২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মাদক নিয়ন্ত্রণে কিছু প্রস্তাব

মাদক নিয়ন্ত্রণে কিছু প্রস্তাব - ছবি : সংগ্রহ

‘মাদক’ সমাজ জীবনের এক মারাত্মক ক্যান্সার। এর কুপ্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। সর্বনাশা মাদক বিশ্বসভ্যতার জন্য মারাত্মক এক হুমকি। বিশ্বে মানবকল্যাণমুখী অগ্রগতি ঘটছে ঠিকই, এর পাশাপাশি কুফল হিসেবে মানব জীবনের জন্য ক্ষতিকর কিছু উপাদান বিস্তার লাভ করছে, তন্মধ্যে মাদকদ্রব্য অন্যতম প্রধান। ফলে সমাজে অন্যায়-অনাচার, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, খুন, ব্যভিচার, সন্ত্রাস ইত্যাদি মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয় এখন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি, কোনোভাবেই যেন এ অবক্ষয় রোধ করা যাচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে অবশ্য চলছে গ্রেফতার, ক্রসফায়ার, মামলা। কিন্তু মূল অপরাধীরা সাধারণত অধরাই থেকে যাচ্ছে। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ওরা নিস্তার পাচ্ছে মামলা থেকে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৭২ হাজার ৫৩০টি মামলা করেছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ৩৪৯টি। এর মধ্যে ৯ হাজার ৯৫২টি মামলার ১১ হাজার ৬৩৫ জন আসামি খালাস পেয়ে গেছে। পুলিশ সদর দফতরের রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত মামলার ৬৪ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছে। এ সম্পর্কে যে যার মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। একজন আইনজীবী হিসেবে মাদকের মামলা পর্যালোচনা করে আমরা প্রায়ই যে বিষয় দেখি তা হলো- তদন্তে গাফিলতি, সঠিকভাবে জব্দতালিকা না করা, সাক্ষীদের জবানবন্দী গদবাধা নিয়মে লেখা, চার্জশিটে মারাত্মক ত্রুটি ইত্যাদি। তা ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা, সাক্ষীর উপস্থিতি ও সাক্ষ্য, জেরা, জবানবন্দী ইত্যাদি দুর্বলতার কারণেও মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। মামলা পরিচালনার সময় দেখা যায়, আদালত সাক্ষী হাজির করার জন্য সমন, ড/অ, ঘইডড এসপির ও ডিআইজির মাধ্যমে এবং ঙৎফবৎ ঝযববঃ প্রেরণ করেও সাক্ষী হাজির করতে পারে না। নিতান্তই বাধ্য হয়ে আদালত অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৯ ধারা এবং ২৬৫ এইচ ধারা প্রয়োগ করে থাকেন। এতে করে প্রকৃত অপরাধী মুক্তি পেয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নি¤েœাক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. মাদকের মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি জেলায় আলাদা আদালত প্রতিষ্ঠা করা এবং দায়রা আদালতে বিচার্য মামলার ক্ষেত্রে একজন এবং ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার্য মামলার জন্য একজন বিচারক নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে মাদকের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা যায়। মাদকের মামলা পরিচালনার জন্য জেলার সৎ আইনজীবী বাছাই করে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওই বিশেষ আদালতের পিপি নিয়োগ দিতে হবে। মাদক আদালতে নিযুক্ত আইনজীবীকে উপযুক্ত সম্মানী দিতে হবে। কোনো পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) যদি পেশাগত কোনো অসদাচরণ করেন, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। নচেৎ মামলার জট বৃদ্ধি পেতেই থাকবে।

২. থানায় মাদকের মামলা তদন্তের জন্য আলাদা সেল থাকতে পারে। একজন ইন্সপেক্টর এবং পর্যাপ্তসংখ্যক এসআইয়ের সমন্বয়ে সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা তদন্তসংক্রান্ত কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবেন। তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করতে পারবেন। এ সেল মামলা তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করেই ক্ষান্ত হবে না, বরং সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতির জন্য নেবে। এ ক্ষেত্রে সাক্ষী নির্ধারণে পুলিশকে আরো সতর্ক হতে হবে। মামলা বিচারকালে জব্দকৃত মালামাল আদালতে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে।

