১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অভিভাবকেরা আজ কোন পর্যায়ে?

-

১৯৭৪ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা পেশায় আসি। এর আগে ১৯৬৮ সাল থেকে বেশির ভাগ সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক গবেষণাধর্মী কাজে নিয়োজিত ছিলাম। মাঝে কয়েক দিন সাংবাদিকতা করেছি। এরপর ঢাকার তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে প্রায় এক দশক শিক্ষকতার পর ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ অবধি করটিয়া সা’দত সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছি। এরপরও মফস্বলের কয়েকটি কলেজে যেমন- কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ও চাঁদপুর কলেজে শিক্ষকতা এবং অল্প ক’দিন কুমিল্লা মহিলা কলেজে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছি।

এসব কলেজের মধ্যে তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পরীক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে দেখেছি। আর কুমিল্লা মহিলা কলেজে মাত্র ১৬ দিন ছিলাম এবং কোনো পরীক্ষা ফেস করতে হয়নি। এসবের মধ্যে সা’দত কলেজের পৌনে আট বছর সময়কালে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা কেমন হতো, সে বিষয়ে আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করতে চাই। মন্তব্যগুলো ঢালাওভাবে নেয়া হয়তো ঠিক হবে না। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই কিছু ছিল এবং এখনো আছে। তবে সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এত দূর বলা হয়তো ভুল হবে না- ‘যেমন বীজ তেমন ফল।’ সে সময়ে শুধু সা’দত কলেজেই নয়, দেশের কম-বেশি প্রায় সব কলেজে একই ধরনের পরীক্ষা হতো। মফস্বলে সমস্যা প্রকট ছিল এবং আজো আছে। তাই ‘বীজের সন্ধান’ই আমার এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। এ কথা বলছি এ কারণে যে, আজ শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে যে ধরনের ন্যক্কারজনক পরীক্ষা হচ্ছে, তার বীজ কিন্তু স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই উপ্ত হয়েছিল।

দেশে তখন এরশাদের মার্শাল ল চলছে। সা’দত কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমরা পাঁচজন শিক্ষক দোতলার একটি কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছি। এদের মধ্যে আমি বয়োকনিষ্ঠ। একপর্যায়ে কক্ষের পেছনের দিকে দেখলাম, সাদাপেড়ে মিশকালো মিহি সুতির আনকোরা শাড়ি পরা এক প্রিয়দর্শিনী তরুণী খাতার নিচে রাখা কাগজ দেখে লিখছে। আমি এগিয়ে গিয়ে তার কাগজটি নিয়ে এলাম আর বললাম, সে যেন আর এমনটি না করে। কিন্তু সে থামল না। এবার গিয়ে আমি তাকে বললাম- ‘তোমার কাছে যা কাগজ আছে, দিয়ে দাও।’

সে তার হাতের কাগজটি আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘আর নেই স্যার।’ আগের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাকে বিশ্বাস করিনি। বললাম- ‘আরো যা লুকানো আছে, তাও দাও।’ সে তার শাড়ির পরিপাটি ভাঁজ থেকে আরো ক’টি কাগজ বের করে দিলো। আমি চলে এলাম। এমন সময় সামরিক পোশাকে টাঙ্গাইলের ডিস্ট্রিক্ট মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (ডিএমএলএ) এসে কারো অনুমতি না নিয়েই কক্ষে প্রবেশ করলেন। তিনি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে এসেছেন। কক্ষে প্রবেশ করে তিনি সোজা ওই মেয়েটির পাশে এসে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ করলেন। মনে হলো, মেয়েটি তার কেউ হবে। এরপর কোনো দিকে না তাকিয়ে যেমন এসেছিলেন তেমনি চলে গেলেন। লক্ষ করলাম, তিনি প্রবেশ করেছেন পাশের কক্ষে।

