১৯ নভেম্বর ২০১৮

চল্লিশ লাখ মুসলমানের ওপর খড়গ

চল্লিশ লাখ মুসলমানের ওপর খড়গ - ছবি : সংগ্রহ

আসামের চল্লিশ লাখ নাগরিককে রাতারাতি ‘বিদেশী’ আখ্যায়িত করার পর ভারতে রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়ে গেছে। এক দিকে শাসকদল বিজেপির লোকেরা এ সিদ্ধান্তে উৎসব করছে। অপর দিকে, আসামের লাখ লাখ মুসলমানের চেহারা হয়ে গেছে ফ্যাকাসে। তারা নিজেদের এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। বোদ্ধামহল এ সমস্যাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করছে। অপর দিকে, ওই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এতে দেখতে পাচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। তাদের কাছে এ ৪০ লাখ অধিবাসীকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয়াই একমাত্র সমাধান।

তারা চাচ্ছে, ভারতের মুসলমানের সংখ্যা যতই কমে যাবে, ততটাই কমে যাবে তাদের জন্য দুশ্চিন্তা। বিজেপির একজন সংসদ সদস্য তো তাদের গুলি করে মারার ওকালতি করছেন। তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ‘রাষ্ট্রীয় শত্র“দের’ সহ্য করার জন্য প্রস্তুত নন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সতর্ক করে দিয়েছেন, এ সমস্যা থেকে দেশে খুনখারাবি এবং গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। বিজেপি প্রধান অমিত শাহ বগল বাজিয়ে এটাকে বিজেপি সরকারের এমন এক দুঃসাহসিক ভূমিকা বলে আখ্যায়িত করেছেন, যা উত্থাপন করতে ‘অতীতের সরকারগুলো ভয় পেতো’, কেননা তারা ‘ভোট ব্যাংকের রাজনীতিপন্থী’ ছিল। মোট কথা, আসামে ৪০ লাখ মুসলমানকে সন্দেহপূর্ণ নাগরিক আখ্যায়িত করার মামলা বিজেপির ‘মুক্তি’র উপায়ে রূপ নিয়েছে। কেননা, বিজেপি সরকার গত চার বছরে যেভাবে প্রত্যেকটি লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়েছে, তার ফলে জনগণের মধ্যে তাদের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তারা ২০১৯ সালের নির্বাচনে সফলতা লাভের জন্য এমনই এক আবেগপূর্ণ বিষয়ের সন্ধানে ছিল। ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনসের (এনআরসি) চূড়ান্ত খসড়া দৃশ্যপটে আসার পর বিজেপির নি®প্রাণ দেহে নতুন জীবন দান করেছে। এটাকে ভিত্তি করে দেশে আবারো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো ভোটের জোটে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এনআরসি ড্রাফটের জন্য আসামে তিন কোটি ২৯ লাখ মানুষ আবেদন করেছিল। তবে তার মধ্যে দুই কোটি ৮৯ লাখ মানুষের আবেদনকে বৈধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর বাকি ৪০ লাখ অধিবাসীর ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব আশ্চর্যজনকভাবে বলেছে, ‘এসব লোক না ভারতীয়, না বিদেশী।’ অথচ সুপ্রিম কোর্ট এ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন যে, আসামে এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া জারি হওয়া পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে এটাও নির্দেশ দিয়েছেন যে, এনআরসির চূড়ান্ত খসড়ায় স্থান না পাওয়া ৪০ লাখের অধিক মানুষের বিরুদ্ধে কোনো কর্তৃপক্ষই কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি করতে পারবে না।

আদালত বলেছেন, ‘ড্রাফটের বাইরে থাকা মানুষদের দাবি ও অভিযোগের সমাধান বের করার জন্য নিরপেক্ষ ও আদর্শিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে।’ প্রকাশ থাকে যে, ভারতের সবচেয়ে বড় আদালতের তত্ত্বাবধানেই আসামের আসল অধিবাসীদের পরিচয়ের কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। দাবি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আদালত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সরকারকে জবাব দাখিল করতে বলেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও আসামে শাসকদল বিজেপির লোকেরা সন্দেহপূর্ণ নাগরিকরূপে আখ্যায়িত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়ানক প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে। তাদের ‘সীমান্তের ওপারে ছুড়ে ফেলা’র হুমকিও দিচ্ছে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, ‘এ ৪০ লাখ মানুষ আমাদের নাগরিক নয়। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই বলেছেন, ওই ৪০ লাখ মানুষকে আসাম থেকে বের করে দেয়া হলে, তাদের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দেয়া হবে। প্রকাশ থাকে, বিদেশী আখ্যায়িত মানুষের মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাভাষী মুসলমান।

এখানে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে- যে ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে আসামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং সেখানে তার জমিজমা ও কারবার রয়েছে, তিনি অবশেষে তার সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অপর কোনো প্রদেশে বা দেশে কেন চলে যাবেন? এ কারণেই এ সমস্যাকে বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট বলে অভিহিত করা হচ্ছে। আর এটাও বলা হচ্ছে, সারা বিশ্বে আজ পর্যন্ত কোথাও এত বিপুল সংখ্যার মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়নি। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গা মুসলমানদের। কিন্তু তাদের সংখ্যাও ১০ লাখের অধিক নয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এ সঙ্কট মানবাধিকারের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বদলে কেন্দ্রীয় সরকার ওই অধিবাসীদের পথরোধের পরিকল্পনা করছে।

