২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কালের কবলে বর্ষা

কালের কবলে বর্ষা - সংগৃহীত

২২ আষাঢ় গাঁয়ে গিয়েছিলাম। মেঘনাপাড়ের গাঁ। এককালে যেসব মাঠে ৮-১০ ফুট পানি দেখতাম, সেসব মাঠ এখন শুষ্ক। নদীর কূলের ওপরে উঠতে পারছে না পানি। অস্তিত্ব সঙ্কটে ধুঁকছে মেঘনাও। একসময় হাত ধরাধরি করে আসত বর্ষা ও মাছ। হাত ধরাধরি করেই কালের কবলে হারিয়ে গেছে বর্ষা ও মাছ।

গাঁয়ের ছবি মায়ের ছবির মতোই। এই দুইয়ের কোলেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। যাদের কোলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাদের কি কখনো ভোলা যায়? আমি এখন শহরে। ইটের তলায় কীটের মতো হাঁপিয়ে উঠলেই সবার আগে এ দুই আপনকে মনে পড়ে। ‘স্রষ্টার সৃষ্ট পল্লী আর মানুষের সৃষ্ট নগর’ (কাউপার)। পল্লীমায়ের কথা মনে করতেই চোখের সামনে চলে আসে বর্ষার উচ্ছল যৌবনা মূর্তি। বর্ষার সাথে সাথে গ্রামবাঙলা থেকে হারিয়ে গেছে কিলবিল করা মাছ, লাইলাই খেলা, সোনালি আঁশ, জটবাঁধা আমনের ক্ষেত, বিল ভরা শাপলা-শালুক ও গাঙ ভরা পালের নাও।

পুঁথি-পুস্তকে ছয় ঋতুর কথা উল্লেখ থাকলেও শরৎ, হেমন্ত ও বসন্তের সাথে আমাদের পরিচয় কম। মোরগের ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙত, দুপুরে ডাকত ঘুঘু আর দোয়েল, গভীর রাতে কান পাতলে শুনতাম ডাহুকের ডাক। বর্ষায় দূরের ধানক্ষেত থেকে অবিশ্রান্ত ভেসে আসত কোড়ার ‘টুলুপ টুলুট’ কণ্ঠ।

শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন ঋতুর সাথে আমাদের বিশেষ পরিচয়। এই তিন ঋতু হাজির হয় তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে। সাধারণ মানুষের দুঃখের বার্তা নিয়ে শুরু শীতকাল। গাঁয়ে লেপ-তোষক ছিল না বললেই চলে। ছিল আগুন জ্বেলে শীত নিবারণ করার নানা পদ্ধতি।

বৃদ্ধাদের কেউ কেউ মাটির আইল্লা (তুষযোগে আগুন ধরে রাখার পাত্র) বুকে চেপে শরীর গরম রাখতেন। এই অবস্থায় কোনো কোনো শীতে মহামারী আকারে দেখা দিত কলেরা-বসন্ত। কাঠফাটা রোদ নিয়ে এর বিপরীত চরিত্র গ্রীষ্মের। শীতের তীব্রতা, বালা-মসিবৎ এবং গ্রীষ্মের ঘাম ধুয়ে, মুছে দিতে আগমন বর্ষার। তাই গাঁয়ের মানুষ সারা বছর বর্ষার প্রতীক্ষায় থাকেন।

বর্ষার আগমনী বার্তা; ঘন ঘন বিজলির চমক, গুডুম গুডুম গর্জন, ও মুষলধারায় বৃষ্টি। জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্ট ফলের সাথে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেলেই ‘উজাইন্না’ মাছ ধরার প্রস্তুতি। জোরাল বৃষ্টির পানি কলকল শব্দে মাঠ থেকে গড়িয়ে নামে বিলে। গড়িয়ে নামা পানির সোঁতা ধরে বিল থেকে ডাঙায় উঠে কৈ মাছ। জলাশয় ছেড়ে ভাটি থেকে উল্টোদিকে ধাবমান মাছকে বলে ‘উজাইন্না’। কোনো কোনো উজাইন্না খাল-বিল ছেড়ে একেবারে ডাঙায় উঠে আসে। ডাঙ্গা থেকে তখন কৈ মাছ ধরার অভিজ্ঞতা কার না আছে!

কৈ মাছ ধরা শেষ হতে না হতে খাল-বিল-ডোবা-নালায় ঢুকতে শুরু করে পানি। সাথে ঢুকতে শুরু করে টেংরা, পুঁটি, ডেলা, টাকি, বাইলা, পাবদা, ফলি, বজুরি, বাইনসহ ছোট ছোট মাছ। পুঁটির মধ্যে একটা চ্যাপটা আর একটা বড় ও লম্বাটে। লম্বাটের নাম জাতিপুঁটি। নতুন পানির সাথে নেমে আসা কোনো কোনো জাতিপুঁটির গায়ে আলতা লাগানো থাকে। ঠোঁটের পেছন থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বালম্বি আলতা পরা পুঁটিকে আমরা বলতাম ‘বউপুঁটি’।

বউপুঁটি ধরার জন্য বড়শি নিয়ে আগেভাগেই প্রস্তুত থাকতাম। বাঁশের ঝাড় থেকে যুৎসই জিংলা কেটে ছিপ, এর আগায় সরু সুতা বেঁধে সতার মাথায় নানা আকারের বড়শি। মাছের মধ্যে পুঁটির মুখ সবচেয়ে ছোট। তাই সবচেয়ে ছোট বড়শি পুঁটির জন্য। বাইলা ও মেনি মাছের মুখ বড়, যেকোনো আকারের বড়শি হলেই চলে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে নতুন পানি ভর্তি খাল-ডোবার পাড়ে ছিপসহ হাজির। বড়শিতে ছেয়ে যেত খাল-ডোবার পাড়। মাছ ধরার নেশায় কখন যে নাস্তার সময় পার হয়ে দুপুর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ত, টেরই পেতাম না।

খালের পাড় তলিয়ে চারা ধানের ক্ষেতে পানি ঢুকতে শুরু করতো। ধানক্ষেতের আলে ও পায়ে চলার পথে পানির সাথে প্রবেশ করত নুন্দি বাইলা। পাকা জামের মতো হৃষ্টপুষ্ট এটা সবার পছন্দের মাছ। কখনো কখনো মা জালি ও ‘ডেস্কি’ হাতে দিতে দিতে বলতেন ‘বাজান, আজ রান্নার কিচ্ছু নাই, বেশি দূরে যাসনে। সামনের ধানক্ষেতের মাথায় জালি দিয়ে কয়েকটা ঠেলা দিয়ে আয়, যা হয় তাতেই আমাদের চলবে।’

জালি কাঁধে, ডেস্কি হাতে দিতাম দৌড়। বাড়ির ঘাটা দিয়ে নামতে গিয়ে বাম দিকেই ডোবা। ডোবায় হেলেঞ্চাসহ নানা প্রকার আগাছা। আগাছার গলায় গলায় পানি। লুঙ্গি মালকোঁচা দিয়ে, জালির এক মাথা ডুবিয়ে কিছুদূর ঠেলে তুলতেই লাফালাফি করত ঝলঝলে চিংড়ি।

চারা ধানের ক্ষেতে পানি প্রবেশের সাথে নদী থেকে উঠে আসে শোল, গজার, রুই, বোয়াল মাছ। নীরাগের (বাতাস পড়ে যাওয়া) সময় কোচ-জুইত্তা নিয়ে শিকারিরা বড় মাছ শিকার করতে বের হয়। কোচ-জুইত্তা হাতে নৌকা নিয়ে ধানক্ষেতে মাছের চলাচল খুঁজে বের করে। এই মাছ তাদের কোচ-জুইত্তায় ধরা পড়ত। নীরাগের মাছ শিকারের জন্য দূর থেকেও আসতেন নীরাগিরা। একবার আমাদের বাড়ির পাশের এক শিকারি ৩৫ সের ওজনের কাতলা শিকার করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।

মসজিদের ইমাম মোল্লা দাদা। তাকে দেখতাম, বর্ষায় তিনি জমির আলে পারং (বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি বিশালাকারের মৎস্যফাঁদ) বসিয়ে রাখতেন। ছোট মাছ বড় মাছের তাড়া খেয়ে ফাঁদে ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ত বড় মাছও। ফাঁদ থেকে ছোট মাছ বের হয়ে গেলেও আটকে যায় বড় মাছ। বর্ষায় অনেকেই ‘চাঁই’ পাততেন। ভাত ও কুড়া মিলিয়ে করা হয় মাছের টোপ।