মেয়েটি আবার কাগজ বের করে লিখতে থাকে। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে বললাম- ‘এ কলেজে মহিলা শিক্ষক আছেন। তুমি যদি স্বেচ্ছায় তোমার সব কাগজ আমার হাতে না দাও, তাকে ডেকে তোমার বডি সার্চ করাব।’ সে তার শাড়ির গোপন পরিপাটি ভাঁজে সেফটিপিনে আঁটা আর শাড়ির নিচে ব্লাউজে আঁটা কাগজগুলো আমার হাতে দিয়ে দেয়। আমি যখন এ কাজে গলদঘর্ম তখন আমার অপর চার সহকর্মী লেকচার স্ট্যান্ডের পাশে জড়ো হয়ে উচ্চস্বরে গল্পগুজব করছেন। একপর্যায়ে শুনতে পেলাম তাদের একজন বলছেন- ‘খালেদ সাহেব বাড়াবাড়ি করেন।’

শিক্ষক হিসেবে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ করা কি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে? সে সময়ে এ কলেজে নকলের দায়ে কোনো পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার রেওয়াজ ছিল না। এক সময় কক্ষের মাঝখানের দরজায় বারান্দার ফ্লোরে ভারী আওয়াজ শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি দু’জন সিপাই রাইফেলের বাঁট দিয়ে ফ্লোরে আঘাত করে সটান দাঁড়িয়ে আছে। এরা আমাকে স্যালুট দিলো না ধমক দিলো, বুঝলাম না। দেখলাম, অল্পক্ষণের মধ্যেই ডিএমএলএ সাহেব বারান্দা দিয়ে চলে গেলেন। সাথে সাথে সিপাই দু’জনও। মেয়েটির সেদিন আর পরীক্ষা দেয়া হয়নি। কলম তুলে বসে রইল।

সেটা সম্ভবত ১৯৮৫ সাল। তখন যদি মেয়েটির বয়স ২০-২২ হয়ে থাকে, তবে আজ সে ৫৩-৫৫ বছর বয়সের মহিলা। এই একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই, সে সময়ের শিক্ষার্থীরা আজকের শিক্ষার্থীদের মা-বাবা এবং জাতীয় জীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে শামিল হয়েছে। পাঠক, ভেবে দেখুন, তাদের ছেলেমেয়েরা আজ নকল বা প্রশ্নপত্র ফাঁস- এসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হবে না কেন? এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের অভিভাবকদের কাছ থেকে পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবনে আমরা দায়িত্বশীল এবং নৈতিক আচরণ বা দক্ষতা কী করে আশা করতে পারি? যে কাজেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়, তারা ঘুষ খান, তহবিল তসরুফ করেন এবং নানাবিধ অপকর্ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এমন অভিভাবকেরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহে টাকা ঢেলে সন্তানদের উৎসাহিত করাই স্বাভাবিক? এ কারণেই বুঝি প্রতিদিনের জাতীয় দৈনিকের পাতাগুলো হরেকরকম দুঃসংবাদে ঠাসা। আমড়াগাছে কি আম ধরে? তাই যাবতীয় পরীক্ষায় বা জাতীয় জীবনে অশুভ যা ঘটছে, তার উৎস সন্ধানের জন্য বীজের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা জরুরি।

জাতীয় জীবনে আমাদের শুরুটা ভালো ছিল না। বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে গিয়ে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. মাযহারুল হক তার জীবনের সর্বশেষ ভাষণে সমাজের ক্ষতগুলো পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, আরেকটা মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, শিক্ষাব্যবস্থার চরম দুর্গতি। এ দুই বছরে ছাত্র প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নানা জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন ও সমাবেশে কোটি টাকার ওপর খরচ করেছে বলে আমার ধারণা এবং এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে যা ঘটেছে, তা দেখে আমার দৃঢ় ধারণা হচ্ছে যেÑ ছাত্র ও শিক্ষার সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটেছে। এর প্রতিকার কী?

