১৬ জুলাই ২০১৯

দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জে তুরস্কের অর্থনীতি

মার্কিন ডলারের বিপরীতে কমছে তুর্কি লিরার মান - ছবি : সংগ্রহ

সাম্প্রতিক অতীতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে তুরস্কের অর্থনীতি। এক দিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ধাপে ধাপে কমছে তুর্কি মুদ্রা লিরার মান, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র আরোপ করেছে তুর্কি পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক। দুইয়ে মিলে কঠিন সময় পার করছে তুরস্ক। তবে ঝানু রাজনীতিক রজব তাইয়েব এরদোগান যে বিচলিত হওয়ার পাত্র নন, সেটা সেটিও বুঝিয়ে দিচ্ছেন প্রতিটি পদক্ষেপে। ইতোমধ্যেই পাশে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই ইউরোপীয় মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও তার একে পার্টির সরকার চাইছে দ্রুত সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে, তথাপি সেটি খুব একটা সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে।

দীর্ঘ দিনের ঋণনির্ভর অর্থব্যবস্থা পেছনে ফেলে একে পার্টির সরকার যখন তুরস্ককে সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে চালিত করছে, তখনই নতুন করে মোকাবেলা করতে হচ্ছে এ চ্যালেঞ্জের। এক সময় দেশটি ছিল বিদেশী ঋণে জর্জরিত; কিন্তু ২০০৩ সালে এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই পাল্টাতে থাকে চিত্র। অন্যান্য সব সেক্টরের মতো অর্থনীতিকেও স্বনির্ভর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় সরকার। ফলটাও আসতে থাকে হাতেনাতে। প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আসে এ সময়ে। ২০১২ সালের মধ্যে বিদেশী ঋণ শোধ করে স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে ইউরোপের মুসলিম প্রধান দেশটি; কিন্তু সেই পথ চলায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবারের অর্থনৈতিক সঙ্কট।

২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর এটিই সবচেয়ে বড় সঙ্কট তুরস্কের অর্থনীতির জন্য। বছর খানেকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে কমছে তুর্কি মুদ্রা লিরার মান। এখন পর্যন্ত সব মিলে যা প্রায় চল্লিশ শতাংশ কমেছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে। মাঝারি অর্থনীতির কোনো দেশের জন্য যা বড় ধাক্কা। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের সমান হয়েছে ৬ দশমিক ২০ লিরা, এক বছর আগে যা ছিল সাড়ে তিন লিরারও কম। অনেক দিন ধরেই এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় তুরস্ক, যদিও সমস্যা কাটছে না বরং আরো প্রকট হচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুরু হয়েছে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’। রূপ ভিন্ন হলেও দুটি সঙ্কটই অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট, তাই দ্বিমুখী চাপে পড়েছে তুরস্কের অর্থনীতি।

দুটি সেক্টরে তাই লড়তে হচ্ছে তুরস্ককে। একটি নিজের সাথে অর্থাৎ মুদ্রার মান স্থিতিশীল করা ও মার্কিন ডলারের সাথে ব্যবধান কমিয়ে আনা। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে, যা শুরু হয়েছে ট্রাম্প কর্তৃক স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প কারখানায় যেসব দেশ স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহ করে, তুরস্কের নাম সেই তালিকার ওপরের দিকেই। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে এক শ’ কোটি ডলারের বেশি স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টের শুরুতে এ পণ্যে আমদানির ওপর হঠাৎ করেই ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে হোয়াইট হাউজ।

প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটাতে প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার দেশের নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন ডলার বয়কট করে লিরা মজুদ করতে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য আপদকালীন বিশেষ প্যাকেজ চালু করেছে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে নেয়া হয়েছে আরো বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পথই বেছে নিয়েছে আঙ্কারা।

এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র আর তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্কের। ছয় দশক দেশ দুটি সামরিক, কূটনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চলেছে হাতে হাত রেখে। যুক্তরাষ্ট্র চাইত ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড তুরস্ককে নিজেদের বলয়ে রাখতে। (ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য আর মধ্য এশিয়ার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত তুরস্ক কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র)। আঙ্কারায় একে পার্টির সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ চিত্র পাল্টাতে থাকে। শুধু পশ্চিমামুখী অবস্থান থেকে সরে এসে রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়াতে থাকে তুরস্ক। যেটি ওয়াশিংটনের জন্য স্বস্তির বিষয় ছিল না।

ফলে ওয়াশিংটনের সাথে আঙ্কারার দূরত্ব তৈরি হয়। যদিও দেশ দুটি সিরিয়ায় জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করেছে বাশার আল আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তুরস্কে অভ্যুত্থান চেষ্টার পর দুই দেশের বৈরিতা আরো প্রকট হয়। অভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড ফেতুল্লা গুলেন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায়, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তাকে ফেরত চায় তুরস্ক। অন্য দিকে, অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে এক মার্কিন যাজককে আটক করেছে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে। তাতেও রাজি নয় আঙ্কারা। এর রেশ ধরে দুই তুর্কি মন্ত্রীকে নিষিদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র, তার কয়েক দিন পরই আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক এ লড়াইয়ে কূটনৈতিকভাবে এখন পর্যন্ত সফলই বলা যাচ্ছে তুরস্ককে। গত সোমবার ফ্রান্সের সাথে অর্থনৈতিক খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির সমঝোতা হয়েছে দেশটির। দুই দেশের অর্থমন্ত্রী বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির যে পদক্ষেপ তা দ্রুতই কার্যকর করা হবে। আরেকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেটি যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বড় অস্বস্তিত্বে ফেলতে পারে, সেটি হলো ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে লেনদেন হবে ইউরো অথবা নিজ নিজ দেশের মুদ্রায়, মার্কিন ডলারে নয়।

একই দিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সাথে ফোনালাপ করেছেন রজব তাইয়েব এরদোগান। ব্রিটেনের সাথে চলতি বছর তুরস্কের বাণিজ্য এমনিতেই অনেকগুণ বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। ২০১৭ সালে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল এক হাজার ৬০০ কোটি ডলারের, যা এ বছর দুই হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে।

প্রশ্ন আসতে পারে যে, মার্কিন ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ দুটি কেন তুরস্কের পাশে দাঁড়াচ্ছে? এর উত্তর হলো নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। তুরস্কের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হলে তার বড় প্রভাব পড়বে ইউরোপের বাজারে। তুরস্কে প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের। এরদোগান যুগে গত ১৫ বছরে ব্রিটেন দেশটিতে সরাসরি বিনিয়োগ করেছে এক হাজার কোটি ডলার। পরোক্ষ বিনিয়োগ আছে আরো অনেক। অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন। তাই তুরস্কের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাম্য নয় ইউরোপীয় দেশগুলোর, যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তারা পাশে দাঁড়িয়েছে আঙ্কারা। আর এ বিষয়টি তুরস্ককে সহযোগিতা করছে সঙ্কট মোকাবেলায়।


আরো সংবাদ

বেসরকারি টিটিসি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি কলেজ শিক্ষার্থীদের শতাধিক মোবাইল জব্দ : পরে আগুন ধর্ষণসহ নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে বিএনপির কমিটি রাজধানীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় নারীসহ দু’জন নিহত রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত আজমত আলীকে মুক্তির নির্দেশ আপিল বিভাগের রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত আজমত আলীকে মুক্তির নির্দেশ আপিল বিভাগের রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত আজমত আলীকে মুক্তির নির্দেশ আপিল বিভাগের কাল এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ এরশাদের মৃত্যুতে ড. ইউনূসের শোক ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না : রাষ্ট্রপতি ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের হজ প্রতিনিধিদল সৌদি আরব যাচ্ছেন

সকল




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi