২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশ কি ‘আসামের আসামি’?

বাংলাদেশ কি ‘আসামের আসামি’? - ছবি : সংগ্রহ

ভারতের আসাম রাজ্যে তৈরি হয়ে গেছে রোহিঙ্গা সঙ্কটের মতো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও সঙ্কট সৃষ্টির সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট। ভারত সরকার ৩০ জুলাই দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের (এনআরসি) তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে নাম নেই সেখানকার প্রায় ৪০ লাখ অধিবাসীর। এই মানুষেরা নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে। যেসব ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছেন, কেবল তাদেরই এ তালিকায় রাখা হয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার পর লাখো মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তাদের অনেকে আসামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে দেয়। স্থানীয় অধিবাসীদের আন্দোলন-বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী স্বাক্ষরিত ‘আসাম চুক্তি’ অনুযায়ী, এ রাজ্যে থাকা যে ব্যক্তিরা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামের যাওয়ার বিষয় প্রমাণে ব্যর্থ হবে, তাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হবে। তাদের বৈধ নাগরিক বলেও ধরা হবে না। তাদের বিদেশী নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে।

ভারত সরকারের দাবি, ’৭১-এ স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ আসামে চলে এসেছে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর স্বদেশে ফিরে যায়নি। তাদের আলাদা করতেই বাকি এই নাগরিকপঞ্জি। এ পঞ্জিতে বরাক এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালিদের নাম কম উঠছে। ফলে তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিমদের মধ্যেও নাম বাদ পড়ার তীব্র আশঙ্কা। গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে ডি-ভোটার (ডাউটফুল ভোটার) এবং তাদের বংশধরদের নামও তালিকার বাইরে রাখা হচ্ছে। ১৯৫১ সালের পর এবারই প্রথম তৈরি হলো খসড়া তালিকা।

যা হোক, প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে জানা গেছে, তিন কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৪ জন এনআরসিতে আবেদন করেছিল। তাদের মধ্যে দুই কোটি ৮৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭৭ জনের নাম তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাদ পড়েছে ৪০ লাখ সাত হাজার ৭০৭ জনের নাম।

আসামের পর পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেনস) চালুর হুমকি দিয়েছে বিজেপি। এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, তারা ক্ষমতায় এলে আসামের মতো এনআরসি চালু করবেন। পশ্চিমবঙ্গে থাকা এক কোটি ১০ লাখ বাংলাদেশী নাগরিককে দেশ থেকে তাড়াবেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আমাদের গ্রামের একটা পাড়ায় বেশির ভাগ মানুষ ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে এবং স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভারত-বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক হানাহানির কারণে ভারত থেকে এ দেশে হিন্দুদের সাথে ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, জমি ও সম্পত্তি বিনিময় করে এসেছে। একই কারণে এ দেশ থেকে অনেক হিন্দু সম্পত্তি বিনিময় করে ভারতে চলে গেছে। এমন ঘটনা বাংলাদেশের সর্বত্রই ঘটেছে। এ অবস্থায় ভারত সরকার যদি বাংলাদেশ থেকে বিনিময় করে ভারতে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয় তবে তা অত্যন্ত অযৌক্তিক। এর পাল্টা পদক্ষেপ স্বরূপ বাংলাদেশ যদি ভারত থেকে আসা লোকদের ফিরিয়ে দেয় তবে কী মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, ভাবা যায়? তাই ভারতের উচিত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর গুরুত্ব দিয়ে, অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে স্থানান্তরিত মানুষদের নাগরিকত্ব প্রদান করে ভারতীয় বলে স্বীকৃতি দেয়া। আর অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশী যদি ভারতে অবস্থান করে, তাদেরকে ফেরত পাঠালে বাংলাদেশ সাদরে গ্রহণ করবে। বাংলাদেশে যেসব ভারতীয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে ‘অর্থ পাচার’ করছে তাদের ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

আসামে বসবাসরত বাঙালি অধিকার কর্মীদের মতে, ‘এনআরসি’ আসলে বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না। তারা (হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও অসমীয় কট্টরপন্থীরা) প্রকাশ্যে মুসলমানদের হুমকি দিচ্ছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে এখানে তাই ঘটতে পারে। বর্তমান সরকার ব্যস্ত থাকার কারণে আসামের পরিস্থিতি নিয়ে দৃশ্যত চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অবশ্য এর পেছনে কূটনৈতিক কৌশল ও রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, আসাম রাজ্যসরকার কেন্দ্রীয় সরকারের ইন্ধনে ৪০ লাখ মানুষকে উদ্বাস্তু করে দিয়েছে। যা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, জঙ্গিবাদকে উসকে দেবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী নীতির কারণে যেমন বহু শিশু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, একইভাবে আসামেও বহু পরিবার ভেগেছে। এ রাজ্যে নাগরিক পঞ্জিকরণ তালিকা প্রকাশের পর হঠাৎ লাখো মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছে। ভারতীয় নাগরিকত্ব না থাকায় রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কিংবা নিজেদের সম্পদের অধিকার হারাবে। যে সময় জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা রাষ্ট্রহীনতা অবসানের চেষ্টা চালাচ্ছে, সেই সময় ভারতে এমন ঘটনা বড় ধরনের কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের সমস্যা জর্জরিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার ওপর রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘ট্রাবলড পেরিফেরি’ এর লেখক সুবীর ভৌমিকের মতে, এটি পুরোপুরি জগাখিচুড়ি অবস্থা। (বিবিসি)

