১৫ নভেম্বর ২০১৮

সিরিয়ার জন্য ‘কুৎসিত শান্তি’ যুদ্ধ চলার চেয়ে ভালো

সিরিয়ার জন্য ‘কুৎসিত শান্তি’ যুদ্ধ চলার চেয়ে ভালো - সংগৃহীত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ার যুদ্ধ শেষ করতে এবং সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্ত থেকে ইরানি বাহিনীকে দূরে সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে অবশিষ্ট সময়ের জন্য মেনে নেবেন। আর সিরিয়া থেকে আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। এটি হলো একটি সূচনা। তবে সিরিয়ায় সহিংসতা শেষ করার জন্য আরো বেশি কিছু প্রয়োজন।
২০১১ সালের শুরুতে, পশ্চিমে এবং মধ্যপ্রাচ্যে জোর দেয়া হয় যে, আসাদকে অবশ্যই যেতে হবে। এই একটি বিষয়ের ওপর অধিক ফোকাস, সব শেষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে কঠোর করে তোলে এবং এতে অন্য বিকল্পগুলো খুঁজে বের করা আরো কঠিন হয়ে পড়ে। সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের আহŸানের গুরুত্ব তখন থেকেই হ্রাস পেয়েছে। তবে পশ্চিমা নীতি বলয়গুলোতে কিছু কণ্ঠস্বর এখনো রয়েছে যারা আসাদ সরকারের মতের পূর্ণ রূপান্তর দাবি করেন। তবে এ সময়ে একটি ভালো উপায় হলো, সিরিয়ার সরকারের এমন একটি নতুন কোর্সে যাওয়া, যাতে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সিরিয়া সরকারের সাথে অধিকতর সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। তারা সিরিয়ায় তাদের দূতাবাস পুনরায় খোলার মধ্য দিয়ে এটা শুরু করতে পারেন। পশ্চিমা ক‚টনীতিকরা দামেস্ক থেকে চলে আসার পর বিভিন্ন সুযোগ নষ্ট হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের উচিত সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা এখন প্রত্যাহার করা।

এর পরিবর্তে ধৈর্য ধরে আংশিক গণতন্ত্র নির্মাণের ওপর তাদের জোর দেয়া উচিত। এর বিনিময়ে দামেস্কের সংস্কারের কাজ শুরু করার প্রয়োজন হবে, যদিও পশ্চিমকে নিজের চাহিদাগুলোকে নমনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। উপরন্তু, সিরিয়ার পুনর্র্নির্মাণের জন্য অবদান রাখতে পশ্চিমকে প্রস্তুত থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে একটির পর একটি খাত পর্যায়ক্রমে নির্বাচন করতে হবে। মানবিক সাহায্য চলতে থাকবে যত দিন না সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা যায় এবং বিশেষ করে, তরুণদের জন্য চাকরি সৃষ্টি করার মতো উদ্যোগ সৃষ্টি না হয়।

যতক্ষণ দেশটি নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকবে ততদিন সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠিত করা সম্ভব হবে না। পুনর্র্নির্মাণ, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ব্যাপক চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করার জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায়, আগামী কয়েক বছরে সিরিয়ার শিশুদের আগত একটি প্রজন্ম এবং ২০ বছর কোটার বেকার যুবকরা বিদ্রোহী ও চরমপন্থী নিয়োগকারীদের শিকার হবে এবং পরবর্তী দশকে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হতে পারে। সিরিয়ার এ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য যুদ্ধ অবসানে সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা আবশ্যক। জেনেভা শান্তি প্রক্রিয়াকে সিরিয়া বা ইউরোপীয়রা গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি শুধু বৃহত্তর মাত্রায় অস্থিতিশীল এবং দুর্দশাপূর্ণ হবে।

জিমি কার্টার

 

সিরিয়ায় সঙ্ঘাতের অন্য চালকদেরও অবশ্যই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। রাশিয়া ও ইরানের সাহায্যে আসাদ সরকার বিদ্রোহী বাহিনীর একটি বড় ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এ ভূখণ্ড ধর্মনিরপেক্ষ মিলিশিয়া থেকে শুরু করে ইসলামি রাষ্ট্র, আলকায়েদা এবং অন্যান্য সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত জিহাদিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ লাভ সত্তে¡ও, সিরিয়ার বড় অংশ এখনো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কার্টার সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলের ২৭ শতাংশ ভ‚খণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোটের সহায়তায়, সিরিয়ার কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আলকায়েদার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত কিছু বিরোধীদল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ ইদলিব নিয়ন্ত্রণ করছে। আর তুরস্ক তার সীমানা বরাবর উত্তরপূর্ব সিরিয়ায় একটি আশ্রিত ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। জুলাই মাসে যুদ্ধের শুরুতে কুর্দিদের নিরাপদ স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য একটি কুর্দি প্রতিনিধিদল সিরীয় সরকারের সাথে সাক্ষাৎ করেছে। এটি একটি গঠনমূলক আলোচনা, আর এ ধরনের আরো আলোচনাকে উৎসাহিত করা উচিত। ইদলিব প্রদেশে কেন্দ্রীভূত বিরোধীদের সাথেও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে কী করা সম্ভব, তা অনুসন্ধান করতে হবে। যুদ্ধ অবিরাম চালানো কোনোভাবেই বাস্তব নয়। একই সময়ে, তুর্কি দখলকৃত অঞ্চলটির ভাগ্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। 

এ জটিল পদক্ষেপের মধ্যে আসাদ সরকারকে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে এবং বন্দীদের মুক্তি ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাসহ জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারসহ যুদ্ধ ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ধরনের কিছু লঙ্ঘন আজো চলছে। এর ফলস্বরূপ, দেশের অর্ধেক লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও জীবনযাত্রা ধ্বংস হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় এ লঙ্ঘনের অসহায় সাক্ষী ২০১৩ সালে যখন একটি যৌথ রাশিয়ান-আমেরিকান প্রচেষ্টা সিরিয়া থেকে বৃহদাকার রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ সরানোর কাজ করেছিল তখন এর ব্যতিক্রম ছিল। সিরিয়ায় বিপর্যয়ের জন্য দায় নিরূপণ করা যুদ্ধোত্তর নিরাময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। কিন্তু এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে যুদ্ধ শেষ করাকে। অনেক সিরিয়ান এ মন্তব্য করেছেন, যেকোনো ধরনের শান্তি, এমনকি একটি অসিদ্ধ বা কুশ্রী শান্তিও চলমান সহিংসতার চেয়ে ভালো। এর বিকল্পটি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের একেবারে হৃদয়ে কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র অবস্থান করা। 

কার্টার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা জিমি কার্টার ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ : মাসুমুর রহমান খলিলী

দেখুন:

আরো সংবাদ