১৬ নভেম্বর ২০১৮

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যযুদ্ধ

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যযুদ্ধ - ছবি : সংগৃহীত

বিদেশী সংস্কৃতি ও বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের বর্তমান বাস্তবতায় পৃথিবীর রাজনীতি ও বাণিজ্য ক্রমেই পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত সূচনা করছে। সেই সূচনা কারো জন্য মঙ্গলজনক, আবার কারো জন্য চরম বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করছে। এমনি বাস্তবতায় বিশ্বের পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বজায় রাখার জন্য হেন চেষ্টা নেই, যা তারা করছে না। এই অবস্থার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে হচ্ছে নিম্ন আয়, নিম্নমধ্যম আয় ও উচ্চমধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলোকে। অঞ্চলভেদে রাজনীতি ও বাণিজ্য বিভিন্ন পরিক্রমায় পরিচালিত হচ্ছে, যা বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যযুদ্ধ নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিব্যপ্ত হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত ক্রমেই নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকা অনুসারে ভারত এখন পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘সমাজতান্ত্রিক’ চীন, তৃতীয় স্থানে রয়েছে মিশ্র অর্থনীতির জাপান, চতুর্থ স্থানে রয়েছে মিশ্র অর্থনীতির জার্মানি এবং পঞ্চম স্থানে পুঁজিবাদী যুক্তরাজ্য। অর্থাৎ, এশিয়ার তিনটি দেশ বিশ্ব অর্থনীতির সেরা ছয়টি দেশের মধ্যে রয়েছে।

ভারত এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন, বর্তমান রাশিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ক্রমপরিবর্তনশীল বিশ্ব বাস্তবতায় ভারত ইতোমধ্যে ‘মার্কিনপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে। এর বহু কারণ রয়েছে। ভারতের প্রতিবেশী হলো- চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, প্রভৃতি রাষ্ট্র। ভারত দক্ষিণ এশিয়াতে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সফল হয়েছে মূলত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। অন্য কোনো দেশেই ভারত সুবিধা করতে পারেনি। তাই ভারত চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবেলা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়, এর সুফলও পাচ্ছে। অন্য দিকে, আমেরিকা চীনকে মোকাবেলা করার জন্য ভারতকে বিশ্বস্ত মনে করে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তান ক্রমেই জটিলতর অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে। চীন পাশে না থাকলে তার অর্থনৈতিক অবস্থা আরো ভঙ্গুর হতে পারত। এ দিকে, আমেরিকা আর পাকিস্তানের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করছে না। অন্য দিকে, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের প্রতি আমেরিকার আগ্রহ রয়েছে। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের স্বকীয়তার কারণে সেটা নাও হতে পারে। অন্য দিকে, জাপান যেহেতু আমেরিকার অর্থনৈতিক বলয়ের বাইরে নয়, সেহেতু জাপানকে নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথা নেই। দক্ষিণ কোরিয়াও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনের সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তবে

রাজনৈতিকভাবে উত্তর কোরিয়া কিছুটা চাপে আছে। বিশাল জনসংখ্যার চাপে ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিকভাবে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পাচ্ছে না। ফিলিপাইনের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও রাজনৈতিক অবস্থা কিছুটা অস্থির। মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীন ও ভারতের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমার চীনের বলয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভারত ও মিয়ানমার পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এমনি বাস্তবতায় চীন আমেরিকার ১২৮টি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধি করছে।

মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশেষত সৌদি আরব, মিসর, নাইজেরিয়া, কাতার, ইরান ও তুরস্কের প্রভাব রয়েছে। তুরস্কের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে তুরস্ক আমেরিকার সব ইলেকট্রনিক্স পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে এবং নতুন মিত্র খোঁজার হুমকি দিয়েছে। সত্যি কথা হলো, তুরস্কের সত্যিকার মিত্র আমেরিকা কখনোই ছিল না। ইরান রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করছে। অপর দিকে, ইরান ও সৌদি আরব- এই দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে কখনোই ভালো সম্পর্ক ছিল না। মাঝেমধ্যে তাদের যুদ্ধের হুমকিও শোনা যায়।

