২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে

এনআরসির মাধ্যমে আসাম থেকে বাংলাদেশী চিহ্নিত করে তাদের বিতাড়ন করা হবে : অমিত শাহ - ছবি : সংগ্রহ

ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি অমিত শাহ আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। আসামে বহুল আলোচিত এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জির উদ্দেশ্য স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি কলকাতায় বিজেপির এক সমাবেশে বলেছেন এনআরসি তৈরি হবেই, এটা দেশের স্বার্থে জরুরি। এনআরসির মাধ্যমে আসাম থেকে বাংলাদেশী চিহ্নিত করে তাদের বিতাড়ন করা হবে। তিনি আরো বলেন, পশ্চিমবঙ্গেও অনুরূপভাবে বাংলাদেশী তাড়ানোর জন্য এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হবে।

এই বক্তৃতায় তিনি আবার মহানুবভতা দেখাতে ভুল করেননি। তিনি বলেছেন বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে যে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান শরণার্থীরা ভারতে এসেছেন তাদের কোনো চিন্তার কারণ নেই। কেননা, তাদের ভারত সরকার নাগরিকত্ব দেবে। অমিত শাহ আরেকটি বিকল্পের কথা বলতে ভুলে গেছেন। ২০১৪ সাল থেকে ভারতে একটি নতুন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে তা হলো- ‘ঘর ওয়াপসি’। অর্থাৎ, বিভিন্ন সময়ে যারা হিন্দু ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে বিশেষ করে মুসলমান হয়েছিলেন, তাদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার কর্মসূচির নামকরণ করা হয়েছে ‘ঘর ওয়াপসি’। এই কর্মসূচির নেতৃত্বে রয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ। তিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে রয়েছেন।

অমিত শাহের এনআরসি বহির্ভূত মুসলমানদের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়ানোর বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, শরণার্থীর নামে আসলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ভারত থেকে তাড়াতে চাইছে বিজেপি। গো-সংরক্ষণের নামে সমাবেশে অমিত শাহ আরো বলেন, বাংলায় আগামী দিনে কী পরিবর্তন হবে তা এই জমায়েত দেখলে বোঝা যায়। আগামী দিনে বাংলাতেও এনআরসি করা হবে এবং বাংলা থেকেও বাংলাদেশী মুসলমানদের বের করে দেয়া হবে। তিনি এই সভায় আরো বলেন- যতদিন না বাংলায় বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, ততদিন বিজেপির ভারত জয় পরিপূর্ণতা পাবে না। অমিত শাহ ভারত জয় করার কথা বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা গবেষণার বিষয়। অবশ্য তিনি যদি ভারতের হাজার বছরের লালিত নীতি ‘নানত্ববাদ’ ধ্বংস করার কথা বুঝিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে বিগত ভারতীয় ইতিহাসের দৃষ্টান্ত অনুযায়ী তিনি চরমভাবে ব্যর্থ হবেন। আসামের এনআরসি ঘোষিত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ভারতের ঐক্য, মর্যাদা এবং হাজার বছরের লালিত নানত্ববাদের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি ইতিহাসে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে থাকবেন।

স্বাধীন ভারতের যারা রূপকার ছিলেন, ব্রিটিশ সরকারের অকথ্য নির্যাতন, জেল, জুলুম সহ্য করেছেন, তারা স্বাধীন ভারতে বসবাসকারী সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ নিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং সেভাবে দেশের সংবিধানে ধর্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সব নাগরিকত্বের আইনগতভাবে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। ধর্ম-বর্ণভিত্তিক বৈষম্য শাসকতন্ত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের দৌরাত্ম্য এমন ভয়ানক আকার ধারণ করেছে, যা মানবাধিকারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ‘ধর্মজাগরণ সমিতি’ নামে এক সংগঠন ঘোষণা দিয়েছে যে, ২০২১ সালের মধ্যেই ভারত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এই সব ভুঁইফোড় সংগঠনগুলো জাতীয়বাদকে সাম্প্রদায়িকতার সাথে এক করে ফেলেছে। এই সব সংগঠন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে- মুসলমান ও খ্রিষ্টানেরা ভারতে থাকতে চাইলে হিন্দু হিসেবে থাকবে, না হয় ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে।

ভারত দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ৭১ বছর পর এবং পূর্ব পাকিস্তান বিলুপ্ত হয়ে বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছর পর, সম্প্রতি আসামে যে এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) তৈরি হয়েছে, তাতে আসামে ৪০ লাখ লোক ভারতের নাগরিক হিসেবে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন। আসামের অতীত শাসক কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই অভিযোগ ছিল যে, তারা ভোট ব্যাংক বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ থেকে আসামে অনুপ্রবেশকে সবসময় উৎসাহিত করেছে। এই ইস্যু নিয়ে ‘নিখিল আসাম ছাত্র ইউনিয়ন দীর্ঘ ছয় বছর সংগ্রাম করেছে, অবশেষে ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর প্রধান মন্ত্রিত্বকালে ভারত সরকার এবং আসাম ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যে চুক্তি অনুসারে সিদ্ধান্ত হয় যে ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চের পর যারা আসাম প্রবেশ করেছে তাদের আগমন বে-আইনি বলে ঘোষণা করা হবে এবং এই মর্মে ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইন সংশোধন করা হয়।

