২৪ জানুয়ারি ২০১৯

সেক্যুলার স্থবিরতার মিথ

সেক্যুলার স্থবিরতার মিথ - ছবি : সংগ্রহ

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর কিছু অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব অর্থনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতায়’ সম্ভবত ভুগছিল। এটি মহামন্দার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে একটি ধারণার জন্ম দেয়। তবে দেখা গেছে অর্থনীতি সবসময় নিম্নগতি থেকে উদ্ধার পেয়েছে। কিন্তু মহামন্দা এক অভূতপূর্ব দীর্ঘ সময় স্থায়ী ছিল। অনেকে বিশ্বাস করতেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকারের ব্যয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হয়েছে আর অনেকের মনে ভয় ছিল যে, যুদ্ধের শেষে আবার অর্থনীতির দুর্ভোগ ফিরে আসবে।
এমন কিছুটা ঘটেছে বলে বিশ্বাস করা হতো যে, কম বা শূন্য সুদের হারের সাথেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন ভালোভাবে বোঝা যায় যে, এই ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণী সৌভাগ্যবশত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

২০০৮ সালের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন (আগের সঙ্কটকালে অর্থনীতির বিধি-বিধান ও শৃঙ্খলার জন্য যারা সাহায্য করেছেন সেই একই ব্যক্তিদের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সঠিকভাবে ফিরিয়ে এনেছিলেন) তারা দেখেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতার বিষয়টি আকর্ষণীয়, কারণ এটি পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতার দ্রুত একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। সুতরাং, অর্থনীতির পতন ঘটলে, ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত হয় : আর বলা হয়, আমাদের দোষারোপ করবেন না, এটি যে জন্য ঘটেছে তা এর মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে, আমরা যা পারছি তা করছি।

গত বছরের ঘটনাটি ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতার এই ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, যা কখনো কখনো খুব প্রীতিকর মনে হয়নি। মার্কিন রাজস্ব ঘাটতি হঠাৎ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি একটি দুর্বল কর বিল প্রণয়ন এবং দ্বিদলীয় খরচ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় ঘটেছে। এতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে এবং বেকারত্ব ১৮ বছর সময়ের মধ্যে নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলো দুর্বলভাবে করা হয়ে থাকতে পারে যদিও তা যথেষ্ট আর্থিক সহায়তার সাথে কর্মসংস্থান অর্জনে সহায়ক হয়েছে। এমনকি সুদের হার শূন্যের উপরে উঠেছে।

ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে একটি বৃহত্তর, দীর্ঘতর, উন্নততর কাঠামোগত এবং আরো নমনীয় রাজস্ব প্রণোদনা না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেছে। যদি তা না করেও অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরো শক্তিশালী হতো তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতার বিষয় এখানে আসত না। এটি ছিল তথাকথিত পুনরুদ্ধারের প্রথম তিন বছরে শুধু ১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির ঘটনা।

আমাদের কেউ কেউ তখন সতর্ক করে দেয় যে, অর্থনীতির নি¤œগতি গভীর এবং দীর্ঘ হতে পারে। সম্ভবত এটি ছিল যে সময়ে সতর্ক করা হয় সে সময়ে ওবামা প্রস্তাবিত ব্যবস্থা থেকে ভিন্ন শক্তিশালী কিছু প্রয়োজনের কথা বলা। আমি সন্দেহ করি যে, এই বিশ্বাস একটি প্রধান বাধা ছিল যে অর্থনীতিতে শুধু একটি সামান্য ‘বাঁক’ এসেছে, যা থেকে এটিকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। বলা হয় ব্যাংকগুলোকে হাসপাতালে রাখুন, তাদের দরদের সাথে যত্ন নিন (অন্য কথায়, ব্যাংকারদের কাউকে জবাবদিহি করবেন না বা তাদের নিয়ে ঠাট্টা করবেন না বরং এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের পরামর্শের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মনোবল বাড়িয়ে নিন) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের টাকার ঝরনা দিয়ে গোসল করিয়ে দিন আর এতে সব কিছু দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু অর্থনীতির বিপত্তিগুলো এই রোগ নির্ণয় ও পরামর্শের চেয়ে অনেক গভীর ছিল। আর্থিক সঙ্কট থেকে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া ছিল আরো গুরুতর এবং ব্যাপকভাবে শীর্ষ দিকে আয় এবং সম্পদ পৌঁছার ফলে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থনীতি উৎপাদন থেকে সেবার দিকে রূপান্তরের সম্মুখীন হয় এবং বাজার অর্থনীতি তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় এই রূপান্তরের ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হয়।

বাস্তবে সঙ্কট উত্তরণের জন্য একটি বৃহদায়তন ব্যাংক উদ্ধার কর্মসূচির চেয়েও আরো অনেক বড় কিছুর প্রয়োজন ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল। ২০১০ সালের ডোড-ফ্রাঙ্ক আইনটি কিছুটা পথ এ ক্ষেত্রে পার করেছিল, যদিও আমাদের কাছে তা ব্যাংকের ক্ষতি নিবারণ করার জন্য যথেষ্ট মনে হয়নি। ব্যাংকগুলোর ছোটো বা মাঝারি আকারের উদ্যোগে ঋণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য এটি খুব সামান্যই ছিল।

