২০ নভেম্বর ২০১৮

গণতন্ত্রের দুর্গতি ও জাতির ভবিষ্যৎ

গণতন্ত্রের দুর্গতি ও জাতির ভবিষ্যৎ - ফাইল ছবি

সন্তান-সন্ততি বা প্রজন্ম নিয়ে ভাবনা মানুষমাত্রই চিরায়ত। এটা যে মানুষের স্বভাবজাত তা কবি ভরতচন্দ্র রায় ‘অন্নদার ভবানন্দ ভবনে যাত্রা’ কবিতায় সার্থকভাবেই উপস্থাপন করেছেন। কবি তার কবিতায় ঈশ^রী পাটুনী ও অন্নপূর্ণা দেবীর সংলাপের মধ্য দিয়ে যে সত্য বের করে এনেছেন তা মানুষের চিরায়ত স্বভাব বলেই স্বীকৃত।

কবির ভাষায়, ‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে/আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। আশীর্বাদ কামনার উদ্দেশ্য ছিল আগামী প্রজন্ম। কবি প্রজন্মের জন্য চেয়েছিলেন এক সচ্ছল, শান্তিময় ও সমৃদ্ধ জীবন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এহেন প্রজন্মভাবনা আমাদের তাড়িত করেনি। কবি উত্তরসূরিদের জন্য যে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন চেয়েছিলেন, সে স্বপ্ন আমাদের প্রভাবিত করতে পারেনি।

মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো নিজের জীবন। তার পরেই প্রজন্ম বা সন্তান-সন্ততির স্থান। এর পরেই আসে অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা। মানুষের ইহজাগতিক স্বপ্নই হলো নতুনদের জন্য স্বস্তিদায়ক শান্তির আবাস এবং সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যও তার ‘ছাড়পত্র’ কাব্যে তা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আমরা বোধহয় এসব আপ্তবাক্য বেমালুম ভুলে যেতে বসেছি। অবক্ষয় ও স্বার্থপূজা আমাদের একেবারে নামিয়ে দিয়েছে। প্রজন্মভাবনার চেয়ে আত্মকেন্দ্রিকতা পেয়ে বসেছে।

বৈষয়িক সমৃদ্ধকরণের অনাকাক্সিক্ষত প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ছন্দপতন ঘটেছে। ফলে আমাদের দৃষ্টির পরিসর বিস্তৃত হতে পারছে না। তাই নতুনদের জন্য কল্যাণকর দিকনির্দেশনা ও বার্তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরং তাদের আত্মোন্মাদ, অভব্য, বিলাসপ্রবণ, কলহপ্রিয়, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও আত্মপরিচয়হীনতার দিকেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দেশের নেতিবাচক রাজনীতির কারণে আমরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধ হারাতে বসেছি। ময়দানের রাজনীতিকে তো অনেক আগেই অর্ধচন্দ্র দেয়া হয়েছে। এখন চলছে ‘দাফন-কাফনের আয়োজন’। রাজনীতি যদি বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে পরিণতি কী হতে পারে তা আমরা একবারও ভেবে দেখছি না। এর পরিণতি যে কারো জন্য শুভ হবে না এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

আমাদের দেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের উপর্যুপরি ব্যর্থতায় তা পরিশীলিত হওয়া দূরের কথা, বরং দেশের গণতন্ত্র ও মূল্যবোধের শ্বাস-প্রশ্বাস আজো নির্বিঘ্ন হয়নি। দেশে উদার গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণেই আত্মতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র ও জুলুমতন্ত্র শূন্যস্থান দখল করেছে। ফলে নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে একটা নেতিবাচক বার্তাই পাচ্ছে। বাংলাদেশে যে ধরনের গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে তার প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল ও গণহারে জালভোট দিয়ে ফলাফলকে প্রভাবিত করা। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো জনগণকে সে বার্তাই দিয়েছে। তা কোনো সভ্য সমাজের জন্য সুখবর নয়।

আজকের শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমরা তাদের জন্য এমন কিছু করে যেতে পারছি না যাতে তারা নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আজকের শিশুদের সুনাগরিক বানাতে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করে তাদের পথচলাকে নির্বিঘœ করতে না পারলে মহান স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবেও আমাদের পরিচয় অনুজ্জ্বল হয়ে পড়বে। তা আমাদের জন্য আত্মঘাতী হলেও এ বিষয়ে আমরা আজো উদাসীন।

কিশোর কবি সুকান্ত নতুন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে পৃথিবী হবে নতুন প্রজন্মের জন্য সুন্দর, সমৃদ্ধ ও জঞ্জালমুক্ত। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যে তার সাহসী উচ্চারণ ‘বিশ্বকে এ-শিশুর বসবাসযোগ্য করে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’। কবি শিশুদের জন্য একটি অনুকূল আবাসের স্বপ্ন দেখালেও তার জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। আমরাও তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুধু উদাসীনই থাকিনি বরং এ ক্ষেত্রে আমাদের যাত্রা বিপরীতমুখী। মূলত আত্মপূজা, দায়িত্ববোধের অভাব ও উদাসীনতার কারণেই পৃথিবীটা জ্বলন্ত উনুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। কবি পৃথিবীকে জঞ্জালমুক্ত করার ঘোষণা দিলেও পৃথিবীটা ক্রমেই কর্দমাক্ত ও জঞ্জালযুক্তই হচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বার্থদুষ্ট রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। আদর্শ ও লক্ষ্যহীন রাজনীতি আমাদের এক ভয়াবহ গন্তব্যের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