৩. কারাগারে মাদক মামলার আসামিদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকতে পারে। এতে তারা অন্য কাউকে প্ররোচিত করতে পারবে না। তা ছাড়া কারাগারে গড়ঃরাধঃরড়হ ঢ়ৎড়মৎধস দরকার। শুধু সেøাগানে নয়, বাস্তবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারাবন্দী আসামিদের নিজ নিজ ধর্মের প্রতি অনুরাগী করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারাবন্দীরা আদালতে আসা-যাওয়া এবং কোর্টহাজতে থাকাকালে যাতে মাদকের সংস্পর্শে আসতে না পারে, সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কিছু অসাধু কারারক্ষী মাদক পাচারে সহায়তা করে থাকে। এ বিষয়ে কারাকর্তৃপক্ষ অনেক সচেতন থাকলেও আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে কোর্টহাজতখানায় নজরদারি বাড়াতে হবে।

৪. এসব প্রস্তাব আলোচনা-পর্যালোচনা এবং যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রয়োজন মাদকপ্রবণ কয়েকটি জেলার পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কাজ করে দেখা যেতে পারে।

৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যাদের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা হবে তারাই যদি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে, সহযোগিতা করে, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে তাহলে নিয়ন্ত্রণের আশা করা যায় না। পুলিশ এবং বিজিবি সদস্যদের নীতিনৈতিকতা আরো উন্নত করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে এ কাজে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আছে তাদের কড়া নজরদারিসহ নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৬. জেলা পুলিশসুপার মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজস্ব সেল রাখবেন; নিয়মিত ফলোআপ করবেন এবং তার বাহিনীতে গোয়েন্দা রাখবেন। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য সরাসরি এসপি বরাবরে জানাবেন।

৭. পত্রপত্রিকায় কিংবা আমাদের কাছে আইনি সহায়তার জন্য অনেকেই এসে জানায়, পুলিশ তার কাছে কোনো মাদকদ্রব্য পায়নি, তবুও অন্যপক্ষ দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তাকে মাদক দিয়ে চালান করা হয়েছে। এসব ঘটনা সব যে সত্য তা কিন্তু নয়, তবে সব মিথ্যা নয়। দেখা যাচ্ছে, কারো সাথে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ আছে, পুলিশকে ম্যানেজ করে সহজলভ্য ইয়াবা দিয়ে প্রতিপক্ষকে চালান দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার রেষারেষিতে কেউ বলিরপাঁঠা হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ওই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮. অভিযোগ আছে, থানার মালখানায় প্রচুর মাদকদ্রব্য থাকে যা দিয়ে হয়রানি করা হয় নিরীহ মানুষকে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। ক. উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য মামলার এফআইআর প্রেরণের সাথে সাথেই নমুনা সংরক্ষণ কিংবা রাসায়নিক পরীক্ষায় পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় বাদ দিয়ে বাকি মালামাল আদালতে পাঠাতে হবে। খ. আদালতে আলামত আসার পর বাদি/তদন্ত কর্মকর্তা, আদালতের জিআরও এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের যৌথ স্বাক্ষরে সিলগালা করা হবে এবং সাথে সাথেই মালখানায় চলে যাবে। গ. আলামত ধ্বংসের আগে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিটি আলামত তিনজনের স্বাক্ষর আছে কি না কিংবা প্যাকেট যথাযথ আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখবেন, তারপর আলামত ধ্বংস করবেন। ঘ. সিএমএম আদালতের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলার প্রতিটি থানায় সারপ্রাইজ ভিজিট বা তাৎক্ষণিক সফর করে থানার মালখানা কিংবা কোথাও মাদকদ্রব্য সংরক্ষণ করা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৯. মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। নেতৃত্ব নির্বাচনে বা মনোনয়নে মাদকসংশ্লিষ্টতা অযোগ্য বলে গণ্য করতে হবে। নেতাকর্মীদের মাঝে মাদক সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে দলীয় কঠোর সিদ্ধান্তও ফল দিতে পারে।

মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনের কঠোরতা যেমনি প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমেও মাদক নিয়ন্ত্রণে কিছুটা কাজ করা যেতে পারে। যে যার অবস্থান থেকে মাদকবিরোধী প্রচারণা, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, সভা-সমাবেশ-সেমিনার, Motivation Program-এ রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদা সচেতনতা ইত্যাদির মাধ্যমে পুরোপুরি মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব না হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মাদকমুক্ত করা যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। 


আরো সংবাদ