ইয়েমেন নিয়ে সৌদি অবস্থান মুসলিম বিশ^কে হতাশ করছে। কাতারে যে অর্থনৈতিক সঙ্কট সৌদি আরব আমেরিকার নির্দেশে সৃষ্টি করেছে সেটা মুসলিম উম্মাহর জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়েছে। তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া কাতারের প্রতি অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ফলে সঙ্কট থেকে কাতার দ্রুতই বেরিয়ে আসতে পেরেছে। বিশ^ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন ও রাশিয়া একসাথে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় রাশিয়া ও চীনের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে ইরান ও তুরস্ক। ছয় জাতি ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষর করা চুক্তি থেকে আমেরিকা বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ইরান রাশিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। মিসর ও নাইজেরিয়ার অর্থনীতি অনেকটা আমেরিকা ঘেঁষা। মুসলিম বিশে^র রাষ্ট্রগুলোকে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলো তাদের পক্ষে রাখতে চাওয়ার একমাত্র কারণ হলো- ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিষাক্ত সাপ’ ইসরাইলকে রক্ষা করা। ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্যই পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বিশ^কে সুকৌশলে বিভক্ত করার নীতি যার যার অবস্থান থেকে বাস্তবায়ন করে চলেছে। কারণ পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো ভালো করেই জানে, মুসলিম বিশ^ এক হলে ইসরাইল বলতে পৃথিবীতে কোনো দেশ থাকবে না। এই ইসরাইলকে রক্ষার জন্য সব পাশ্চাত্য রাষ্ট্র এক হতেও দ্বিধা করবে না। অন্য দিকে, মুসলিম বিশ^ একে অন্যের বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি করতে অস্থির হয়ে উঠেছে। মুসলিম বিশে^র ঐক্যের অভাবেই ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর অমানবিক নির্যাতন চলছে। ফিলিস্তিনে আর কত লাশ পড়লে মুসলিম বিশে^র শুভবুদ্ধির উদয় হবে?

বিশ^ রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থা আকর্ষণীয়। কিন্তু ‘ব্রেক্সিট’ নিয়ে আগামীর দিনগুলোতে ইউরোপের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর নেতিবাচক প্রভাব সাড়া পৃথিবীতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা ইউরোপের বৃহত্তর অর্থনীতির দেশ জার্মানি। এর অর্থনীতির সাথে অন্য দেশগুলোর অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডা ও মেক্সিকো। কানাডার নিজস্ব অর্থনৈতিক বলয় রয়েছে। অন্য দিকে, মেক্সিকোর অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভর করে আমেরিকার ওপর। কিন্তু সীমান্তে বেড়া দেয়া নিয়ে মেক্সিকো ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমেই সম্পর্ক বৈরী হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। অন্য দিকে, কিউবা নিয়ে আমেরিকার ভাবনার শেষ নেই। সমাজতান্ত্রিক কিউবার সাথে আমেরিকা কোনো প্রকার বাণিজ্যে যেতে আগ্রহী নয়। কিউবার অর্থনীতি চীন ও রাশিয়ার আদলে গড়া। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির রাষ্ট্র ব্রাজিল। তার সাথে পরাশক্তিগুলোর তেমন কোনো বিরোধ নেই। তবে সদ্য সমাজতন্ত্রে অধিষ্ঠিত হতে যাওয়া ভেনিজুয়েলা নিয়ে আমেরিকার বেশ মাথাব্যথা রয়েছে। কারণ, ভেনিজুয়েলায় সমাজতন্ত্রে সফল হলে পুঁজিবাদীদের জন্য অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা দেবে। এর প্রভাব সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পড়তে পারে।

আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তম অর্থনীতি হলো দক্ষিণ আফ্রিকার। নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা আশাব্যঞ্জক। তবে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া কঠিন সঙ্কট অতিক্রম করছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চীনের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক গভীর। অন্য দিকে, ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করার জন্য মিসর আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।

বিশ্বের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অবদান ব্যাপক। তবে রাষ্ট্র দুটি যেহেতু আধিপত্য বিস্তারের ধারে কাছে নেই, সেহেতু পরিবর্তিত বিশ^ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাদের কোনো প্রভাব অনুভূত হয় না।

একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। তা হলো- রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থই বড় হয়ে উঠেছে পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। এই অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধ কেবল পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। জনসংখ্যায় চীন ও ভারত যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয়। রেমিট্যান্স অর্জনে চীন প্রথম এবং ভারত দি¦তীয় স্থানে রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থের চেয়ে অন্যের স্বার্থ খুব কমই দেখছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সারা পৃথিবীতে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এর দায় কোনোভাবেই সেরা অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো এড়াতে পারে না। এই রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করে থাকে। আবার অঞ্চলভেদে মিত্রদের দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র হলেও বিশাল জনসংখ্যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এ দেশের বিষয়ে খুব আগ্রহ প্রকাশ করছে।
mahmuduljnu71@gmail.com


আরো সংবাদ

বিএনপির বিভাগওয়ারী প্রার্থীগণের সাক্ষাতের সময়সূচী নির্ধারণ মক্কা মদিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে খাসোগির গায়েবানা জানাজা বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে নিন্দা জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সিদ্ধান্ত নেবে জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল : ড. কামাল রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নজরদারিতে এবার আর্মড পুলিশের নতুন ব্যাটেলিয়ন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশী শিশু নিহত প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে গুমের মামলা, অবশেষে উদ্ধার নরসিংদীতে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ৪ ‘হাসিনা-এরশাদের ঐক্য কেউ বিনষ্ট করতে পারবে না’ খাশোগি হত্যার নির্দেশদাতার নাম প্রকাশ করল সৌদি আরব সেদিন পল্টনে কী হয়েছিল, জানতে আইজিপিকে চিঠি দিবে ইসি

সকল