যারা আগামী দিনে আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে তাদের পরিচর্যাটা আমরা যথাযথভাবে করছিই না বরং আমাদের অদূরদর্শিতাও স্বার্থান্ধতার কারণেই তাদের জীবনীশক্তি ও সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে। আমরা আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি না। বরং নিজেদের জীবনটাকে কিভাবে ‘কানায় কানায় উপভোগ’ করা যায় সে অনৈতিক ভাবনাই আমাদের সব সময় তাড়া করছে। ফলে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি অবিরাম সঙ্ঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর এই সঙ্ঘাতটা তীব্রতর হবে বলেই মনে হচ্ছে।

স্বাধীনতার জন্য আমাদের চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। কিন্তু এর ফসলটা আমরা অর্ধশতকেও পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। আমাদের একটি সংবিধান ও প্রতিষ্ঠিত সরকারও আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারসহ জানমালের ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নাগরিকেরা রাষ্ট্রের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারছে না মোটেও। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মহোৎসব চললেও উদ্বেগ প্রকাশ করার অধিকারটুকুও নাগরিকেরা পাচ্ছে না। মানুষের উৎকণ্ঠা ও আহাজারিকে গুজব বলা হচ্ছে। আর কথিত গুজবের ‘প্রতিবিধান’ও করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় জবরদস্তি দিয়ে।

একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে খুন-গুম ও অপহরণ মোটেই স্বাভাবিক নয়। দেশে এ ধরনের অপরাধ হলে তা প্রতিবিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এ দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ব্যাপক। এমনকি এসব ঘটনার পক্ষে নির্লজ্জভাবে সাফাই গাইতেও শোনা গেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ভোটাধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও তারা এ বিষয়ে বেশ উদাসীন ও আত্মতৃপ্ত। আর জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে যখন খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করেন তখন দেশে কী ধরনের গণতন্ত্র চালু আছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তার পরও সরকার দাবি করছে দেশে গণতন্ত্র এবং জনগণের স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের নিশ্চয়তা আছে। গণতন্ত্রের নামে গণমানুষের সাথে এমন প্রহসন কোনো দেশে আছে বলে জানা যায় না।

ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা বেশ আগেই শুরু হয়েছে, এখনো তা অব্যাহত আছে। আর তা কত দিন চালু থাকবে, কে জানে। এসব ঘটনাকে বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টার হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলে আসছে। তা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না। মূলত এসব বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়।

যে অবস্থা চলছে তা একদলীয় ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রই। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাকেও স্বাভাবিকভাবে নেয়া হচ্ছে না; বরং ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রদ্রোহিতা আখ্যা দিয়ে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। আবার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নির্বিঘেœ আদালতের যাওয়ার সুযোগও পাওয়া যায় না। বিরোধী দলগুলো বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, সরকার ভিন্ন মতের লোকদের গ্রেফতার-নির্যাতনসহ কারারুদ্ধ করে রাখছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার কথা না থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ বেশ যুক্তিসঙ্গত ও জোরালো। সরকার এসবকে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার হিসেবে আখ্যা দিলেও তার বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণে উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। ফলে হাওয়া থেকে পাওয়া গুজবগুলোও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে বলপ্রয়োগকেই বেছে নিয়েছে। তারা জনমতকে তোয়াক্কা করছে না। সব কিছুই করা হয় খেয়ালখুশি মতো। এই অন্যায় প্রবণতা শুরু হয়েছে বেশ আগে। রাষ্ট্রাচারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই খেয়ালখুশি বা বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই। সব দেশে প্রচলিত আইন বা শাসনতন্ত্র অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অভিযোগ আছে যে, সরকার বিরোধী মতকে দমন করার জন্য যখন যে আইন প্রয়োজন, তাই পাস করা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তা নিজেদের জন্যই গলার কাঁটা হতে পারে। এটাই হয়েছিল জননিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রে।

দেশে খুন-গুম ও হত্যার বিস্তৃতি ঘটেছে। সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। এমনকি বিদেশী কূটনীতিকেরাও আমাদের দেশে আর নিরাপদ বোধ করছেন না। রাজধানীতে বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। মার্কিন সরকার এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্টদূতকে ডেকে নিয়ে ভর্ৎসনাসহ তাকে বহিষ্কারের হুমকি দেয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু আমাদের সরকার রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এটা বহির্বিশ্বে দেশকে আস্থার সঙ্কটে ফেলেছে। কিন্তু সরকারের গায়ে হাওয়া লেগেছে বলে মনে হয় না।

দেশে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা সেন্ট অগাস্টিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তার মতে, ‘রাষ্ট্র হলো মানুষের আদি পাপের ফলশ্রুতি। রাষ্ট্রীয় জীবনের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হলে মানুষ আবার স্বর্গরাজ্যের যোগ্য হয়ে ওঠে।’ আমরা পাপের প্রায়শ্চিত্তও করছি কি না তা নিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। সেন্ট টমাস এক্যুইনাস অ্যারিস্টটলের সাথে একমত হয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র একটি প্রাকৃতিক সংস্থা এবং কল্যাণ সাধনের এক বিশিষ্ট সংস্থা। সুন্দর ও সৎ জীবনের জন্য সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এক উজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি মনে করেন, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র্র আইন প্রণয়ন করবে। মনীষীদের এসব আপ্তবাক্য শুধু কেতাবেই শোভা পাচ্ছে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আমাদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও উদাসীনতার কারণেই নতুন প্রজন্ম ভুল বার্তা পাচ্ছে, তাদের পথ চলাও সমস্যাসঙ্কুল হয়ে পড়ছে। 
smmjoy@gmail.com


আরো সংবাদ