমোদন হার সর্বোচ্চে ছিল গত জানুয়ারির শেষার্ধে ৪৫ শতাংশ। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্টের কাজের এ অনুমোদন হার ছিল ৪১ শতাংশ। এখান থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম হলেও একেবারে বিপর্যয়কর কোনো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর অর্থ হলো- আমেরিকানদের একটি অংশ ট্রাম্পকে এবং তার নীতিকে সমর্থন করছে। আমেরিকান রাজনীতি ও সমাজের রোগটি সম্ভবত এখানে। দৃশ্যত ট্রাম্প যে উগ্র আমেরিকান জাতীয়তাবাদের কথা প্রচার করছে সেটির নেপথ্যে রয়েছে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা সাদাদের শ্রেষ্ঠত্ব তত্ত্ব। হোয়াইট সুপ্রিমেসির আনুষ্ঠানিক ভদ্র মোড়ক হলো আমেরিকা ফাস্ট। এ নীতিটি আমেরিকানদের ওপর ৩০ দশকে একবার ভর করেছিল। তখন আমেরিকানরা বাইরের সাথে দরজা অনেকটা বন্ধ করে নিজেদের উন্নয়ন ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কথা ভেবেছে।

এখন ট্রাম্প বা তার সমর্থকদের ভাবনাও সে রকম। সাদা আমেরিকানেরা বরাবরই তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠই ভাবত। কিন্তু ট্রাম্প যেভাবে এর প্রকাশ ঘটিয়েছেন সেভাবে তারা করত না। এক ধরনের ভদ্রতার মোড়কে থাকা এ ধারণাটির প্রকাশ ঘটত নীতির বাস্তবায়নে। ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাদার জাত্যাভিমানটি কিছুটা বেশি মাত্রায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অপ্রচলিত একজন ব্যক্তি রিপাবলিকান মনোনয়ন পেয়ে যান এবং নির্বাচনে জিতেও যান। নির্বাচনের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা চলতে পারবে না। কিন্তু তার মেয়াদের দুই বছর সময়ে বিষয়টি সে রকম মনে হয়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পরিচালিত করছেন কিছুটা ভিন্নভাবে। আমেরিকান গণমাধ্যম তার সমালোচনায় মুখর। উদারপন্থীরা তাকে অসহ্য মনে করছেন। পররাষ্ট্র দফতরসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে পেশাদারিত্বের চর্চা আগের মতো নেই। এরপরও আমেরিকান ‘ডিপ স্টেট’ বলতে যাদের বোঝানো হয় তারা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল রাখতে চান বলেই মনে হয়।

ট্রাম্প অপ্রচলিত পররাষ্ট্র নীতি দিয়ে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করার কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি আগের আমেরিকান প্রশাসনের দুই রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তিপ্রক্রিয়ার এক প্রকার মৃত্যু ঘটিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যকে আগ্নেয়গিরি বানানোর কর্মকাণ্ডে পেছন থেকে ভূমিকা রেখেছেন তিনি ও তার উপদেষ্টারা। এসব কাজ কোনো রেশন্যাল ভাবমূর্তির প্রেসিডেন্টকে দিয়ে সম্ভব ছিল না বলেই হয়তো তাকে এ পদে আনা হয়েছে।

আমেরিকান সামরিক ক্ষমতাকে ট্রাম্প অর্থ কামাইয়ের জন্য কাজে লাগাতে চাইছেন। ইউরোপ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের আমেরিকান নিরাপত্তা সার্ভিসের জন্য অর্থ দেয়ার কথা তিনি একাধিকবার বলেছেন। ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য তুরস্কের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন ট্রাম্প। একই ধরনের লড়াই চলছে চীন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথেও। আমেরিকান এই নীতি ওবামা বা এই ঘরানার মার্কিন চিন্তাবিদেরা স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করবেন না। কিন্তু এর সমর্থকের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে একবারে কমও নয়।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের যে রিপাবলিকান প্রভাবিত রেড জোনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, সেখানে তার গ্রহণযোগ্যতা কম বেশি এখনো আছে। বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বাইরের দুনিয়ায় সমালোচনার মধ্যে পড়লেও সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে দেশে তিনি অনেক কাজ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। ফলে এখন বেকারত্বের হার আগের তুলনায় অনেক কম। দেশটির পররাষ্ট্র নীতিতে কি সাফল্য তা বিবেচনার চেয়ে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য পরিচর্যা বা আবাস সুবিধা নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার আকাক্সক্ষা যারা করেন তাদের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি। এই শ্রেণীর আমেরিকানেরা এখনো ট্রাম্পের মধ্যে ক্ষতির কিছু দেখছেন না।

হোয়াইট সুপ্রিমেসির মধ্যেই অভিবাসীবিরোধী চেতনা চাঙ্গা হওয়ার উপাদান রয়েছে। উদার নীতি বা সুষম বণ্টন তথা ৯৯ শতাংশের স্বার্থ রক্ষার মূল কর্মকাণ্ডকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে এই উগ্র জাতীয়তাবাদ। কোর রিপাবলিকান সমর্থক ইভানজেলিক্যাল বা টি পার্টির সক্রিয়তাবাদীরা যে উপসর্গের কথা ওবামা বলেছেন, সেই রোগ বিস্তারে কমবেশি ভূমিকা রাখছেন। ট্রাম্পের উগ্র মধ্যপ্রাচ্য নীতির কট্টর সমর্থক তারা। ফলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে যদি প্রতিনিধি সভা বা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ট্রাম্পবাদীরা হারায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পীয় উপসর্গ থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পারবে। তা না হলে হোয়াইট সুপ্রিমেসির এ ধারা দেশটির ভেতরে বাইরে চলতে থাকবে। যার শিকার হতে হবে অনেককেই।
E-mail : mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