ভারত সরকার সরাসরি দাবি করছে, অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের শনাক্ত করতে এ তালিকা করা প্রয়োজন। কিন্তু ভারত বেমালুম ভুলে যাচ্ছে, ভারতীয় উপমহাদেশের সব নাগরিক ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পূর্ববর্তী সময়ে ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের একক নাগরিক ছিল।

বারবার দেশ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্ব লাভের একমাত্র উপায় হওয়া উচিত- কে কোথায় দীর্ঘদিন বসবাস করছে এবং জন্মগ্রহণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকাতে পাঁচ বছরের বেশি বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তাহলে যুগের পর যুগ আসামে বসবাস করে কেন নাগরিকত্ব লাভ করবে না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মত, ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের সবাই উত্তরাধিকার সূত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা রাখে। বাংলাদেশে এখনো অনেক নাগরিক আছেন যারা একাধারে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজসহ নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পড়ার সুযোগ পেত। তাই বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যে ব্রিটিশ শাসন আমলের জন্মগ্রহণ করেছে সে যদি ব্রিটেনের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে তবে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাগরিকত্ব দেয়া উচিত। ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালে পার্লামেন্টে ‘ভারত শাসন আইন’ পাস করে স্থানীয়দের হাতে শাসনভার অর্পণ করার পর নাগরিকত্ব ও অভিবাসী বিষয়ক অনেক নতুন নতুন আইন পাস করাতে এটা কার্যত সম্ভব নয়।

আসাম প্রদেশটি ইংরেজ সরকার গঠন করে ১৮৭৪ সালে। এখন কামরূপ বলতে আসামের একটি জেলাকে বোঝায়। কিন্তু প্রাচীন যুগে কামরূপ বলতে বোঝাত একটি বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগকে। এর পূর্বদিক ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দখল করে নেয় উত্তর বার্মা (মিয়ানমার) থেকে শান জাতির আহোম নামক একটি শাখা এসে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষার নৈকট্য বিবেচনা করে ১৫টি বাংলা ভাষাভাষী জেলা ও আসাম প্রদেশকে একত্র করে গঠন করেন একটি নতুন প্রদেশ। এর নামকরণ করা হয় ঊধংঃবৎহ ইবহমধষ ধহফ অংংধস চৎড়ারহপব. নতুন এই প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। আসামের অধিবাসীরা প্রতিবাদ উত্থাপন না করে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা মেনে নেয়। কিন্তু বাংলাভাষী হিন্দুরা শুরু করে প্রবল আন্দোলন। আন্দোলন-সংগ্রাম, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টা মীমাংসা হয়ে যেতে পারত। কিন্তু নীতি নির্ধারকদের গাফিলতি ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণে এটি জিইয়ে থাকল।

তাই এখন আসামে যেন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে- বাংলা হলো কেবল মুসলমানের ভাষা; হিন্দুদের ভাষা নয়। তাই আসাম থেকে তাড়াতে হবে বাংলাভাষী মুসলমানদের; যদিও হিন্দু বাঙালিরাও চলমান রোষের শিকার। এনআরসি থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৩ লাখ মুসলমান এবং বাকিরা হিন্দু বাঙালি। আসাম নিয়ে বাংলাদেশের মানুষেরা হয়ে উঠছে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। ওই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয় তবে এটি হবে বাংলাদেশের জন্য মহাবিপর্যয়। আজকের আসামে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৪ শতাংশের কিছু বেশি হলো মুসলমান। আর আসামে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ২৮ শতাংশ। তাই সমস্যাটা শেষ পর্যন্ত আমাদের ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য বেশ জটিল হয়ে উঠবে।

পরিতাপের বিষয়, আসাম রাজ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর ব্যাপারে বারবার বিভিন্ন নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার উচ্চবাচ্য তো করেইনি বরং রহস্যজনকভাবে নীরব থেকেছে। এ দিকে, সেখানকার বাঙালিদের বাংলাদেশের লোক বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নতুনভাবে ৪০ লাখ নাগরিককে এনআরসি থেকে বাদ দেয়া ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার রূঢ় বাস্তবতা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, আসাম পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভারত সরকার বলছে, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে না।’ তবে তাড়িয়ে দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে বাধ্য। এক সময় মিয়ানমারে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা বেশ ভালো ছিল। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ এমপিসহ (সংসদ সদস্য) বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের পূর্বসূরিরা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে থাকে। তাদের দাবি আদায়ের নেতাও সৃষ্টি হলো না। তারা নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়তে থাকে। ঐতিহ্যবাহী আরাকান রাজ্যের নাম একটা সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী রাখাইনদের নামে রাখা হলো এবং নৃশংস গণহত্যা তার জের মাত্র। তাদের অমানবিক কর্মকাণ্ড, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনে আজ বাংলাদেশ ১১ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় শিবির।