এনআরসি থেকে বের করে দেয়া ওই ৪০ লাখ লোকের বায়োমেট্রিক ডেটা একত্রকরণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, যাতে তাদের ‘কৃত্রিম’ পরিচয়ে অপর প্রদেশে প্রবেশে বাধা দেয়া যায়। আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, কাশ্মিরের পর আসাম ভারতের এমন দ্বিতীয় রাজ্য, যেখানে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বসবাস করছে। আসামে মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। মূলত এটাই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর বড় মাথাব্যথার কারণ। এমনিতে সারা ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির মিথ্যা প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে, আসামকে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে নিশানা বানানো হচ্ছে এবং আসামের মুসলমানদের ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যায়িত করে তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। শাসকদল বিজেপির জন্য এ সমস্যা তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। বিজেপি এ বিষয়ে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভাগ্য পরীক্ষা করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারাভিযানে বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে আসামে বিজেপির প্রথম সরকার গঠিত হওয়ার পর ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে কার্যক্রম তীব্রতা লাভ করে। অ্যাসেম্বলি নির্বাচনেও বিজেপি ‘অনুপ্রবেশকারী’দেরকে ফেরত পাঠানোর ওয়াদা করেছিল। সরকার গঠন হতেই মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার জন্য এনআরসির সাথে আলাদাভাবে ডিটেক্ট (অনুসন্ধান), ডিলিট (মোচন) ও ডিপোর্ট (নির্বাসন) প্রোগ্রাম শুরু করে দেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী অধিবাসীদের অনুসন্ধান করে তাদের নাগরিকত্ব বিলোপ করা এবং তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া। এ ব্যাপারে হাস্যকর দিকটি হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশ থেকে আসামে আসা মুসলমানদেরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও হিন্দুদেরকে ‘আশ্রয়গ্রহণকারী’ আখ্যায়িত করছে। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইএএস অফিসার প্রতীক হাজেলাকে এনআরসি আপডেট করার কাজ সোপর্দ করেছিলেন। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে এনআরসির প্রথম ড্রাফট জারি করা হয়।

এটা বিশ্বে অবৈধ বসবাসকারীদের চিহ্নিত করার সবচেয়ে বড় কার্যক্রম, যেখানে এক হাজার ২০০ কোটি রুপি খরচ হয়েছে। এক লাখের অধিক সরকারি কর্মচারী কাজটিকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। এ কাগজপত্র ৫০০ ট্রাক পরিমাণ। এটা তো স্পষ্ট যে, এত বিশাল পরিমাণের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা সহজ কাজ ছিল না। এর ফল দাঁড়িয়েছে, এ কাজে মারাত্মক অনিয়ম করা হলো। আসাম ইউনাইটেড ফ্রন্ট প্রধান ও পার্লামেন্ট সদস্য মাওলানা বদরুদ্দীন আজমল বলেছেন, ‘এত বিপুল সংখ্যক লোকের নাম যুক্ত না করা এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল।’ তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও বর্ণনাকে উপেক্ষা করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা থেকে মুসলমানদের নাম বিশাল সংখ্যায় বাদ দেয়া হয়েছে যাতে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা কমিয়ে দেয়া যায়।’

উল্লেখ্য, নামের মধ্যে সামান্যতম ভুলের কারণেও লোকজনের আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। এমনও হয়েছে, বাবার নাম তালিকায় এসেছে, আর ছেলের নাম গেছে হারিয়ে। স্বামীর নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, আর স্ত্রীকে তালিকা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

এনআরসির মূর্খতার ধরন এটা থেকে অনুমান করা যায় যে, এ তালিকায় ভারতের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দিন আলী আহমদের আত্মীয়দের নামও গায়েব করে দেয়া হয়েছে। এমনকি সাবেক সেনা অফিসার মুহাম্মাদ আজমল হকের নাগরিকত্বকেও সন্দেহযুক্ত আখ্যা দিয়ে তাকে কাগজপত্রসহ স্থানীয় ট্রাইবুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ তিনি ৩০ বছর পর্যন্ত ভারতের সেনাবাহিনীতে চাকরি করার পর অবসরে গেছেন। উল্লেখ্য, এক দিকে সরকার পার্লামেন্টে ‘সিটিজেনশিপ বিল’ উত্থাপন করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে মাইগ্রেশন করা প্রায় ৩০ লাখ হিন্দুকে নাগরিকত্ব দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে অপর দিকে, আসামের মূল অধিবাসীদেরকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করে তাদের নাগরিকত্ব বিলোপ করে দেয়া হচ্ছে। উন্মত্ত সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস থেকে ভাষান্তর : ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com


আরো সংবাদ