১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দুর্নীতির কারখানায় নীতির চাষাবাদ

দুর্নীতির কারখানায় নীতির চাষাবাদ - সংগৃহীত

ব্যাংকের লকার থেকে স্বর্ণ চুরি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে কিছুটা অনুমেয়, দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। তবুও দেশকে ভালোবেসে আশায় বুক বাঁধি। আমাদের মধ্যে কিছু মানুষ আছে, যারা এক দিনেই আকাশ ছুঁতে চায়।

আরাম-আয়েশ আর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চায় লুটতরাজ করে হলেও। এমন এক জাতি তৈরি হবে বাংলাদেশে, তা না ভেবেছেন মওলানা ভাসানী, না ভেবেছেন শেরেবাংলা কিংবা বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বাস্তবে তা-ই হয়েছে। আর তাই বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন, ‘সব দেশ পায় স্বর্ণ বা তেলের খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ দেশে চলছে চুরি, প্রতারণা ও দুর্নীতির মহাযজ্ঞ।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও ‘জনতা ব্যাংকের দুই শাখায় ঋণ জালিয়াতি হাজার কোটি টাকা’ বলে গণমাধ্যমের তথ্য থেকে উঠে আসে। জনতা ব্যাংকের দু’টি শাখায় হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১১টি প্রতিষ্ঠান এ জালিয়াতি করেছে। এর মধ্যে করপোরেট শাখায় ৬৫৫ কোটি এবং স্থানীয় কার্যালয় শাখায় ২৬৬ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়। এমনকি খেলাপি থাকা কালেও তালিকা থেকে ফের নতুন ঋণ দেয়া হয়।

ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়মনীতির তোয়াক্কাই করা হয়নি। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোর মাধ্যমেও গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। আলোচিত দুই শাখায় ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর-ভিত্তিক স্থিতির ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়।

দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে জনতা ব্যাংক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। ২০১৭ সালে ‘নতুনধারা বাংলাদেশ’ এনডিবির নিবন্ধন আবেদনের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে দলের চেয়ারম্যান ও দাফতরিক কার্যালয় যে ভবনে তার দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত জনতা ব্যাংকের দফতরে গিয়েও পাওয়া গেছে দুর্নীতির ঘ্রাণ। তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও আমার অ্যাকাউন্ট কার্যকর করাতে পারিনি; অথচ একটি ছোট দলের একাংশের এক নেতা ব্যাংকে ঢুকতেই সব ব্যবস্থা করে এক ঘণ্টার মধ্যেই অ্যাকাউন্ট করে দেয়া হয়। অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে।

এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলতে বাধ্য হয়েছেন, এ দুঃসংবাদ ব্যাংকটির নতুন দু’টি শাখার, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তিনি জানান, এর আগে এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট শাখার বৈদেশিক বাণিজ্যের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে; কিন্তু এতে সমাধান হয়নি। যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এখন কথা আসে, জড়িত কারা? দায়ী তো তারা, যারা ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে নেতৃত্ব বদলের মাধ্যমে ইচ্ছামতো লুটপাট করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকা কালো মানুষদের যোগসাজশে অবশ্য জনতা ভবন করপোরেট শাখায় উইন্ডো ড্রেসিং (ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে) ৯০ কোটি টাকা বেশি মুনাফা দেখানো হয়েছে। খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণের সুদ আদায়ে ব্যর্থ হয়েও তারা অনাদায়ী সুদকে ‘আদায়’ হিসেবে দেখিয়েছেন।

অর্থাৎ ২০১৬ সালে আয় হতে পারে ভেবে ২০১৫ সালেই তা আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির মুখে পড়ে তা অ্যান্টি-রিভার্স বা ফেরত আনা হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৫ সালে ব্যাংকের আয় কমেছে ৯০ কোটি টাকা। শাখার পুনঃতফসিলকৃত কিছু ঋণের কিস্তির নিয়মিত আদায় না হওয়া সত্ত্বেও আরোপিত অনাদায়ী সুদ আয়ের খাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল এ ধরনের ৭৮ কোটি টাকা শনাক্ত করে তা ফেরত দিতে বাধ্য করেছে।

