০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

এই ভোগান্তির শেষ হবে কি?

এই ভোগান্তির শেষ হবে কি? - ফাইল ছবি

পৃথিবীর সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ এই বাংলাদেশ যা আয়তনের দিক থেকে ক্ষুদ্র। যেকোনো সরকারের জন্য এ নিঃসন্দেহে একটি সমস্যা। এর ওপর আছে দেশে আইন অমান্য করার অপসংস্কৃতি। স্বাধীনতার পর থেকে খুব কম সরকারই যথাযথভাবে আইন মেনে ক্ষমতায় এসেছে। তাই বেশির ভাগ জনগণও কদাচিৎ আইন মান্য করে চলে। বর্তমান সরকারও যথাবিহিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি। তাই জনগণও আইন মেনে চলায় তেমন একটা গা করার কথা না। সরকার যেমন ফ্রি স্টাইলে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, দেশের মানুষও তাই। রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রায় সর্বত্রই এক অবস্থা। নদী-খাল-বিল জলাশয় বেদখল হয়ে যাচ্ছে; নগর-বন্দরের পথ-ঘাটেরও একই বেহাল দশা। অপর দিকে কেউ আঙুল ফুলে কলাগাছ আবার কেউবা অন্নাভাবে রুগ্ণ। এ দেশে ‘গাঁটকাটা সেলাম পায়, আর গামছা-চোরা ছেঁচা খায়।’ যারা আইন মেনে চলে তারা দুর্বল ও বঞ্চিত; আর আইন অমান্যকারীরা শ্রদ্ধেয়। যার আছে সে আরো পায়, কিন্তু যার নেই তার যা আছে তাও হারায়। আদিকাল থেকেই এ দেশে এমনটাই ঘটে আসছে। ‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’। মহাবীর আলেকজান্ডারের ভাষায়: ‘কী বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস’!

এই যে দিন কয়েক আগে ঈদুল আজহা গেল, তাতে জনগণের পুরনো ভোগান্তির সর্বশেষ চিত্র আমরা দেখেছি। দীর্ঘ লাইন দিয়ে রেলস্টেশনে রাত কাটিয়ে একেক জন টিকিট নামক সোনার হরিণটি পেয়েছেন। আবার কেউ তা পাননি। এরপর ট্রেন যাত্রার দিন দুধের শিশুদের নিয়ে মায়ের ভোগান্তি থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীদের ট্রেনে ওঠার দুর্মর প্রচেষ্টা অনেকের চোখে পানি এনেছে। হাজার হাজার লোক প্রাণান্তকর চেষ্টা করে ট্রেনের ছাদে ও ইঞ্জিনে বসে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে বাড়ি ফিরেছেন। ট্রেনের ভেতর তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এমনকি ঝুঁকি নিয়ে ছাদে হাজার হাজার লোক। তাদের এত টিকিট কে দিলো? রেলকর্তৃপক্ষ কি জানে না ট্রেনের ধারণক্ষমতা কত? ছাদের যাত্রীরা কি বিনাটিকিটে গেছেন? অনেক যাত্রীর হাতে টিকিট, তবুও ট্রেনে উঠতে পারেননি। তাদের কষ্টার্জিত টিকিটের টাকা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কি কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার করেছেন?

আনন্দের ঈদে ট্রেন যাত্রায় এ যে অব্যবস্থাপনা- এর দায় অবশ্যই কাউকে নিতে হবে, কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার বলেছেন, ট্রেনের ডাবল লাইন করতে হবে বা ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ভালো কথা। এর জবাব রেলমন্ত্রী দেবেন। তবে এর আগে এত টিকিট ছেড়ে এত যাত্রীর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা হলো কেন? এ প্রশ্নের জবাব তার দেয়ার কথা। বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা যায়, অফিসের আরাম কেদারায় বসে সাংবাদিকদের উদ্দেশে নানা বক্তব্য দেয়া হলেও কাজ কিছুই হয় না। এর একটা বিহিত হওয়া জরুরি। ব্যাপারটা কি রেলমন্ত্রী দেখবেন?

এত গেল কেবল রেলপথের অবস্থা। সড়ক পথ- তাও জঘন্য, ভাঙাচোরা আর খানাখন্দকে ভরা। সব রুটের বাস মালিকেরা ঈদের সময়ে বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দেন। মালিক পক্ষের বক্তব্য- স্বাভাবিক সময়ে তারা নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় কম ভাড়া নেন এবং ঈদের সময় নির্ধারিত ভাড়া নেন বলে ভাড়া ‘বেশি বলে মনে হয়’। তবে এ উদ্ভট বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। এ ছাড়াও আছে বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। কখন বাস আসবে, কখন বাস ছাড়বে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাসে তো উঠা গেল, বাস ছাড়ল, তবে কখন গন্তব্যে পৌঁছবে বা আদৌ পৌঁছবে কি না এর নিশ্চয়তা নেই। প্রায়ই থাকে পথে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা। প্রায় সব রুটেই প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার লম্বা যানজট। শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-নারীসহ যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা।