একই বাস্তবতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে চীনা মুসলিম সমাজে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঘরানার’ ইসলামি ভাবধারা ঢুকে পড়ছে বলে বেইজিংয়ের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে উদ্বেগ শুরু হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি জেনেভাতে চীনের ওপর দুই দিনের যে বিশেষ সভা করছে সেখানে অভিযোগ করা হয়Ñ কট্টরপন্থী সন্দেহে ১০ লাখ চীনা উইঘুর মুসলিমকে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের জাতিগত বৈষম্যবিষয়ক কমিটির একজন সদস্য আরো বলেন, এমন খবর পাওয়া গেছে, চীনা কর্তৃপক্ষ স্বায়ত্তশাসিত উইঘুর প্রদেশকে কার্যত ‘বিশাল একটি বন্দিশিবিরে’ পরিণত করেছে।

একইভাবে আসামে এনআরসি থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের যদি সীমাবদ্ধ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে উদ্বাস্তের মতো বাঁচিয়ে রাখা হয়, তবে নতুন করে রোহিঙ্গাদের মতো একটা বিপন্ন জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হবে।

যখন তাদের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা ও সুযোগ বিলীন হয়ে যাবে তখন ভারত তাদেরকে তাড়িয়ে দেবে। তারা নিরুপায় হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসবে। বাংলাদেশ মানবিকতা ও ধর্মীয় দিক বিবেচনা করে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের অনুরোধে তাদেরকে আশ্রয় দেবে। তৈরি হবে সবচেয়ে বৃহৎ নতুন শরণার্থী শিবির।
নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এনআরসি তৈরি করা হয়েছে। মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করছে বিজেপি। এর ফলে দেশে গৃহযুদ্ধ লাগতে পারে। বইতে পারে রক্তগঙ্গা।’ মমতার এ মন্তব্যে আসামে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারেÑ এমন অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয়েছে।

কার্যত ভারতের কোনো রাজ্য সরকার নাগরিকত্ব প্রদান ও রহিতকরণে কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে না। আসাম যে নাগরিকত্ব আইন করতে যাচ্ছে, তা ভারতীয় সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মমতা তাই এ নিয়ে আসাম সরকারের সমালোচনা করছেন। এ জন্য আসাম সরকার তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে। ভারতের একটি প্রাদেশিক সরকার কী করে আরেকটি প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করতে পারে, সেটা আমাদের বোধে আসে না।
আরো উদ্বেগের বিষয়, আসাম রাজ্য সরকার ৫২ জনকে আসাম-মেঘালয়-বাংলাদেশ মিলনস্থল মাইনকার চর থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে।

আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের (এনআরসি) চূড়ান্ত খসড়া তালিকা নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কটের কোনো সুরাহা হয়নি। রাজ্যজুড়ে চলছে আন্দোলন। অন্য দিকে, ত্রিপুরায়ও এনআরসি তৈরি করার দাবি উঠছে বিজেপির জোট সঙ্গীদের কাছ থেকে। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব কয়েক দিন আগে বলেছেন, তার রাজ্যে এনআরসি করার দরকার নেই। কারণ সবার বৈধ কাগজপত্র আছেন কিন্তু এটা মানতে চাইছে না জোটসঙ্গী ‘পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা’।

মমতা এনআরসি থেকে বাদপড়া ৪০ লাখ আসামবাসীর প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ না নিলে ওরা কোথায় যাবে, ওরা আমার ভাইবোন। আপনারা অসহায় নন, আমরা আসামবাসীর পাশে আছি। আপনাদের কথা আমরা অবশ্যই ভাববো। লড়াই করবো কেন্দ্রের এই অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।’

সুখের কথা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ (এনআরসি) থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়। কিন্তু এই রায় মোদি সরকার কতটা আমলে নেয় এটা এখন দেখার বিষয়। অমানবিক ও ইতিহাস বিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিলে ভারতও বিপদ-বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিপতিত হবে।

বাংলাদেশ সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অতীতের তুলনায় ভালো। সরকারের উচিত হবে ভারতকে বোঝানো যে, এটা ভারতের নিজস্ব সমস্যা। এখানে বাংলাদেশকে জড়িত করা সমীচীন নয়। এ ক্ষেত্রে নানামুখী চাপের কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। তা ছাড়া ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো হওয়ার কারণে ছিটমহল চুক্তি, ল্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্ট, অবাধ আমদানি-রফতানির পথ সুগম হয়েছে। কিন্তু ভালো সম্পর্ক ব্যবহার করে তিস্তা চুক্তি করে নদীর পানির যথাযথ হিস্যা আদায় করা যায়নি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সদ্ব্যবহার করে আসাম সমস্যার যথাযথ সমাধান দেখতে চায় বাংলাদেশের সচেতন মহল।
লেখক : কবি ও এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


আরো সংবাদ

সকল