ওই সংশোধনীতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পরে আসামে প্রবেশকারীকে বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করার সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ রয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অতীতের এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আসাম সরকারকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সুপ্রিম কোর্র্টের তত্ত্বাবধানে এনআরসি প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। এই এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি থেকে ৪০ লাখ বর্তমান অধিবাসী বাদ পড়ে যায় তাদের বেশির ভাগই মুসলমান এবং যারা যুগ যুগ ধরে আসামে বসবাস করেছেন এবং ভোটার হিসেবে ভোটাধিকারও বারবার প্রয়োগ করেছেন। এখন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বক্তব্য হলো- এই এনআরসি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে করা হয়েছে, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত করা হবে। এ ব্যাপারে কোনো বিকল্প আছে বলে তারা মনে করেন না।

২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, এ বাংলাদেশীদের তল্পিতল্পা নিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে। এখানে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হলো- ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের রায়েও এসব বে-আইনি অনুপ্রবেশকারীদের ‘বাংলাদেশী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত কিভাবে সুরক্ষা করা যায়, সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এনআরসি প্রকাশের পর থেকে বিজেপি ও তাদের অনুগত মিডিয়া এই ইস্যু নিয়ে প্রচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের এক শ্রেণীর মিডিয়া এখনই বাংলাদেশের সাথে ব্যাপারে আলোচনার জন্য ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এমনো হতে পারে, ভারত সরকারের ইঙ্গিতেই মিডিয়ায় এসব লেখা হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশের সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের তরফ থেকে কোনো আলোচনা করা হয়নি। কংগ্রেস নেতা শশী তারুর বলেন, In fact, it has been suggested that principle of reviving the N.R.C. process has been to strip as many Bengali Muslims as possible of the right to vote ahead of next general election. অর্থাৎ, এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু করার পেছনে আসল কারণ হলো- আগামী সাধারণ নির্বাচনে যত বেশি সংখ্যক মুসলমানকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় তার একটি প্রক্রিয়া।

৩০ জুলাই এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছিলেন, আসামের অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে বাংলাদেশের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের রাষ্ট্রদূতের বিবৃতির পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছিলেন, এনআরসি নিয়ে কেউ কেউ রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন। এটা নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। এত বড় ইস্যুর ওপর মন্ত্রীর বক্তব্য আরো সুচিন্তিত এবং গুরুগম্ভীর আশা করে দেশের মানুষ।

ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আসামের এই তথাকথিত রাষ্ট্রহীন অনুপ্রবেশকারীদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং বাংলাদেশে এদের পাঠানোর ব্যাপারে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আসাম-সরকারের মন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বাস শরমা বলেছেন, এনআরসিতে যাদের নাম থাকবে না তাদের বাংলাদেশেই পাঠাতে হবে। জাতিসঙ্ঘের মানবিক অধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হেমন্ত বিশ্বাসের এই বক্তব্য সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাছে জানতে চেয়েছেন। গুরুত্বপূূর্ণ ব্যাপার হলো- ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই সব অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করার জন্য ভারত সরকারকে নিদের্শনা দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, যাদের অনুপ্রবেশকারী বলে ভারত থেকে তাড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তা সত্য হিসেবে ধরে নিলেও তারা গত সাড়ে চার দশক ধরে আসামে নিজস্ব বাড়ি নিয়ে বসবাস করে আসছেন এবং ভারতীয় নাগরিক হিসেবে এই সময়ে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; তাতে তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এখন যদি তাদের অনুপ্রবেশকারী বলে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়, তা বাস্তবায়ন করা কি ভারতের পক্ষে এত সহজ হবে? এই অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত নিতে হলে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি নির্বাসন (Deportation) চুক্তি করতে হবে। সে সময় বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক না কেন, সে সরকার ভারতের সাথে ওইরকম একটি চুক্তি করার সাহস সঞ্চয় করতে পারবে কি?

৪০ লাখ লোক ক্যাম্পে দুর্বিষহ জীবনযাপন করবে, আর বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো চুপ করে বসে থাকবে? এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ভারত বিশ^দরবারে যে হেনস্তা হবে তা বিজেপি এবং আরএসএসের মতো সংগঠনগুলো না বুঝলেও ভারতে এর পরিণতি বুঝার মতো যথেষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন রয়েছে। বহুত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টারা সারা বিশে^ নন্দিত এবং প্রশংসিত, যে শাসনতন্ত্র রচনা করেছেন তা ভারতে এখনো বলবৎ রয়েছে। কার কোন পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ভারতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা একমাত্র বিধাতাই বলতে পারবেন। বর্তমানে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সাথে ভারতের শীতল সম্পর্ক চলছে, বাংলাদেশের সাথেও যদি সম্পর্কের শীতলতার শুরু হয়, তা কি ভারতের জন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবে ? নাগরিকপঞ্জির নামে আসামের সংখ্যালঘু বাঙালি বিশেষত, মুসলমানদের উইচ হান্টিয়ের স্বীকার হতে হবে বলে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা। খসড়া এই তালিকা ঘিরে ভারতে উত্তরপূর্ব এই রাজ্যটিতে সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও করা হচ্ছে।
shahabuddinkhaled47@gmail.com


আরো সংবাদ