ফলে এ আয়ও তাদের হিসাব থেকে বাদ দিতে হয়েছে। এর বাইরে শাখাটি একটি টেক্সটাইল মিলসকে অনিয়মের মাধ্যমে বেশ কিছু ঋণসুবিধা দিয়েছে।

নতুন প্রজন্ম মনে করে রাজনীতি যে যা-ই করুক, দেশ ও মানুষের স্বার্থে থাকুক ঐক্যবদ্ধ, সৎ ও স্বচ্ছ। তা না করে একের পর এক দুর্নীতি আর অন্যায়ের পথে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। তারই ধারাবাহিকতায় অসংখ্য দুর্নীতির কারখানা হিসেবে পরিচিত এক প্রতিষ্ঠানকে ২০১২ সালের সীমার অতিরিক্ত ১৯ কোটি টাকার রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে ঋণ দেয়া হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিবিরুদ্ধ।

এ তহবিল থেকে সীমার বেশি ঋণ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। গ্রাহকের ইডিএফের আওতায় ৬৬ কোটি টাকার ঋণপত্রের দায় সমন্বয়ে করা ফোর্সড লোনকে অযৌক্তিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনর্ভরণযোগ্য পিএডি (পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট) হিসেবে দেখানো হয়। এ ছাড়া, খেলাপি গ্রাহককে নতুন করে ২০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি লঙ্ঘন করেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ৩৬ কোটি টাকার এলসি সীমা নবায়ন করা হয়েছে। পুনঃতফসিল সুবিধা বাতিলযোগ্য হলেও ব্যাংকের শাখা তা করেনি বরং মেসার্স এমবিএ গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলসকে অনিয়ম করে অনেক ঋণসুবিধা দিয়েছে।

এর মধ্যে তথ্য গোপন করে গ্রাহকের পক্ষে ৩৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ক্রয় এবং সেই খেলাপি গ্রাহককে আবার বিধিবহির্ভূতভাবে নতুন করে প্রায় ১১ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। শর্ত লঙ্ঘন করে একই গ্রাহককে ৬৫ কোটি টাকার এলটিআর ও সীমার অতিরিক্ত পিএডি ঋণসুবিধা প্রদান করা হয়। একইভাবে গ্রাহককে পণ্য ছাড়করণের সুযোগ করে দেয়া হলো। আর মেয়াদোত্তীর্ণ এবং খেলাপি থাকা সত্ত্বেও গ্রাহককে আরো পাঁচটি এলটিআর ঋণসুবিধা দেয়া হলো।

আদায় অনিশ্চিত খেলাপি থাকার পরও তড়িঘড়ি করে গ্রাহকের ১৭০ কোটি টাকা ঋণ অবলোপনের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। শাখাটি ফার্মাসিউটিক্যালকে অনিয়মের মাধ্যমে দিয়েছে অনেক ঋণ। গ্রাহক থেকে ১৫ শতাংশ কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট গ্রহণ না করেই নতুন করে সিসি (হাইপো) ঋণসীমা ১০ কোটি এবং এলসি সীমা আট কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সরকারের একাংশে লুকিয়ে থাকা দেশ-মানুষ-স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্রের সহযোগিতায় একই গ্রাহক থেকে প্রযোজ্য হারে ডাউন পেমেন্ট না নিয়ে ২০ কোটি টাকা তৃতীয়বার পুনঃতফসিল এবং মেয়াদি ঋণে রূপান্তরিত সিসি (হাইপো) ঋণ আট কোটি টাকা দ্বিতীয়বার পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়া নিয়মের লঙ্ঘন। একইভাবে দু’টি প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূত বিপুল অঙ্কের ঋণসুবিধা দিয়েছে জনতা ব্যাংক করপোরেট শাখা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শনে আরো দেখা যায়, জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখায়ও উইন্ডো ড্রেসিং করে ৭৩ কোটি টাকার জালিয়াতি করা হয়। এতে দেখা গেছে, মেসার্স আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড ¯িøপওয়েজ লিমিটেড, মেসার্স সিক্স সিজনস লিমিটেড এবং মেসার্স ফিনকোলি অ্যাপারেলসের পুনঃতফসিলকৃত ঋণে আরোপিত অনাদায়ী সুদ প্রায় ১৬ কোটি টাকা ২০১৬ সালে আদায় হবে ভেবে ২০১৫ সালে আয় দেখানো হয়েছে।

একইভাবে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স লিতুন ফেব্রিক্সের ২৮ কোটি এবং মেসার্স বেক্সিমকো লিমিটেডের প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় খাতে নেয়া হয়, তা সম্পূর্ণভাবে জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এত কিছুর পরও বিভিন্ন ঋণ হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, শাখাটি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকে অকাতরে ঋণ দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়ম মানা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি হওয়ার পরও বারবার নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে ২১ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে প্রায় ২৪ কোটি টাকা বর্তমানে ফান্ডেড ঋণে পরিণত হয়েছে। এরপর আবার ২০১৫ সালে ৪০ কোটি টাকার চলতি মূলধন এবং প্রায় ৩৪ কোটি টাকার বিএমআরই ঋণ মঞ্জুর করা হয়।

এভাবে ঋণ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কৈফিয়ত তলব করেছে। কিন্তু তাতে কোনো সন্তোষজনক জবাব ছিল না। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কৃষিঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও অবিশ্বাস্য রকম জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে জনতা ব্যাংকে।

ভূমিহীনকে জমির মালিক বানিয়ে নামে-বেনামে ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত দলিল, পর্চা, ওয়ারিশ সনদ সবই ছিল জাল। এমনকি স্বাক্ষর ও সিলও নকল। যার নামে ঋণ সৃষ্টি করা হয়, তিনি নিজেই জানেন না, তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল নমুনা ভিত্তিতে ১০০টি ঋণ পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৪৮টি ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়। অবিশ্বাস্য এসব ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে ব্যাংকটির রংপুরের পীরগাছার চৌধুরাণী শাখায়।

আত্মসাৎ-দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনীতি-অর্থনীতি থেকে ক্রমেই মুক্তির জন্য যদি কাজ করে বাংলাদেশের মানুষ, ঐক্যবদ্ধ হয় আমাদের জনগণ, তাহলে কিছুটা আশার আলো জ্বলে উঠতেও পারে। তা না হলে লোভী রাক্ষস দলের কালো থাবায় অন্ধকারে ডুবতে পারে দেশের ভবিষ্যৎ। দুর্নীতি যেখানেই হোক, কথা বলতে হবে এর বিরুদ্ধে। সত্য বলার পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে হবে নতুন প্রজন্মকেই।

লেখক : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ- এনডিবি
E-mail : mominmahadi@gmail.com


আরো সংবাদ

মাশরাফিদের এবারের টার্গেট আফগানিস্তান নির্বাচনকালীন সরকারে পার্লামেন্টের বাইরের কেউ থাকবে না : কাদের গৃহবধূকে ধর্ষণের পর ভিডিও ছড়িয়ে সাবেক ইউপি সদস্য গ্রেফতার সাংবাদিকতা পেশাকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান শ্রীমঙ্গলে সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতি বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেই ইভিএম প্রকল্প : রিজভী পাকিস্তানের চেয়ে ভারতকে কেন বেশি সুবিধা দিচ্ছে আইসিসি? কুলাউড়ায় নিখোঁজের ১০ ঘণ্টা পর যুবদল নেতার লাশ উদ্ধার মোহাম্মাদ আমিরকে ২৫টি প্রশ্ন ও উত্তর খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা দাবিতে ঢাবি সাদাদলের মানববন্ধন সিদ্ধিরগঞ্জে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

সকল