চাঁইয়ের ভেতর ধানের পাতা দিয়ে বিশেষ কায়দায় বানানো টোপ ঝুলিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ির আশপাশে কিংবা ধানক্ষেতের কোণে পেতে রাখতেন, সকালে তুলতে গেলেই লাফালাফি শুরু হতো চিংড়ির। কেউ কেউ বাঁশের কঞ্চির মাথায় বড়শি বেঁধে (কোপা বড়শি) সন্ধ্যার দিকে খাল, বিল ও ডোবা-নালায় পুঁতে রাখেন। বিশ-পঁচিশটি কোপা বড়শি পুঁতলে গিলতে শুরু করে টাকি, শিং, বাইন ইত্যাদি মাছ। বড়শি থেকে একটার পর একটা মাছ খুলে শেষ করা যেত না।

সে সময় মুসলমান মৎস্যজীবী ছিল না বললেই চলে। আমাদের গাঁয়ের নাম ‘রামপ্রসাদ’ হলেও এক ঘরও হিন্দু ছিল না। নিজের প্রয়োজনীয় মাছ নিজে ধরে খাওয়ার জন্য প্রত্যেকের ঘরে ছিল এর সরঞ্জাম। আমাদের ঘরে সবসময় এক জোড়া ঝাঁকি জাল দেখতাম। যার মধ্যে একটা ঘন, আরেকটা পাতলা। মাছ ধরতাম বড়শি, জালি, ওঁছা ও টেঁটা দিয়ে।

বর্ষার পানি মেঠোপথ ডুবিয়ে বাড়ির আনাচে-কানাচে প্রবেশ করতে শুরু করে। রাতে ডান হাতে টেঁটা ও বাম হাতে হারিকেন নিয়ে বের হয়ে পড়তাম। খাবারের লোভে নতুন তলিয়ে যাওয়া মাটিতে আসে বাইলা, টেংরা, শিংসহ নানা প্রকার মাছ। স্বচ্ছ পানির তলে শুয়ে থাকা বাইলা দিনের বেলায়ই দেখা যেত। বড়শির টোপ মুখের কাছে নিতে না নিতেই খপ্ করে মুখে তুলে নিত। বাড়ির আনাচে-কানাচে, গোয়াল ঘরের পাশে যেখানে গোবরেরটাল, সেখানেই তারা বাইন, শিং ও বুলাটাকির আড্ডা। যখনই টেঁটা হাতে যাই, তখনই দেখতাম তারা বাইন।

আমার শখ টেঁটা দিয়ে কাইক্কা মাছ শিকার। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে একদিকে পানি কমতে থাকে, আরেকদিকে ধানের গাছ হামাগুড়ি দিতে শুরু করে। জট পাকানো ক্ষেতে নৌকা প্রবেশ করত না। ক্ষেতের আলের দিকে ধানের যেসব ডগা হাঁটু গেড়ে থাকে সেগুলোর সাথে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কাইক্কা। দেড়-দু’ঘণ্টা কাইক্কা ধরলে নায়ের তলা এ মাছে ঢেকে যেত।

গাঁয়ের উত্তরে নদী মেঘনা। ভাদ্র-আশ্বিনের দিকে স্রোতের ভাটিতে টোনাজাল গড়ায় জেলেরা। সাত-আটটি জাল পালা করে একের পর এক গড়িয়ে তিন মোহনার কাছে গিয়ে তুলতেই লোছ (যেখানে মাছ জমা হয়) ভরে উঠে রুই, কাতলা ও মৃগেল। ছোট রুই-মৃগেলকে বলা হয় নলা আর মাঝারিকে বলা হয় গর্মা। জেলেদের জাল তোলার সময় গাঁয়ের লোকজন ডিঙ্গি ও কোষা নৌকায় করে জেলেদের কাছ থেকে মাছ নিতে আসে। জেলেরা একজনকেও বিমুখ করে না। বর্ষার শেষে মেঘনার বুক থেকে তাজা নলা মাছের ঘ্রাণ ও স্বাদ যে জিহ্বায় একবার লেগেছে, সে জিহ্বায় অন্য কোনো মাছই রুচবে না।