যাত্রাপথে বড় ফেরি পারাপারেও অনিশ্চয়তা। কখনো দেখা যায় ঈদের আগের দিন রওনা দিয়ে ঈদের পরের দিন গন্তব্যে পৌঁছতে হয়, যদি ভাগ্যক্রমে পথে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। এ তো গেল আন্তঃজেলা বাস চলাচলের করুণ চিত্র। শ্রমজীবী বহুলোক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকেও গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে বাধ্য হন। ঈদের ছুটিতে বিনোদনের জন্য অনেকেই দেশের টুরিস্ট স্পটগুলোয় বেড়াতে যান। স্পটগুলোর অ্যাপ্রোচ রোডের অবস্থা এতটাই বেহাল যে দুঃসাহসী ছাড়া ওই পথ কেউ মাড়ান না। আবালবৃদ্ধবনিতার বিনোদনের জন্য এগুলো মোক্ষম স্থান।

দক্ষিণ-বাংলাদেশে লঞ্চপথে যেতে যাত্রীদের একই রকম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। কেবিন পাওয়া দুষ্কর। ডেকে যাত্রীদের গাদাগাদি ভিড়। লঞ্চের ছাদেও তিলধারণের থাকে না ঠাঁই। অনেকেই বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করে, সদরঘাট থেকে ব্যর্থমনোরথ হয়ে ঘরে ফিরে যান। যারা লঞ্চ পান, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাড়ি যান। ফিটনেসবিহীন ও ক্যাপাসিটির অধিক যাত্রীবাহী বেশির ভাগ জলযান যাত্রীভারে প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। শত শত যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। তবুও দেখার কেউ নেই। মোটকথা, ঈদে ঘরমুখো সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের যেমন সীমা নেই, তেমনি জীবনেরও নেই নিরাপত্তা। এলিট শ্রেণীর লোকেরা এবং মন্ত্রী-এমপিদের এ দুর্ভোগ পোহাতে হয় না। তারা দেশের ভেতরেও প্রায়ই আকাশপথে চলেন। যাদের নিজেদের গাড়ি আছে তারাও তুলনামূলকভাবে আরামে আছেন, যদিও যানজট ও দুর্ঘটনা থেকে তাদেরও মুক্তি মেলা ভার।

এ তো গেল রোগের লক্ষণ। আসল রোগ অন্য জায়গায়। ঢাকা, ঢাকা, কেবল ঢাকা। সরকারের কর্মযজ্ঞ দেখে মনে হয় না, ঢাকার বাইরে ‘বাংলাদেশ’ বলে কিছু আছে। ঢাকায় ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেলসহ আরো কত কী হচ্ছে। সরকারি অফিস আদালত যেগুলোর ঢাকায় থাকার আদৌ প্রয়োজন নেই, সেগুলোও আছে নৌবাহিনী সদর দফতর, কোস্ট গার্ড দফতর এমন আরো অনেক দফতর ঢাকার বাইরেও নেয়া যায়। কত কাল ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। এটা করলে ঈদে যে লাখ লাখ লোক ঢাকা ছাড়েন তারা বাড়ির কাছে কাজ পেতেন। এখন গ্রামে-গঞ্জে কৃষিমজুর পাওয়া যায় না, তারা ঢাকায় চলে আসেন জীবিকার তাগিদে। চিকিৎসা, শিক্ষা আর চাকরি বলুন সবই ঢাকায়।

দেশের লোক হন্যে হয়ে ঢাকা চলে আসেন। প্রশাসন ডিসেনট্রালাইজেশন হয় না। উপরন্তু সরকারপ্রধান বলেছেন, তিনি বুলেট ট্রেন চালু করবেন, যাতে দিনাজপুরের মতো দূরের লোকজনও রোজ ঢাকা যাতায়াত করে অফিস করতে পারেন। এটা বাস্তবসম্মত কথা নয়, রাজনৈতিক বুদ্ধির কথা। দেশের দূর-দূরান্তের লোক ঢাকা এসে ঘুষ দিয়ে ঝটপট কাজ সেরে চলে যেতে বাধ্য হবে এখন যেমনটা করছে। এতে দূর-দূরান্তের লোকের লোকসান হলেও ঢাকায় অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরাট লাভ। অনেকেই বলেন, ঢাকা অ-বাসযোগ্য নগর। আসলেও তা-ই। নিচের দিক থেকে পৃথিবীতে যুদ্ধবিদ্ধস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ওপরেই ঢাকার স্থান। তবু কেউ ঢাকা ছাড়তে রাজি নন। উপরন্তু এমন অনেকে আছেন যারা ঢাকায় কোনোদিন লেখাপড়া বা চাকরি কোনোটাই করেননি। অথচ শেষ জীবন কাটানোর জন্য মফস্বল শহর ছেড়ে ঢাকা চলে আসছেন। এমনই ঢাকার মোহ।

এ সরকারের একটি মারাত্মক প্রবণতা হলো মেগা প্রজেক্ট হাতে নেয়া। এতে সরকারের চমকবাজি তো আছেই; এ ছাড়াও বিষয়টা যে কারণে বেশি লোভনীয় তা হলো- এসব প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার ছলে বিপুল অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেয়া যায়। এ দিকে, দেশব্যাপী রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। সে দিকে খেয়াল নেই। সড়ক পথ উন্নয়নে কেবলই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। ছোট কাজে খরচ কম, তাই কমিশনও কম। অতএব, মেগা প্রজেক্ট চাই। দেশের বিদ্যালয়গুলোয় প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানাগার নেই তবু বিদেশ থেকে বিদেশী বিজ্ঞানীদের তৈরি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা চাই, কারণ তাতে টুপাইস পকেটে আসে। বিদেশী গাড়ি আমদানি করে বশংবদ শ্রেণীর লোকদের আয়েশের ব্যবস্থা করা চাই। তাই যতখুশি গাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এ কাজে রাস্তা তৈরি করার টাকা গাড়ি রফতানিকারক দেশ দেবে এবং এর থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন পাওয়া যায়।

ভাঙাচোরা রাস্তায় চলাচল করে গাড়িগুলো তাড়াতাড়ি বিকল হলে আবার আমদানি। আবার কমিশন। বেশ মজার একটি আয়চক্র। রাস্তাগুলো এমনভাবে মেরামত করা হয় যেন ফি বছর তা বারবার মেরামত করতে হয়। এতে করে রাস্তা মেরামতের রেকারিং খরচ বাড়ে এবং ক্ষমতাসীন দলীয় লোক ফায়দা লুটতে পারে।

গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় শতশত সড়ক বছরের পর বছর বেহাল পড়ে আছে, কর্তৃপক্ষ তা মেরামতে দায়বোধ করেন না। উপরন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী উক্তি করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পত্রিকার খবর পড়ে দেশ চালান না’। তবে কি তিনি হরোস্কোপ পড়ে দেশ চালান? প্রশ্ন জাগে দেশে পত্রপত্রিকা এবং টেলিভিশন তবে আছে কী জন্য? টেলিভিশনে দেশের সার্বিক দুর্দশার খবর প্রতিনিয়ত সচিত্র প্রতিবেদনসহ প্রচারিত হয়; এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। পক্ষান্তরে মধ্যরাতের টেলিভিশন-টকশো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ’মধ্যরাতে চোর ডাকাতরা জেগে থাকে।’ তিনি কি জানেন না অনেক আওলিয়া-দরবেশ রাত জেগে তপস্যা করেন? প্রধানমন্ত্রী নিজে স্বপ্ন দেখেন, জাতিকে স্বপ্ন দেখান। তিনি কি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের সেই বিখ্যাত উক্তিটি শুনেননি-‘যে স্বপ্ন তুমি ঘুমিয়ে দেখ তা স্বপ্ন নয়; বরং যে স্বপ্ন তোমাকে ঘুমাতে দেয় না তা-ই স্বপ্ন’। সমস্যাসঙ্কুল বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সুখনিদ্রায় রাত কাটানোর সুযোগ নেই। জনগণের রায় ব্যতীত ক্ষমতায় আসতে পারলে কেউ জনস্বার্থের দাম দেন না।হ
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক


আরো সংবাদ

৩ দিন অনশনের পর স্বামীর বাড়িতে স্থান পেলেন ১ম স্ত্রী সপ্তম স্বর্ণ পদক এনে দিলেন ফাতেমা নয়া দিগন্তের চুয়াডঙ্গা জেলার সাবেক সংবাদদাতার মায়ের ইন্তেকাল হরিণছানার গুঁতোয় কাবু চিতা! শেষ হাসি কার? (ভিডিও) মেয়েরা ডাক্তার হবে, তাই ১২ কিমি দূরের স্কুলে রোজ নিয়ে যান বাবা মাবিয়ার পর ভারোত্তোলনে স্বর্ণ জিতলেন জিয়ারুল শিবগঞ্জে ৩‘শ বেকার মহিলাকে সেলাই প্রশিক্ষণ অটো ভাড়া দিতে টাকা নয় পেঁয়াজ! দেখে নিন ভাইরাল ভিডিও মৃত্যুর আগেই বীরঙ্গনার স্বীকৃতি চান নুরজাহান বেগম মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা চায় আ’লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-কমিটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা জাতিসঙ্ঘপ্রধানের

সকল




Paykwik Paykasa
Paykwik