তখন আরো বৃহত্তর পরিসরের সরকারি খরচ প্রয়োজন ছিল আর এ কারণে আরো সক্রিয় পুনঃবণ্টন এবং প্রাক-বণ্টন কর্মসূচি, শ্রমিকদের দুর্বল দরকষাকষি, বৃহৎ কর্পোরেশনের দ্বারা বাজার সংহতি ক্ষমতা দুর্বলকরণ এবং কর্পোরেট ও আর্থিক অপব্যবহার ইস্যুর নিষ্পত্তি করা দরকার ছিল। অনুরূপভাবে, সক্রিয় শ্রমবাজার এবং শিল্পনীতি নেয়ার প্রয়োজন ছিল যা সেসব অঞ্চলে শিল্পায়ন বিরোধী প্রবণতা রোধে সহায়তা করে।

এর বিপরীতে, নীতিনির্ধারকেরা দরিদ্র পরিবারগুলোকে তাদের বাড়িঘর হারানোর অবস্থা থেকে নিবৃত্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থনৈতিক ব্যর্থতার রাজনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে পূর্বাভাস এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। এটা স্পষ্ট ছিল যে, এটি এমন একটি ঝুঁকি ছিল যাতে যারা এত খারাপভাবে রোগের চিকিৎসা করেছিল তাদের একটি অসম্মানের পরিণতি হবে। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন নারীবিদ্বেষীর উত্থান ঘটেছে, যিনি দেশে ও বিদেশে আইনের শাসনকে ধ্বংস করছেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্য-বলা এবং গণমাধ্যমসহ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করার ব্যাপারে যে ঐতিহ্য ছিল তা সমালোচনার মুখে পড়ছে।
২০১৭ সালের ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত সময়ের রাজস্ব উদ্দীপক ব্যবস্থা (এবং যা অর্থনীতিতে আসলেই প্রয়োজন ছিল না) এক দশক আগে যখন বেকারত্ব বেশি ছিল তখন আরো শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতো। আসলে দুর্বল পুনরুদ্ধার ‘ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতার’ ফলাফল ছিল না; সমস্যা ছিল সরকারি নীতির অপর্যাপ্ততার।

এখানে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন উঠতে পারে : আগামী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার অতীতের মতো কি শক্তিশালী হবে? অবশ্যই, এটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন গতির উপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে গবেষণা এবং উন্নয়নে বিশেষ করে মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হবে যদিও এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত হ্রাস-ছাঁটাই ভালো কোনো উপায় নয়।
কিন্তু এর বাইরেও অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। গত এক দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ৫০ বছরে মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশ থাকলেও গত দশকে তা ০.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু সম্ভবত প্রবৃদ্ধির খুব বেশি প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করা যাবে বিশেষ করে যদি আমরা পরিবেশগত খরচ সম্পর্কে চিন্তা করি আর সেই প্রবৃদ্ধি নাগরিকদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য খুব বেশি উপকারে আসছে কিনা সেটি বিবেচনায় আনি।

২০০৮ সালের সঙ্কটের প্রতিক্রিয়া থেকে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জটি যেটি এখনো রয়ে গেছে, সেটি হলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নয় : এমন কিছুই নেই যা আমাদের অর্থনীতিকে এমনভাবে চালানোর জন্য বাধা দেয় যাতে সম্পূর্ণভাবে কর্মসংস্থান এবং সুষম সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষ স্থবিরতা আসলে কেবল ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতিমালার ব্যর্থতার জন্য একটি অজুহাত ছিল। যত দিন না, বিশেষত ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান সমর্থকগণের অধীন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থপরতা এবং নৈতিকতা আমাদের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করতে থাকবে তত দিন পর্যন্ত এই পরাশক্তি সঙ্কট অতিক্রম করতে পারবে না, আর কতিপয়ের পরিবর্তে বহুজনকে সেবা করার মতো ব্যবস্থা স্বপ্নই থেকে যাবে। এমনকি যদি জিডিপি বৃদ্ধি পায় তবুও বেশির ভাগ নাগরিকের আয় স্থিরই থাকবে।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী জোসেফ ই. স্টিগলিজ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের চিফ ইকোনমিস্ট। তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক বইটি হচ্ছে- গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকন্টেন্টস রিভিজিটেড : অ্যান্টি গ্লোবালাইজেশন ইন দ্যা এরা অব ট্রাম্প।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ : মাসুমুর রহমান খলিলী


আরো সংবাদ

স্ত্রীর পরকীয়া দেখতে এসে বোরকা পরা স্বামী আটক (১৬৩৩৪)ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ যেকোনো সময়? (১৫৮১৫)মেয়েদের যৌনতার ওষুধ প্রকাশ্যে বিক্রির অনুমোদন দিল মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি (১৫৪৭৯)মানুষ খুন করে মাগুর মাছকে খাওয়ানো স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেফতার (১৫২৩২)ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে প্রচণ্ড ইসরাইলি হামলা, নিহত ১১ (১৩৮১২)মাস্টার্স পাস করা শিক্ষকের চেয়ে ৮ম শ্রেণি পাস পিয়নের বেতন বেশি! (১১৪৪৩)৩০টি ইসরাইলি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত (৯৩৬২)একসাথে চার সন্তান, উৎসবের পিঠে উৎকণ্ঠা (৮২৮৫)করাত দিয়ে গলা কেটে স্বামীকে হত্যা করলেন স্ত্রী (৬০৭৯)শারীরিক অবস্থার অবনতি, কী কী রোগে আক্রান্ত এরশাদ! (৫৩৪৫)