বর্ষার শেষ দিকে নৌকায় করে ঘুরে ঘুরে ফসলের জমি দেখা ছাড়া কৃষকের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাই বাড়ি বাড়ি চলত জাল বোনা। বেশি ছিল ঝাঁকি ও পাতা জাল। ঝাঁকিজাল বানানো কঠিন। বাবা প্রতিবর্ষায় একটি করে নতুন জাল বানাতেন। একদিনের ঘটনা-বর্ষার শেষ, নলা মাছের ঝাঁক দেখা দিতে শুরু করেছে। উঠোনের এক পাশে বসে বাবা নতুন জালের লোছ বাঁধছিলেন। এমন সময় পাশের বাড়ির মোহরালী দাদা এসে বাবার পাশে বসেন। লোছ বাঁধার কাজে হাত রাখেন দাদাও।

দাদা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি লোছ বাঁধা শেষ কর। যে রোদ, আজই নলা দেখা দিতে পারে।’ সাদা জাল নিয়েই নৌকায় ওঠেন বাবা। বাবা সামনে, দাদা পেছনে, মাঝখানে আমি। আমরা চলেছি পুবের গাঙ্গে। গ্রাম ছেড়ে গোপাট। দু’দিকে আমন ধানের ক্ষেত। সামনেই নদীর কাছাকাছি পৌঁছতে বামদিকে খিলা জমি। খিলায় জলজ উদ্ভিদ শ্যাওলা-পানার মাঝে গজারের পোনার মতো কিছু একটা কিলবিল করছে। নাও ঘুরিয়ে সুবিধাজনক স্থানে নিতেই জাল মারেন বাবা। বারো হাত জাল আর পালোয়ান সাইজ বাবা। পুরো জাল মাচার মতো গোলাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁকের ওপর। বাবাও নেমে পড়েন পানিতে। দেড়-দুই ফুট পানি।

পানিতে নেমেই বলেন, ‘চাচা তুমিও নেমে পড়ো। নলার ঝাঁক সবটাই এখন জালের নিচে। আগে লোছগুলো ঠিকমতো মাটিতে ঠেকাই, নতুন জাল; একটাও যেতে পারবে না।’ এর মধ্যেই পানি ঘোলা হওয়াসহ জালের ভেতর প্রচণ্ড আলোড়ন শুরু হয়ে যায়।

উত্তরের কড়া স্রোতে নেমে চিৎ হয়ে দুই হাতে দাঁড় বেয়ে মুহূর্তে পৌঁছে যেতাম গোপাটে। খানা-পিনা ও লেখাপড়া সবকিছু ভুলে ডুবসাঁতার ও লাই লাই খেলা। এই খেলায় যে যত বেশি দম নিয়ে দূরে যেতে পারে, ততই মজা। এতে প্রচুর আনন্দ পাওয়া যায়। আনন্দের মাঝে কখন যে মিনিট-ঘণ্টা শেষে প্রহর পার হয়ে যায় একটুও টের পাই না।

যে স্রোতে গা ভাসিয়ে গোপাটে এসেছি সে স্রোতেই গা ভাসিয়ে বাড়ি ফেরার পালা। ভাটির টানে ডুব দিয়ে চোখ মেলতেই দেখা যেতো নানা রকম জলজ উদ্ভিদের হেলাদোলা। জলজ উদ্ভিদের নরম ও চিকন পাতার ফাঁকে ফাঁকে মাছের ছোটাছুটি। শ্যাওলা থেকে রামকলা (কলার মতো জলজ ফল) সংগ্রহ করতে করতে বাড়ির কাছে এলেই বাবার ভয়ে বুক কাঁপতে শুরু করত।

বর্ষায় কৃষকের প্রধান দু’টি ফসল পাট ও ধান। মাঠের দিকে তাকালে আর কোনো ফসল চোখে পড়ত না। এককালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাট রচনা মুখস্ত করেনি এমন ছাত্র পাওয়া দুষ্কর। একান্ত পরীক্ষা পাসের জন্য কমসে-কম দু’টি রচনার মধ্যে একটি, পাট রপ্ত করতেই হতো। কারণ, দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট বা সোনালি আঁশ। যখন পাট কাটার সময় হয় তখন জমিতে থাকে পাঁচ-ছয় ফুট পানি। ভালো ডুবসাঁতার জানা লোক ছাড়া সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে পাট কাটা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আড়াই ফুটি কাস্তে। শ্রমিকরা বকের গলার মতো লম্বা কাস্তে অর্ডার দিয়ে তৈরি করতেন। এক ডুবে একটা বকাকাঁচি দিয়ে এক তপড়ি (আঁটি) পাটগাছ কেটে আনা যায়।

কাঁচা পাট পচলে গাঁয়ের মহিলারা দলবেঁধে খড়ির পরিবর্তে গাছ থেকে পাট ছাড়িয়ে দিতেন। আমার শখ, পাট কাটা ও ধোয়ার সময় বড়শি দিয়ে কাটাইরা মাছ (ঠিক চাপিলার মতো, একটু চিকন) ধরা। পাট ধোয়ার সময় কাঁচা পাটের লাছি দিয়ে বুট-মুড়লি, চমচম ও চিনির গজা ইত্যাদি মজার মজার খাবার খাওয়া।

ডিঙ্গি করে ফেরিওয়ালারা ঘুরাঘুরি করত এসব নিয়ে। পাটখড়ির মাথা থেকে ফড়িং ধরা আরেক মজার খেলা। উঠোনজুড়ে পাটখড়ি শুকানোর সময় নানা রকমের ফড়িং এসে পাটখড়ির মাথায় বসে। কাঠির মাথায় কষ লাগিয়ে টুকটুকে লাল কিংবা গোয়াইল্লা ফড়িং (রাজা) ধরার জন্য পেছনে পেছনে কয়েক বাড়ি ছুটতাম। তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট। বিশ্বের বৃহত্তর পাটকল আদমজী জুটমিলের স্থান বাংলাদেশে।

তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে পাট। পরিবেশবান্ধব পাটের স্থান দখল করেছে প্লাস্টিক ও পলিথিন।

বর্ষা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে আমন ধানও। আমন ধানের এক বিস্ময়কর গুণ হলো, পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পায় ধানের গাছ। কোনো কোনো আমনের গাছ ১৪-১৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। আউশ শব্দের অভিধানিক অর্থ আশু বা শীঘ্র। আউশ ও আমন এক সাথে বুনার পরেও বর্ষার শুরুতেই পেকে যায় আউশ ধান। আমন ধান থেকে বাছাই করে কাটা হয় পাকা আউশ। কয়েক প্রকার আউশ ধানের মধ্যে কুচকুচে কালো ধানটির নাম হাইট্টা। এই ধানের চিঁড়া-মুড়ি বিখ্যাত বলে কবি-সাহিত্যিকদের লেখায়

‘এর নাম পাওয়া যায়,
হাইট্টা ধানের মাইট্টা চিরা, গোয়াল বাড়ির দই,
সকল জামাই খাইতে বইছে; লেংড়া জামাই কই?’

হাইট্টা ধান এখন আর কোথাও দেখা যায় না। ডিসেম্বর ২০১৬ নিঝুমদ্বীপ গিয়েছিলাম। সে এলাকায় হাইট্টা ধান দেখতে পেয়েছি। অনেক দিন পর কুচকুচে কালো রঙের হাইট্টা শুকাতে দেখেই মনে পড়ে গেলো, আমন ধানের সাথে বাবাও বুনতেন হাইট্টা ধান।

দীর্ঘ দিন রোদ-বায়ু ও বন্যার পানির সাথে পাল্লা দিয়ে যে ধান কৃষকের গোলায় উঠত সে ধানের নাম আমন। খামা, গাবুরা, লেঞ্জা, মুইরল, গৌরল এ রকম আরো নানা প্রকার নাম ছিল আমনের। গভীরতার পানির ধান লেঞ্জা আমন। উঁচু জমিতে বোনা হতো গাবুরা।

কৃষকের বাইন শুরু লেঞ্জা ধান দিয়ে, শেষও লেঞ্জা ধান দিয়ে। ভাত ছাড়াও মুড়ি, চিড়া, খৈ, পিঠা, পায়েস তৈরিতে লেঞ্জা ধানের জুড়ি নেই। রোগীর জন্য লেঞ্জা চালের জাউ উত্তম পথ্য। ভিন্ন স্বাদ ও ঈষৎ ঘ্রাণযুক্ত লেঞ্জা চালের খাবার যে না খেয়েছে তাকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়। আমন ধানের প্রধান শত্রু পামড়ি পোকা বা পিসি।

এটা দমন না করলে মাঠের পর মাঠ শেষ করে ফেলে। ভাদ্র মাসে ধানগাছ জট বাঁধতে শুরু করে। কৃষক কোষা নৌকায় করে ক্ষেতের আলে আলে ঘুরতেন। কখনো কখনো কোষা থামিয়ে ধান গাছের পেট টিপতেন। পেট টিপে দেখতেন গাছের পেটে থোড় জন্মেছে কি না। শরতের শেষে আশ্বিনের ঝড়। ঈশানের কোণে কালো মেঘ জমতে শুরু করলে কিষাণের মুখেও কালো মেঘ জমতে শুরু করতো। ঝড়ের সময় দড়ি-কাছি ও বাঁশ-লগি নিয়ে ধান রক্ষা করতে গিয়ে কৃষকের কষ্টের কথা মনে করতে গিয়ে এখনো কষ্ট পাই।

সব কষ্ট দূর হয়ে যায় প্রথম কাটা ধানের চাল থেকে যখন ভাত খেতে বসি। আমন ধান থেকে নবান্নের ঘ্রাণ এখনো যেন নাকে লেগে আছে। আমন ধানের জাউ-চিঁড়াসহ ভোর হতে না হতে পিঠা বানানো শুরু। বাড়ি বাড়ি চাল তুলে শুরু হয় খোদার নামে সিন্নির আয়োজন। নদীর পাড়ে জেগে ওঠা তিন পথের মাথায় রান্না হতো ‘খোদাই সিন্নি’। কেউ দুধ কিনে আনে, কেউ ভাঙে নারিকেল। কাঁচা মাটি গর্ত করে চুলা।

পাঁচ-সাতটি বড় ডেগে দুপুর থেকে রান্না। সন্ধ্যার আগেই মাটির সানকি হাতে, মাটির ওপর আমনের নাড়ার (ধানের শুকনো ডগা) ওপর বসে সিন্নি খাওয়ার স্মৃতি চাইলেই কি ভুলা যায়! নবান্নের ফেনেও ছিল ঘ্রাণ। নতুন চালের প্রথম ভাত খাওয় হতো ফেন দিয়ে। নতুন ফেন-ভাতের সাথে একটা পোড়া মরিচ মিলিয়ে খাওয়ার সময় মা আমার মুখেও কয়েক লোকমা তুলে দিতেন। মায়ের হাতে মাখা ফেন-ভাতে যে স্বাদ পেয়েছি, সে স্বাদ এখন কাচ্চি-বিরিয়ানিতেও পাই না।

আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। বাংলার বর্ষার আরেক আকর্ষণ শাপলা-শালুক। বিলের বাহার শাপলা।

‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে,/ যে দেশেতে কলমি কমল কণক হয়ে হাসে,/ সে আমাদের জন্মভূমি মাতৃভূমি বাংলাদেশ’

জীনাত রেহানার কণ্ঠে গাওয়া গানটি মনে পড়ে যায়। আমাদের মাঝমাঠে বেশ কিছু নিচু ভূমি আছে। চৈত্রের আগেই তলা শুকিয়ে ঠনঠন। সেখানে পূর্ণ বর্ষায় ১০-১২ ফুট পানি। জায়গাটির স্থানীয় পরিচয় চেঙ্গাকুর। আমাদের বিলের রয়েছে দু’টি ঠোঁট বা চূড়া এবং খালের মাথার দিকের নিম্নভূমি, এই তিন নির্ধারিত স্থান ছাড়াও আমন জমির ফাঁকে ফাঁকে ও আইলে তারার মতো শাপলা ফুল ফুটে থাকত। কৃষকরা জমি দেখতে গিয়ে মুঠো ভরে শাপলা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন।

আমার আকর্ষণ বেশি ছিল ঢ্যাপ/ভেট ও শালুকে। শাপলা ফুলের পরিণত বয়স পার হয়ে গেলে ফুলের সাদা পালক ঝরে যায়। পালক ঝরতে ঝরতে পেয়ারার মতো গোল ও সবুজ অংশকে বলা হয় ঢ্যাপ। এটি ভাঙলেই ভেতর থেকে সরিষার মতো বিচি বের হয়ে আসে। বিচি শুকিয়ে ভাজলে পাওয়া যায় খই। শালুক গাছ দেখলে আর পায় কে, ঝুপ্ করে নেমে পড়তাম জলে। গাছের ডগা ধরে ডুব দিয়ে একেবারে গোড়ায়। মাটি খুঁড়ে শালুকসহ ভুস করে ভেসে উঠতাম।

নদীর বাহার পালের নাও। নদীতে চোখ পড়তে না পড়তেই যে দৃশ্য নয়নকে মুগ্ধ করে তা হলো, পালের নাও। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে,‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে/ ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও/ মাঝ দইরা দিয়া চলুক, মাঝ দইরা দিয়া’

পালের নাও নিয়ে গ্রাম বাংলার বুকে কত গান কত কবিতা এবং কত গল্প রয়েছে বলে শেষ করা যাবে না। ইঞ্জিনের ব্যবহার যত বাড়তে থাকে কমতে থাকে পালের ব্যবহার। এক সময় নদীর যেদিকে চোখ যায় সে দিকেই পালের নৌকার ছুটাছুটি চোখে পড়ত।

মেঘনা নদীতে এখনো মাঝে মাঝে পালের নাও দেখা যায়। সোনারগাঁ থেকে মেঘনা পার হয়ে আমাদের বাড়ি। যখন বাড়ি যাই, তখনই খুঁজি পালের নাও। গত কয়েক বছরে পালতোলা নাও দেখা হয়নি। ৪০০-৫০০ মণ ধারণক্ষমতার নাও চলাচলের জন্য প্রধান উপায় পাল। বাতাস আর স্রোতের মর্জি বুঝে পাল তুলে ভয়ঙ্কর পদ্মা পাড়ি দিতে হতো।
দৈত্যাকৃতির বিশাল নৌকাগুলো চলাচলে পালই ছিল একমাত্র ভরসা। পালের সুবিধা হলো, যেদিক থেকে বাতাস বইতে থাকে সেদিক বাদে বাকি তিন দিকেই চলাচল করা যায়।

পাল, স্রোত আর গুণ- এ তিন শক্তির সাহায্য ছাড়া দৈত্যাকার নৌকাগুলো চালনা করা দায়। হবিগঞ্জে ধান কাটার মওসুম শুরু হওয়ার আগে শত শত নৌকা অনুকূল বাতাসে পাল তুলে মেঘনার বুকজুড়ে ভাটিয়ালি সুর তুলে যখন উত্তরে ছুটত, তখন মনে হতো একঝাঁক পরী সাদা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। এই নৌকাগুলোতে স্রোত ও বাতাসের প্রতিকূলে গুন (নৌকা টানা রশি) ব্যবহৃত হতো।

মাল্লারা দল বেঁধে গুন টেনে নৌকা নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় কৃষকরা তাদের কৃষিজদ্রব্য বিক্রি করার জন্য মাল্লাদের কাছে নিয়ে যেতেন। ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, মহানন্দা, ধরলাসহ বহু নদীর উজানে ভারত চার শতাধিক, নেপাল ত্রিশটি আর ভুটান বিশটি বাঁধ দিয়েছে। আরো উজানের দেশ চিনও তার অংশে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিয়েছে বহু আগেই। বাঁধ ছাড়াও শুষ্ক মওসুমের জন্য ৩৩টি রিজার্ভারে পানি সঞ্চয় করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। প্রতিটি বিজার্ভারে পানির পরিমাণ ৫০ হাজার কিউসেক। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আধুনিক বিশ্বায়নের কারণে বস্তু ও সংস্কৃতির পরিবর্তন অনিবার্য হলেও মানবসৃষ্ট কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অবশ্যই অশনিসঙ্কেত। এ কারণে প্রকৃতি থেকে অস্তগামী হয়েছে পল্লী মায়ের গৌরবতুল্য বর্ষাও।


লেখক : আইনজীবী


আরো সংবাদ