অথচ আমরা প্রতিদিন শুনছি, আমাদের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে হবে। কারা গড়বে বলুন? সোনার বাংলা নিশ্চয়ই গড়া হয়েছে কিছু সংখ্যক লোকের জন্য (পলিটিক্যাল ইকোনমি, ১৯৭৪, ভলিউম ১, সংখ্যা ১, পৃষ্ঠা ৫-৬)। তারা আজ শিক্ষাব্যবস্থা ও জাতির বারোটা বাজিয়েছেন। আজ দেশের শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের ওপরের লেভেলে কাজের জন্য দেশের ভেতর থেকে উপযুক্ত ও দক্ষ জনশক্তি তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। সেসব লেভেলে বিদেশীরা কাজ করছেন। এ কারণে কেবল ভারতীয়রাই বছরে ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। অন্য দেশীয়রা তো আছেনই।

শিক্ষাক্ষেত্রে এ দেশে আজ যা ঘটছে তা নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে যার সূত্রপাত ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতা চলছে মাত্র। সে সময়ে একমাত্র ভারত ছাড়া পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি করা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের। পাশ্চাত্য সে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও সেই পাপের কাফফারা আমরা আজো দিচ্ছি। আরো কত কাল তা দিয়ে যেতে হবে জানি না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা, যাদের অনেকেই হয়তো সে ধরনের ছাত্রছাত্রী ছিলেন, তারা কেবল পরীক্ষার রেজাল্ট দেখেই খুশি; আর কিছুই তারা দেখেন না। এ শিক্ষার্থীরা কোনো কাজে লাগে না।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেমন অভিভাবক তাদের তেমন সন্তানরা পরীক্ষা দিচ্ছে- যেমন বীজ, তেমন ফল হচ্ছে। বিভিন্ন কলেজে আমার দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এর জন্য আমরা বিভিন্ন লেভেলের শিক্ষকরাও কম দায়ী নই। তাই মনে হয়, শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা আজ আর কোনো খবরই নয়। তাই বুঝি, এসব খবর আজকাল পত্রিকার শেষের পাতায় গুরুত্বহীনভাবে মুদ্রিত হয় (দেখুন নয়া দিগন্ত, ৪ মে ২০১৮, পৃষ্ঠা ১৬, কলাম ৫ ও পৃষ্ঠা ১৫, কলাম ৬)।

দেশের অবস্থা এমনই নাজুক যে, একটা সমস্যা না কাটতেই নতুন আরেকটার উদ্ভব ঘটছে। সরকার আগেরটার বিহিত না করেই নতুনটা নিয়ে লেগে পড়ে। এসব অনাসৃষ্টি উপর্যুপরি ঘটছেই। যেমন- ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনের উদ্ভব। দেশের অবস্থা কোন পর্যায়ে গেলে পুলিশের কাজ স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের করে দেখাতে হয়? স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা আজ আর প্রশাসনকে আস্থায় রাখতে পারছে না।

অথচ অকেজো ও ব্যর্থ প্রশাসন ছাত্রছাত্রীদের ওপর চড়াও হয়েছে। একটুও ভেবে দেখছে না, সমস্যার স্তূপ কতটা স্ফীত ও জটিল হয়ে উঠছে। এ ছাড়াও আছে কিশোর-তরুণদের মাদকের প্রতি আসক্তি। সমস্যা বেড়েই চলেছে, কিন্তু কোনো সমাধান নেই। প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার তার ভাঙা রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে। হাজার হাজার মাইল দূরের বিশ্বের উন্নত এক দেশ, ফ্রান্স থেকে দরিদ্র দেশের তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কিনে আরেক উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের লঞ্চিং প্যাড থেকে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে ঢাকায় বসে বগল বাজিয়ে দেশের সমস্যা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে। এ উপগ্রহ দেশে নির্মিত হলে একটা কথা ছিল। দেশের বেশির ভাগ স্কুল-কলেজে বিজ্ঞানাগার না থাকলেও, সে দিকে সরকারের ভ্রুক্ষেপ নেই। পায়ের সামনের খাদ উপেক্ষা করে আকাশের দিকে চোখ রেখে হাঁটলে একদিন খাদেই পড়তে হবে। এর জন্য জনগণ অবশ্যই সরকারকে দায়ী করবে। কারণ, তাদের হাতেই যাবতীয় কলকাঠি।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার


আরো সংবাদ