২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বন্যাপ্রবণ দ্বীপে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়া বিপজ্জনক

বন্যাপ্রবণ দ্বীপে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়া বিপজ্জনক - সংগৃহীত

বাংলাদেশের কক্সবাজারের কাছে ছয় লাখ ২৬ হাজার লোকের ঘনবসতিপূর্ণ বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির অবস্থিত। শিবিরটি নির্মাণ করা হয়েছে বাঁশ ও ত্রিপলের সমন্বয়ে। এগুলো দিয়ে শরণার্থী শিবিরের কুঁড়েঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগোষ্ঠীগত নির্মূল অভিযান চালানোর পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহত্তম এই শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে। এই শিবিরটি দ্রুত এবং এলোমেলোভাবে স¤প্রসারিত হয়েছে।

মিয়ানমার থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজারে পালিয়ে আসা ১৯ বছর বয়সী একজন শরণার্থী বলেন, আমাদের গ্রামের লোকজন চলে এসেছে। আমরা সবাই এখানে একত্র হয়েছি এবং এই জায়গাতেই বসবাস করছি। তিনি বলেন, প্রথমে জায়গাটি গাছপালায় পরিপূর্ণ জঙ্গল ছিল। আমরা সেগুলো পরিষ্কার করে ফেলেছি। এখন আর কোনো গাছপালা নেই।

এখন বর্ষাকাল। তীব্র বেগে বাতাস বয়ে যাচ্ছে এবং বৃষ্টির পানিতে বন্যা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে শরণার্থীরা বৃষ্টির পানিতে তাদের কুঁড়েঘর ডুবে যাওয়ায় সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। কুঁড়েঘরগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কক্সবাজার এলাকার দুই লাখ ১৫ হাজার শরণার্থী ভ‚মিধস ও বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের দেয়া তথ্যানুযায়ী, মাত্র ২১ হাজার উদ্বাস্তু বা শরণার্থীকে উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং এখনো ২২ হাজার শরণার্থী ভ‚মিধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের যেসব এলাকায় পরিবেশগত কম ঝুঁকি রয়েছে, সেসব এলাকায় সরিয়ে নেয়া জরুরি হয়ে পড়ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যে বিকল্প স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করেছে, সম্ভবত তা আরো বেশি বিপজ্জনক হবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং চীনা নির্মাণকর্মীরা বঙ্গোপসাগরের একটি জনবসতিহীন দ্বীপ ভাসানচরকে কক্সবাজার থেকে এক লাখ শরণার্থী সরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসকে এই স্থানান্তর শুরু করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেহেতু একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ, তাই তাদের অস্থায়ীভাবে ভাসানচরে আশ্রয় দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সেখানেই থাকবে।

ভাসানচর মানুষের বসবাস ও জীবিকা নির্বাহের জন্য উপযোগী নয়। এ চরাঞ্চলটি সমুদ্রের জোয়ারের পানি ও জলোচ্ছ্বাসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্ভবত সেখানে শিক্ষা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত। এ ছাড়া জীবিকা নির্বাহ ও আত্মনির্ভরশীলতার সুযোগ সেখানে খুবই কম। সেখানে স্থানান্তরের মাধ্যমে শরণার্থীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হবে।

বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীদের দ্বীপটির ভেতরে ও বাইরে চলাচলের স্বাধীনতা বা অনুমতি প্রদানের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অধিকন্তু, উদ্বাস্তুরা সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো সম্মতি জানায়নি। এমনকি ১৯৯৯ সালেও সেখানে ভাসানচরের কোনো অস্তিত্ব  ছিল না। মেঘনার পলিমাটি দ্বারা দ্বীপটি গড়ে ওঠে। সমতল ম্যানগ্রোভ ও ঘাসপরিবেষ্টিত দ্বীপটি গত ২০ বছরে দ্রæত পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল এবং বসবাসের অনুপযোগী হিসেবে পরিলক্ষিত  হয়েছে। গত মার্চ মাসে রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের ভ‚মি মন্ত্রণালয়ের গোলাম মাহবুব সরোয়ারের মতে, দ্বীপটির পার্শ্ববর্তী এলাকায় জোয়ারের পানি ৬ মিটার উচ্চতায় (১৯ দশমিক ৭ ফুট) প্রবাহিত হয়। উচ্চ জোয়ারের সময় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে গোটা দ্বীপ পানিতে নিমজ্জিত হতে পারে।

আরো বলা যায়, শরণার্থীদের সরিয়ে নেয়ার জন্য ভাসানচরই একমাত্র বিকল্প নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাথে মতবিনিময়কারী একজন বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান শরণার্থী শিবিরের কাছাকাছি দুই লাখ ৬৩ হাজার শরণার্থীর সঙ্কুলান করা যায়, এ রকম সম্ভাব্য ছয়টি জায়গা রয়েছে। এ ছাড়াও ওই এলাকার প্রভাবসীমার মধ্যে সরকার শরণার্থীদের মুক্তভাবে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। উপসাগরীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকলেও এসব এলাকা বনবাদাড়ের শক্ত উপাদানে গঠিত এবং ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষম। 

যেসব শরণার্থীর স্বাক্ষাত নিয়েছি, তাদের সবাই মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে তারা কেবল নাগরিকত্ব, যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা পরিচিতিকে স্বীকৃতি দেয়া হবে এবং তাদের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে আর যেসব অপরাধ করা হয়েছে, সে ব্যাপারে ন্যায়বিচার পেলে, বাড়িঘর ও সম্পত্তি ফেরত দেয়া হলে এবং তাদের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হলেই স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান।

দ্রুত  এবং যেকোনো সময় এসব ঘটবে না। এই সময়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই শরণার্থীদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কেউ স্বেচ্ছায় এই বড় শরণার্থী শিবির ছেড়ে তুলনামূলক ছোট ও কম ঘনবসতিপূর্ণ ও নিকটস্থ সমতলীয় কোনো শিবিরে যেতে চাইলে তাদের সেই সুযোগ দিতে হবে। নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে না পারা পর্যন্ত একটি টেকসই ও সম্মানজনক জীবনযাপনে এই ছোট শরণার্থী শিবির শরণার্থীদের জন্য সর্বোত্তম অবদান রাখবে।

লেখক : হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দি রিফিউজি রাইটস প্রোগ্রামের
একজন পরিচালক
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর :
মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